আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো তার নিরপেক্ষতা। রাষ্ট্র তখনই সকল নাগরিকের যৌথ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারে, যখন সে নিজেকে কোনো বিশেষ ধর্ম, জাতি, ভাষা, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং সকল নাগরিকের সমান আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়।
রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্রের মূল্যবোধহীনতা নয়। বরং এর অর্থ হলো; রাষ্ট্র তার নীতিনির্ধারণ, আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ পরিচয়ের প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শন করবে না। রাষ্ট্রের একমাত্র পক্ষ হবে আইন, ন্যায়বিচার এবং সমান নাগরিকত্বের নীতি।
একটি বহুত্ববাদী সমাজে মানুষ ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাস করতে পারে, ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারে, ভিন্ন সংস্কৃতি অনুসরণ করতে পারে এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মত পোষণ করতে পারে। এই বৈচিত্র্য সমাজের স্বাভাবিক বাস্তবতা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই বৈচিত্র্যকে একক পরিচয়ে রূপান্তর করা নয়; বরং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে সকল পরিচয়ের মানুষ সমান নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারে।
রাষ্ট্র যখন কোনো নির্দিষ্ট পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে অতিরিক্তভাবে একীভূত করে ফেলে, তখন একটি মৌলিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। যারা সেই পরিচয়ের অংশ নয়, তারা ধীরে ধীরে নিজেদেরকে রাষ্ট্রের প্রান্তে অবস্থানকারী হিসেবে অনুভব করতে শুরু করে। এর ফলে নাগরিকত্বের অভিন্ন ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ক্ষয় হতে থাকে।
আস্থা হলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান রাজনৈতিক সম্পদ। আইন বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মানানো যেতে পারে, কিন্তু আস্থা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অর্জন করা যায় না। আস্থা জন্ম নেয় ন্যায়সঙ্গত আচরণ, সমান সুযোগ এবং নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে।
যখন নাগরিকরা বিশ্বাস করে যে রাষ্ট্র তাদের ধর্ম, ভাষা বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সমানভাবে দেখছে, তখন তারা রাষ্ট্রকে নিজেদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু যখন তারা রাষ্ট্রের ভেতরে পক্ষপাতের উপস্থিতি অনুভব করে, তখন সামাজিক দূরত্ব, অবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক বিভাজন বৃদ্ধি পায়।
রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা শুধু একটি প্রশাসনিক নীতি নয়; এটি সামাজিক সংহতিরও ভিত্তি। নিরপেক্ষ রাষ্ট্র নাগরিকদের মধ্যে প্রতিযোগিতাকে সংঘর্ষে পরিণত হতে দেয় না এবং ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করে।
এই কারণেই আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় নিরপেক্ষতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, বৈধতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য শর্ত।
আমি বিশ্বাস করি, একটি রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকরা নিশ্চিত থাকে যে রাষ্ট্র তাদের সবার। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নয়, কোনো বিশেষ পরিচয়ের নয়, বরং সমান মর্যাদাসম্পন্ন সকল নাগরিকের।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পরিচয় নিরপেক্ষতা, কারণ নিরপেক্ষতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে ন্যায়বিচার, সমতা এবং নাগরিক আস্থার ভিত্তি।
রাষ্ট্রের একমাত্র পক্ষ হওয়া উচিত আইন; তার একমাত্র নীতি হওয়া উচিত ন্যায়; এবং তার একমাত্র দায়িত্ব হওয়া উচিত সকল নাগরিকের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা।
লেখক : রাস্ট্রচিন্তক ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য আমজনতার দল।