
আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো বহুত্ববাদ (Pluralism)। রাষ্ট্রকে যদি কেবল একটি ধর্ম, একটি ভাষা, একটি সংস্কৃতি বা একটি রাজনৈতিক মতের বাহন হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে সেটি আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রের শক্তি একরূপতায় নয়, বরং বৈচিত্র্যের মধ্যে সহাবস্থানের সক্ষমতায় নিহিত।
বহুত্ববাদ মানে শুধু বিভিন্ন মানুষের একসঙ্গে বসবাস নয়; বহুত্ববাদ মানে হলো একই রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে বহু ধর্ম, বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি, বহু জাতিগত পরিচয় এবং বহু রাজনৈতিক মতের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সহ-অস্তিত্ব। এটি কেবল একটি সামাজিক বাস্তবতা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক নীতি এবং রাষ্ট্রদর্শন।
রাষ্ট্রের কাজ কোনো একটি পরিচয়কে অন্য পরিচয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত করা নয়। রাষ্ট্রের কাজ হলো এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো নির্মাণ করা, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক তার নিজস্ব পরিচয় নিয়ে নিরাপদ, মর্যাদাবান এবং সমান অধিকারের অধিকারী হতে পারে। রাষ্ট্র যদি কোনো একটি পরিচয়ের পক্ষে দাঁড়ায় এবং অন্য পরিচয়গুলোকে সন্দেহ, অবিশ্বাস বা বৈষম্যের চোখে দেখে, তবে রাষ্ট্র নিজেই তার নাগরিকদের মধ্যে বিভাজনের বীজ বপন করে।
ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত্তি কখনো সাংস্কৃতিক একরূপতা নয়; বরং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি। মানুষকে একই রকম বানিয়ে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা যায় না। বরং ভিন্নতাকে স্বীকার করে, পারস্পরিক মর্যাদা নিশ্চিত করে এবং আইনের দৃষ্টিতে সমতা প্রতিষ্ঠা করেই রাষ্ট্রকে স্থায়ী ভিত্তি দেওয়া যায়।
আমি বহুত্ববাদকে শুধু একটি সামাজিক ধারণা হিসেবে দেখি না; আমি এটিকে "সহ-রাজনৈতিক অস্তিত্বের রাষ্ট্রদর্শন" হিসেবে দেখি। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভেতরে ভিন্ন মত, ভিন্ন বিশ্বাস এবং ভিন্ন পরিচয়ের মানুষ পরস্পরকে নির্মূল করার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং তারা একই রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের সমমর্যাদাসম্পন্ন অংশীদার।
গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি এখানেই। গণতন্ত্রের অর্থ এই নয় যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সবসময় বিজয়ী হবে এবং সংখ্যালঘু সবসময় নীরব থাকবে। প্রকৃত গণতন্ত্র হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের পাশাপাশি সংখ্যালঘুর অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকে। কারণ রাষ্ট্র যদি শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তবে তা সহজেই সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যে পরিণত হতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্র যদি ন্যায়, অধিকার ও বহুত্ববাদের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তবে তা সকল নাগরিকের যৌথ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
যে রাষ্ট্র বহুত্ববাদকে অস্বীকার করে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরেই সংঘাত সৃষ্টি করে। কারণ মানুষের পরিচয়কে আইন দিয়ে মুছে ফেলা যায় না, প্রশাসনিক নির্দেশে পরিবর্তন করা যায় না এবং রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে স্থায়ীভাবে দমন করা যায় না। দমন করা যায় কিছু সময়ের জন্য, কিন্তু স্বীকৃতি না দিলে সেই পরিচয় একসময় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়।
অন্যদিকে যে রাষ্ট্র বহুত্ববাদকে গ্রহণ করে, সে রাষ্ট্র তার বৈচিত্র্যকে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে। সেখানে ভিন্নতা বিভাজনের কারণ হয় না; বরং সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার উৎসে পরিণত হয়।
তাই আধুনিক রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ একক পরিচয়ের আধিপত্যে নয়; বরং সহ-রাজনৈতিক অস্তিত্বের দর্শনে। রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব কোনো একক মতাদর্শের বিজয়ের উপর নির্ভর করে না; বরং ভিন্ন মতাদর্শের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উপর নির্ভর করে।
আমি বিশ্বাস করি, যে রাষ্ট্র সকল নাগরিককে সমান মর্যাদায় ধারণ করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও টেকসই রাষ্ট্র। কারণ রাষ্ট্রের শক্তি তার একরূপতায় নয়; রাষ্ট্রের শক্তি তার বহুত্ববাদে।
এই ধারণাকে ভিত্তি করে "সহ-রাজনৈতিক অস্তিত্ববাদ (Co-Political Existentialism)" নামে একটি নতুন রাজনৈতিক তত্ত্বও নির্মাণ করা যেতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হবে: সার্বভৌম জনগণ, বহুত্ববাদ, পারস্পরিক মর্যাদা, বিকেন্দ্রীকরণ এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সহাবস্থান।