যে কোনো গণআন্দোলন একটি জাতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকে। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে যেমন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা হয়, তেমনি রেখে যায় গভীর মানবিক ক্ষতচিহ্ন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংস ঘটনাবলিও তার ব্যতিক্রম নয়। এ সময় বহু বেসামরিক নাগরিকের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় বাংলাদেশ পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান।
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। সরকারি তালিকায় তাঁদের নাম, পদবি, কর্মস্থল, মৃত্যুর তারিখ এবং ঘটনার স্থান উল্লেখ রয়েছে। তবে এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি নামের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, অসংখ্য স্বপ্ন, দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং প্রিয়জন হারানোর গভীর বেদনা। ফলে বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক নথির তথ্য হিসেবে নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেসব পুলিশ সদস্য জীবন হারিয়েছেন, তাঁদের অবদান ও আত্মত্যাগ দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের পরিচয়, কর্মস্থল ও মৃত্যুর তথ্য আজ রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নথিতে সংরক্ষিত।
এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক অবস্থান উপস্থাপন করা নয়; বরং তথ্যনির্ভর ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দায়িত্ব পালনকালে জীবন হারানো পুলিশ সদস্যদের আত্মত্যাগ, তাঁদের পরিবারের বেদনাময় বাস্তবতা এবং সমাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা তুলে ধরা।
● ইতিহাসের আরেকটি দিকইতিহাস যখন লেখা হয়, তখন প্রায়ই বড় ঘটনা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতার পরিবর্তন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যারা কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের স্মৃতি, তাদের পরিবার এবং তাদের আত্মত্যাগও সমানভাবে সংরক্ষিত হওয়া উচিত। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাণের মূল্য রয়েছে, আর দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিদের প্রতি ন্যূনতম মানবিক সম্মান প্রদর্শন সভ্য সমাজের পরিচয়।
একই সময়ে প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আন্দোলনকালীন সহিংসতা, প্রাণহানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এ ধরনের প্রতিবেদন ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—যে কোনো সংকটের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, সত্য উদ্ঘাটন এবং মানবজীবনের মর্যাদা রক্ষা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
তবে এ কথাও সত্য—বাংলাদেশের সাবেক সরকার এবং নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের আংশিক সদস্য, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংস উপাদানগুলোর পাশাপাশি, সে বছরের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের সময় পদ্ধতিগতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাসমূহের সাথে জড়িত ছিল।
● নিহত পুলিশ সদস্যদের তালিকা
২৪-এর জুলাই আন্দোলনে নিহত পুলিশ সদস্যদের নাম, পদবি, মৃত্যুর তারিখ, কর্মস্থল ও ঘটনাস্থলসহ প্রকাশ করা হয়েছে। পদবি অনুযায়ী তাদের মধ্যে রয়েছেন: ৩ জন পুলিশ পরিদর্শক, ১১ জন উপ-পরিদর্শক (এসআই), ৭ জন সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই), ১ জন এটিএসআই, ১ জন নায়েক এবং ২১ জন কনস্টেবল।
● নিহত ৩ জন পুলিশ পরিদর্শক: মো. আবদুর রাজ্জাক, রাশেদুল ইসলাম, মো. মাসুদ পারভেজ ভূইয়া।
● নিহত ১১ জন এসআই: সুজন চন্দ্র দে, খগেন্দ্র চন্দ্র সরকার, রেজাউল করিম, মো. মামুনুর রশিদ সরকার, বাছির উদ্দিন, রইস উদ্দিন খান, তহছেনুজ্জামান, প্রণবেশ কুমার বিশ্বাস, মো. নাজমুল হোসাইন, আনিসুর রহমান মোল্লা, সন্তোষ চৌধুরী।
● নিহত ৭ জন এএসআই: সঞ্জয় কুমার দাস, ফিরোজ হোসেন, সোহেল রানা, রাজু আহমেদ, ওবায়দুর রহমান, রফিকুল ইসলাম, মো. মোক্তাদির।
● নিহত ১ জন এটিএসআই: আলী হোসেন চৌধুরী।
● নিহত ১ জন নায়েক: মো. গিয়াস উদ্দিন।
●
নিহত ২১ জন কনস্টেবল: মো. আবদুল মজিদ, রেজাউল করিম, মাহফুজুর রহমান, শাহিদুল আলম, মো. আবু হাসনাত রনি, মীর মোনতাজ আলী, সুমন কুমার ঘরামী, মোহাম্মদ আবদুল মালেক, মোহাম্মদ ইব্রাহিম, মো. আবদুস সালেক, মো. হাফিজুল ইসলাম, মো. রবিউল আলীম শাহ, মো. হুমায়ুন কবীর, মো. আরিফুল আযম, মো. রিয়াজুল ইসলাম, মো. শাহিন উদ্দিন, মো. এরশাদ আলী, মাইনুদ্দিন লিটন, মো. সুজন মিয়া, মো. খলিলুর রহমান, মো. হানিফ আলী।
● পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণতালিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে:
- ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) কর্মরত ছিলেন ১৪ জন
- সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৫ জন
- নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানায় ২ জন
- কুমিল্লার তিতাস থানায় ২ জন
- চাঁদপুরের কচুয়া থানায় ১ জন
- হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানায় ১ জন
- ঢাকার এসবিতে ১ জন
- নারায়ণগঞ্জ পিবিআইয়ে ১ জন
- ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দপ্তরে ১ জন
- কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশে ১ জন
- কসবা থানায় ১ জন
- খুলনা মহানগর পুলিশে ১ জন
- গাজীপুর মহানগর পুলিশে ১ জন
- ঢাকা জেলায় ২ জন
নিহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ২৫ জন থানার ভেতরে বা সামনে থাকা অবস্থায় মারা যান। সবচেয়ে বেশি—২৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা ছাড়ার দিন। এর আগের দিন, ৪ আগস্ট, মারা যান ১৪ জন।
●
একটি সামাজিক প্রতিক্রিয়াবৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে সক্রিয় সাংবাদিক ও ভ্রমণ-সংগঠক রেদওয়ান খান তার একটি ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন:
"জুলাই আন্দোলনে নিহত পুলিশের তালিকা প্রকাশ হলো, ৪৪ জন। এরা সবাই অপরাধী ছিল, আমি সেটা মানতে নারাজ। দোষীরা সাধারণত আগেই পালায়, মারা যায় নিরীহরা। এমন অনেক পুলিশকে চিনি, চাকরি হারালে তাদের আর কোনো উপায় নেই, প্রতিবাদ করার মতো সাহসও ছিল না। অনেককে সাহায্য করেছি তখন। পরিস্থিতির কারণে অনেককেই পারিনি। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। আমাদের জীবন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, পুলিশ ভাইদেরও তাই। এমন পরিস্থিতির জন্য মূল দায়ী হুকুমের আসামিরা, তাদের দলীয় রিক্রুটমেন্টগুলো, অতি উৎসাহী সদস্যরা। মাঝ থেকে মারা যায় সাধারণ মানুষ, সাধারণ পুলিশ। রাঘব বোয়ালদের সঠিক বিচারের আশায় রইলাম।"যে কোনো দেশে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের প্রাণহানি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক। একইভাবে নিরীহ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিও সমান বেদনাদায়ক। একটি সভ্য রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের জীবনের মর্যাদা সমান, আর সেই কারণেই যেকোনো প্রাণহানিকে মানবিক সংবেদনশীলতা ও আইনের শাসনের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তারাও রাষ্ট্রের নাগরিক। তাদের রক্তের রং লাল। দিনশেষে, ইউনিফর্মের বাইরে তারাও কারো সন্তান, কারো ভাই, কারো জীবনসঙ্গী, কারো বাবা। দেশের সেবায় ব্রত হয়ে, সরকারি চাকরির নিয়ম অনুসারে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ অনুযায়ী—সর্বোপরি বাহিনীর "চেইন অব কমান্ড" পালনে বাহিনীর প্রতিটি সদস্য বদ্ধপরিকর।
পুলিশ একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী, যেখানে দায়িত্ব পালন নির্ধারিত নীতিমালা, প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনা এবং চেইন অব কমান্ড অনুসারে পরিচালিত হয়। মাঠপর্যায়ে কর্মরত সদস্যরা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য প্রশিক্ষিত ও বাধ্যবাধকতার মধ্যে থাকেন। তাই কোনো সংকটময় পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়—উভয় বিষয়ই যথাযথভাবে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। যে সকল পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন, তারা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, পরিবারের মায়া ত্যাগ করে, প্রিয় সন্তানের মুখ ভুলে আদেশপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন।
● সমাপনী পর্যবেক্ষণসকল পুলিশ এক নয়, ঠিক যেমন সকল মানুষ এক নয়। ব্যতিক্রম সকল পেশাতেই বিদ্যমান। পুলিশের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তাদের মনোবল বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে; সমাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ জনগণের সহায়তা করে। অতি উৎসাহী বা বিপথগামী পুলিশ সদস্য আন্দোলনের আগেও ছিল, এখনো আছে। তবে সেই আংশিক সংখ্যার ওপর নির্ভর করে সমগ্র বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করা সমীচীন নয়। তেমনি পুলিশ বাহিনীর কাজ অন্য কোনো বাহিনীর পক্ষে সম্ভব নয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা, পেশাদারিত্বের চর্চা এবং মানবাধিকারের প্রতি সম্মান—এই তিনটি বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি কার্যকর ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপূরক। যে সমাজ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন হারানো মানুষদের সম্মান করে এবং একই সঙ্গে আইনের শাসন ও জবাবদিহিকে গুরুত্ব দেয়, সেই সমাজই দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থিতিশীল, মানবিক ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
সূত্র: বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর (প্রকাশিত নিহত পুলিশ সদস্যদের তালিকা, ১৮ আগস্ট ২০২৪)
লেখক: সহ সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।
ডেল্টা টাইমস/রেহানা ফেরদৌসী/সিআর/এমই