
বিপ্লবের সমাপ্তি ঘটে রাজপথে; কিন্তু ইতিহাসের লড়াই শুরু হয় তার পরদিন থেকেই। যে আন্দোলন মানুষের রক্ত, অশ্রু ও স্বপ্নের বিনিময়ে জন্ম নেয়, তাকে ঘিরে খুব দ্রুতই আরেকটি সংঘাত শুরু হয়—স্মৃতির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংঘাত। কারণ ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্র শাসন করতে চায় না; ক্ষমতা ইতিহাসকেও শাসন করতে চায়। যে ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্পনাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আন্দোলনের উত্তরাধিকারকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক শক্তি নিজেদের ব্যাখ্যা সামনে এনেছে। কেউ ধর্মীয় ভাষ্যে, কেউ জাতীয়তাবাদী ভাষ্যে, আবার কেউ গণতান্ত্রিক অধিকারের ভাষ্যে জুলাইকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। বহুমাত্রিক একটি গণআন্দোলন নিয়ে এমন বিতর্ক অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু উদ্বেগ তখনই জন্ম নেয়, যখন প্রতিটি ব্যাখ্যাকেই একমাত্র বৈধ ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দেখা দেয়।
ইতিহাসকে একচেটিয়া করার প্রতিটি প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ইতিহাসকেই দরিদ্র করে। কারণ একটি জাতির স্মৃতি কখনো একরঙা নয়। সেখানে ধর্মও আছে, গণতন্ত্রও আছে; প্রতিবাদও আছে, আত্মত্যাগও আছে; তরুণের স্বপ্নও আছে, প্রবীণের অভিজ্ঞতাও আছে। এই রাজনৈতিক ও সামাজিক বহুত্বই ইতিহাসের শক্তি।
গত দুই বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপরিসরে রাজনৈতিক ভাষা ক্রমেই কঠোর হয়েছে। ভিন্নমতকে অস্বীকার, প্রতিপক্ষকে নৈতিকভাবে অযোগ্য ঘোষণা এবং কিছু ক্ষেত্রে মব সহিংসতা—এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক ও নাগরিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এসব ঘটনার দায় ও পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত তথ্য, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের শাসন—গুজব বা আবেগ নয়।
সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই আসবে, যখন একটি আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে সংকীর্ণ মতাদর্শিক আধিপত্যের ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করা হবে। কারণ যে মুহূর্তে ইতিহাসকে দলীয় সম্পদে রূপান্তর করা হবে, সেই মুহূর্তেই জাতীয় ঐক্য ভেঙে পড়তে শুরু করবে। তখন ইতিহাস আর আত্মসমালোচনার আয়না থাকে না; তখন ইতিহাস হয়ে ওঠে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষাপত্র।
একটি গণআন্দোলনের উত্তরাধিকার রক্ষার প্রকৃত উপায় হলো তাকে বহুমাত্রিক থাকতে দেওয়া। যে ইতিহাসে ভিন্ন কণ্ঠের স্থান নেই, সে ইতিহাস দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যে রাষ্ট্রে নাগরিকদের প্রশ্নকে ভয় করা হয়, সেখানে উত্তরও একদিন বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়।
জুলাই যদি সত্যিই জাতির একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হয়ে থাকে, তবে তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত এই যে—রাষ্ট্রের শক্তি মতের একরূপতায় নয়, মতের সহাবস্থানে; রাজনীতির শক্তি আধিপত্যে নয়, জবাবদিহিতে; আর ইতিহাসের শক্তি মালিকানায় নয়, সত্য অনুসন্ধানে।
জুলাইকে তাই কোনো একক রাজনৈতিক বয়ানের বন্দি বানানো যাবে না; বরং জাতির সম্মিলিত অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করাই হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই পক্ষে রায় দেয়, যারা ইতিহাসকে ব্যবহার করেনি; বরং ইতিহাসের কাছেই জবাবদিহি করেছে।