ওজনে প্রতারণা এবং প্রতিকারের উপায়

মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ

মতামত

একসময় ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষেত্রে দাঁড়িপাল্লা অপরিহার্য ছিল। দাঁড়িপাল্লার ঐতিহ্যবাহী যুগ থেকে ডিজিটাল স্কেলের যুগে রূপান্তর পরিমাপের ক্ষেত্রে এক

2026-06-30T17:01:39+06:00
2026-06-30T17:01:39+06:00
বুধবার, ০১ জুলাই, ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩

ওজনে প্রতারণা এবং প্রতিকারের উপায়
মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ৫:০১ পিএম   (ভিজিট : ২১৭)

একসময় ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষেত্রে দাঁড়িপাল্লা অপরিহার্য ছিল। দাঁড়িপাল্লার ঐতিহ্যবাহী যুগ থেকে ডিজিটাল স্কেলের যুগে রূপান্তর পরিমাপের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। যেখানে পুরোনো দিনে সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পণ্যদ্রব্যের ওজন পরিমাপের জন্য বাটখারা ও কাঁটার ওপর নির্ভরশীল দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করা হতো, সেখানে এখন নিখুঁত ও দ্রুত ফলাফল প্রদান করে এমন ডিজিটাল সেন্সরযুক্ত স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও দাঁড়িপাল্লা একসময় নির্ভরযোগ্যতা এবং নিরপেক্ষতার প্রতীক ছিল, তবে আধুনিক যুগের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ওজন পরিমাপের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা এবং গতির কারণে ডিজিটাল স্কেল এখন অপরিহার্য। ডিজিটাল স্কেল হলো একটি আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্র যা বস্তুর ওজন বা ভর নিখুঁতভাবে পরিমাপ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। পুরোনো অ্যানালগ বা স্প্রিং পাল্লার মতো এতে কোনো কাঁটা বা ডায়াল থাকে না বরং এতে লোড সেল (Load Cell) এবং সেন্সর থাকে যা ওজনকে ডিজিটাল সিগন্যালে রূপান্তর করে একটি স্ক্রিনে সংখ্যা হিসেবে প্রদর্শন করে। ডিজিটাল স্কেলে ওজনের ফলাফল সরাসরি LCD বা LED স্ক্রিনে পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। এতে সাধারণ পাল্লার চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁতভাবে ওজন মাপা হয়, যার কারণে দশমিকের ঘরের ওজনও সহজে পড়া যায়। একই স্কেলে গ্রাম, কিলোগ্রাম, পাউন্ড বা আউন্স এর মতো বিভিন্ন এককে ওজন মাপা যায়। এছাড়াও ডিজিটাল স্কেলে কোনো পাত্র বা বক্সের ওজন বাদ দিয়ে ভেতরের আসল বস্তুর ওজন বের করার সুবিধা থাকে। এগুলো সাধারণত রিচার্জেবল ব্যাটারি, সাধারণ ড্রাইসেল ব্যাটারি বা সরাসরি বিদ্যুতের সাহায্যে চলে। ডিজিটাল স্কেলের বহুল ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে রান্নাঘরে মশলা বা রান্নার উপকরণ মাপা, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মাপা, পার্সেল ও চিঠির ওজন নির্ধারণ, গহনা বা ল্যাবরেটরির রাসায়নিক পরিমাপ ইত্যাদি। এছাড়াও শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে বা শারীরিক ফিটনেস ট্র্যাক করতেও ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার করা হয়।

ডিজিটাল স্কেল নির্ভুলতা, সহজে ব্যবহারযোগ্যতা এবং বহুমুখী সুবিধার জন্য ঐতিহ্যবাহী দাঁড়িপাল্লা বা যান্ত্রিক স্কেলের চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয়। এটি ওজন পরিমাপের প্রক্রিয়াকে দ্রুত, ত্রুটিমুক্ত এবং সুবিধাজনক করে তোলে। ডিজিটাল স্কেলে সূক্ষ্ম সেন্সর থাকে, যার ফলে এর ত্রুটির হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। এটি একদম নিখুঁত ফলাফল প্রদান করে। এর ডিজিটাল স্ক্রিনে (LCD/LED) ওজন খুব পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। ফলে চোখের আন্দাজে ভুল পড়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এর বোতাম চেপে খুব সহজেই ওজন গ্রাম থেকে কিলোগ্রাম, পাউন্ড বা আউন্সে পরিবর্তন করা যায়। ডিজিটাল স্কেলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ‘টেয়ার’ বা ‘জিরো’ (Zero) সুবিধা। এর মাধ্যমে পাত্রের ওজন বাদ দিয়ে শুধু ভেতরের জিনিসপত্রের প্রকৃত ওজন মাপা যায়। ওজনের তারতম্য বোঝার জন্য ঘরে অথবা জিমে ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার করা হয়। এটি শরীরের সঠিক ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। রান্নায় সঠিক স্বাদ ও টেক্সচার বজায় রাখতে ডিজিটাল কিচেন স্কেল অপরিহার্য। এটি দিয়ে উপাদানগুলো একদম নিখুঁত মাপে নেওয়া যায়, যা বেকিংয়ের ক্ষেত্রে খুবই জরুরি। ঔষধ ও রাসায়নিকের সঠিক পরিমাপের জন্য আধুনিক ডিজিটাল স্কেল ব্যবহৃত হয়। মালামালের ওজন সঠিকভাবে নির্ণয় করে মূল্য নির্ধারণে এবং পণ্য পরিবহনে বা গুদামে এটি বহুল ব্যবহৃত হয়।

বর্তমানে ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় বড় শপিং মল এবং বিভিন্ন ব্রান্ডের সুপার স্টোরগুলোতে বিভিন্ন পণ্যদ্রব্যের ওজন পরিমাপ করার জন্য ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার করা হয়। ডিজিটাল স্কেলের আবির্ভাব পণ্যদ্রব্যের পরিমাপকে দ্রুত, নির্ভুল ও সহজ করেছে। বিভিন্ন সুবিধা থাকার পরেও বর্তমানে ডিজিটাল স্কেলের অপব্যবহার হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা পণ্যদ্রব্য বিক্রির সময় কৌশলে ডিজিটাল স্কেলে ওজনে কারচুপি করছেন। ডিজিটাল স্কেলে কারচুপি করার জন্য অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের আধুনিক ও সাধারণ কৌশল ব্যবহার করে থাকেন। যেমন; ডিজিটাল স্কেলের ভেতরের মূল মাদারবোর্ড বা আইসি (IC) পরিবর্তন করে নির্ধারিত ওজনের চেয়ে বেশি ওজন সেট করা হয়। রিমোট কন্ট্রোল বা নির্দিষ্ট গোপন বাটন চেপে স্কেলের রিডিং বদলে দেওয়া হয়। এভাবে ১ কেজি ওজনের কোনো বস্তু ডিজিটাল স্কেলে রাখলে স্কেলে ১ কেজির বেশি ওজন দেখাবে। এক্ষেত্রে ডিজিটাল স্কেলের ভিতরে একটি ছোট রিমোট কন্ট্রোল চিপ বসানো থাকে। দূর থেকে পকেটে থাকা রিমোটের বাটন চেপে ওজন বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ক্রেতা চলে যাওয়ার পর আবার বাটন চেপে স্কেল স্বাভাবিক করা হয়। অনেক সময় ওজনে কারচুপি করার জন্যডিজিটাল স্কেলের নিচের অংশে শক্তিশালী চুম্বক লুকিয়ে রাখা হয়। লোহার তৈরি পণ্য ওজন করার সময় চুম্বকের আকর্ষণে ওজন বেশি দেখায়। ডিজিটাল স্কেলের প্লেটের নিচে অদৃশ্য সুতা বা স্প্রিং বেঁধে নিচের দিকে টেনেও পণ্যদ্রব্যের ওজন বাড়ানো হয়। ডিজিটাল স্কেলের ওজন সেটআপ করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ওজন দিয়ে ক্যালিব্রেশন করা হয়, যেমন; ৯০০ গ্রামের একটি বাটখারাকে সফটওয়্যারে ১ কেজি হিসেবে সেট করা হয়। এর ফলে স্কেলটি সবসময় প্রতি কেজিতে ১০০ গ্রাম কম ওজন দেবে। বাতাস ও ফ্যানের বাতাস ব্যবহার করেও ডিজিটাল স্কেলের ওজনে কারচুপি করা হয়। পরিমাপের সময় ডিজিটাল স্কেলের ওপর বা পাশ থেকে তীব্র বাতাস বা ফ্যানের বাতাস দেওয়া হয়। বাতাসের চাপের কারণে স্কেলের রিডিংয়ে ওজন বেশি প্রদর্শন করে। ডিজিটাল স্কেলে চার্জ কম থাকলে বা ত্রুটিপূর্ণ ব্যাটারি ব্যবহার করা হলে অথবা অনেক সময় ডিজিটাল স্কেলের ব্যাটারির ভোল্টেজ কমে গেলে রিডিং ভুল দেখায়। অসাধু বিক্রেতারা ইচ্ছাকৃতভাবে কম চার্জে ডিজিটাল স্কেল চালিয়ে ক্রেতাকে ঠকায়। অনেক সময় অসাধু বিক্রেতারা ডিজিটাল স্কেলের সামনের স্ক্রিন নষ্ট করে রাখে তখন ক্রেতারা চাইলেও স্কেলের রিডিং দেখতে পারে না। অনেক সময় অসাধু বিক্রেতারা এমন স্থানে ডিজিটাল স্কেল রাখে যেখান থেকে ক্রেতাদের ডিজিটাল স্কেলের রিডিং দেখা সম্ভব হয় না। অসাধু ব্যবসায়ীরা ডিজিটাল স্কেলের কারসাজির মাধ্যমে ওজনে কম দিয়ে সাধারণ জনতাকে প্রতিনিয়ত ঠকাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির আড়ালে ক্যালিব্রেশন পরিবর্তন, রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার বা চতুর কৌশলে ওজন পরিমাপে কম দেওয়ার এই প্রতারণা রুখতে সঠিক পরিমাপ ও কারচুপির উপায়গুলো জানা অত্যন্ত জরুরি।

অসাধু বিক্রেতাদের ডিজিটাল স্কেলের ওজনে কারচুপি মাধ্যমে ঠকতে না চাইলে পণ্যদ্রব্য ক্রয় করার সময় কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে। ডিজিটাল স্কেলের প্রতারণা বা ওজনে কারচুপি থেকে বাঁচতে পণ্য পরিমাপের সময় সোজাসুজি ডিজিটাল স্কেলের ডিসপ্লের দিকে তাকাতে হবে, পণ্য ওজন করার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে, ডিজিটাল স্কেলের রিডিং ‘0.00’ দেখাচ্ছে কিনা। কোনো পাত্রে পণ্য মাপার সময় পাত্রের ওজন বাদ দেওয়ার জন্য ‘Tare’ বা ‘Zero’ বোতাম চেপে স্কেল শূন্য করা হয়েছে কিনা তা দেখতে হবে। বাজারের ব্যাগে একটি আদর্শ ও প্রমাণিত ওজনের বস্তু (যেমন: ৫০০ গ্রাম বা ১ কেজি ওজনের নির্দিষ্ট পাথর বা প্যাকেটজাত পণ্য) রাখা যেতে পারে। প্রয়োজনে সন্দেহ হলে তা দিয়ে ডিজিটাল স্কেলটি পরীক্ষা করে নেয়া যাবে। অনেক সময় ডিজিটাল স্কেলে আগে থেকেই ১০০-১৫০ গ্রাম ওজন বাড়িয়ে বা কমিয়ে সেট করা থাকতে পারে। এটি ধরার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সবসময় নিজের পকেটে থাকা স্মার্টফোনটির ওজন আগে থেকে জেনে রাখা এবং প্রয়োজনে তা মেশিনে মেপে দেখা যেতে পারে। পণ্যদ্রব্য পরিমাপের সময় মেশিনটি যেন কাঠের বা পাথরের সমতল ও শক্ত জায়গায় থাকে তা খেয়াল রাখতে হবে। বাঁকা বা নড়বড়ে জায়গায় ডিজিটাল স্কেল বসালে সঠিক ওজন আসে না। মাছ, মাংস বা সবজির ক্ষেত্রে ওজন করার সময় বিক্রেতা যেন তার হাত দিয়ে মেশিন বা বস্তুর ওপর চাপ না দেয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পণ্য কেটে-কুটে পরিষ্কার করার আগে ওজন মেপে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। পরিমাপে কারচুপি হচ্ছে মনে হলে আশেপাশের অন্য কোনো দোকানে বা যাচাই করার জন্য আলাদা ডিজিটাল স্কেলে পণ্যের ওজন পুনরায় মেপে নেয়া যেতে পারে। যে দোকানে বিক্রেতার ডিজিটাল স্কেলের মনিটর নষ্ট বা চার্জ নেই সেই দোকান থেকে পণ্যদ্রব্য না কেনাই ভালো। পণ্যদ্রব্য ক্রয় করার সময় যদি দেখা যায় যে, বিক্রেতার ডিজিটাল স্কেলের মনিটর অন্য দিকে ফেরানো তাহলে বিক্রেতাকে ডিজিটাল স্কেলের মনিটর ক্রেতার দিকে ফেরাতে বলতে হবে। পণ্যদ্রব্য পরিমাপের সময় ডিজিটাল স্কেলের চারপাশ পরিষ্কার আছে কিনা এবং নিচে কোনো অতিরিক্ত তার বা সুতা ঝুলছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। বিক্রেতার ব্যবহৃত ডিজিটাল স্কেলে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) এর সিল বা ভেরিফিকেশন স্টিকার লাগানো আছে কিনা তা পরিমাপের সময় পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্মে ওজন ও পরিমাপের ক্ষেত্রে সততা, স্বচ্ছতা এবং সঠিকতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সকল ধর্মেই লেনদেনে কোনো প্রকার প্রতারণা বা ওজনে কম দেওয়াকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ফলে বর্তমান যুগে ওজনের জন্য ডিজিটাল স্কেল ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মূলনীতি ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি হলো; ইসলাম ধর্মে ওজনের ক্ষেত্রে ১০০% সততা বজায় রাখা ফরজ বা বাধ্যতামূলক। ডিজিটাল স্কেল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ইসলামী নীতি অনুযায়ী মাপে কোনো কারচুপি করা সম্পূর্ণ হারাম। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা মাপে পূর্ণতা দান করো এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করো। এটা উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্ট’। (সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ৩৫)। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ব্যবসায়ীদের সততার সাথে পরিমাপ ও ওজন করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ওজনে কম দেওয়াকে পূর্ববর্তী উম্মতদের ধ্বংসের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যারা মাপে কম দেয়, তাদের জন্য কুরআনে কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে (সূরা আল-মুতাফ্ফিফীন, আয়াত: ১-৩)। হাদিস অনুযায়ী, ওজনে কম দিলে সমাজে দুর্ভিক্ষ ও অভাব দেখা দেয়। ডিজিটাল প্রযুক্তি একটি নেয়ামত ও আশীর্বাদ, যা মানুষের কাজকে নির্ভুল ও সহজ করেছে। তাই পণ্যদ্রব্য ক্রয়- বিক্রয় বা অন্যান্য ব্যবসায় ওজনের সঠিকতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার করা জায়েজ ও প্রশংসনীয়, তবে স্কেলে ইচ্ছাকৃত কোনো ত্রুটি বা টেম্পারিং করা উচিৎ নয়। খ্রীষ্ট ধর্ম মতে, বাইবেলে সঠিক ওজন ও পরিমাপের বিষয়টিকে সরাসরি ঈশ্বরের ন্যায়বিচারের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। বাইবেলের ‘হিতোপদেশ’ এ বলা হয়েছে, ‘প্রতারণাপূর্ণ দাঁড়িপাল্লায় সদাপ্রভু ঘৃণা করেন, কিন্তু সঠিক বাটখারা বা পরিমাপ তাঁর আনন্দ।’ হিন্দু বা সনাতন ধর্মে সত্যবাদিতা (সত্য) এবং ন্যায়পরায়ণতা (ধর্ম) জীবনের মূল ভিত্তি। ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেনে সততা বজায় রাখাকে পুণ্যের কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সকল ধর্মেই পরিমাপে বা ওজনে কারচুপি করাকে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ বা অধর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়, যা মানুষের কর্মফল ও আত্মিক উন্নতির পথে বাধা।

ডিজিটাল স্কেলে কারসাজি করে ওজনে কম দেয়া হলে তা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ডিজিটাল স্কেল বা ওজনে কারচুপি ও এর মাধ্যমে প্রতারণার বিষয়টি মূলত বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI)-এর আইন এবং সাধারণ দণ্ডবিধির আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, বাটখারা বা ওজন পরিমাপের যন্ত্রে (যেমন: ডিজিটাল স্কেল) কারচুপি, সিল টেম্পারিং বা ডিজিটাল প্রোগ্রামে পরিবর্তন এনে ওজনে কম দেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রথম বার অপরাধের জন্য শাস্তি ১ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দন্ডিত করা হতে পারে। দ্বিতীয় বা পরবর্তী অপরাধের জন্য শাস্তি সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড, ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দন্ডিত করা হতে পারে। ডিজিটাল স্কেলে ডিজিটাল ডিভাইস বা প্রোগ্রামিং ব্যবহার করে প্রতারণার আশ্রয় নিলে তা সাইবার আইনের আওতাভুক্ত অপরাধ হতে পারে। ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার করে প্রতারণা করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। ১৮৬০ সালের পেনাল কোডের ৪২০ ধারা অনুযায়ী, প্রতারণার মাধ্যমে কারও থেকে অর্থ বা সম্পত্তি আত্মসাৎ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ওজনে কম দিয়ে পণ্যের বেশি দাম নেয়া এই ধারার অধীনে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ৪৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো বিক্রেতা প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনে পণ্য সরবরাহ করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এতে জেল, জরিমানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা  করার বিধান রয়েছে এবং আরোপকৃত জরিমানার ২৫% তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগকারী ভুক্তভোগীকে প্রদান করা হয়ে থাকে।

পণ্যদ্রব্য ক্রয়ের সময় বিক্রেতা কর্তৃক ওজনে কম দেওয়া বা ডিজিটাল স্কেলে পণ্যদ্রব্য পরিমাপের ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রমাণ (যেমন- পণ্যের ওজনসহ ছবি, ভিডিও, রসিদ) সংরক্ষণ করতে হবে। ওজন বা পরিমাপের প্রতারণা থেকে প্রতিকার পেতে সরাসরি বিএসটিআই (BSTI)-এর জেলা কার্যালয়ে অথবা বিএসটিআই (BSTI)-এর হটলাইন নম্বর ১৬১১৯ এ যোগাযোগ করে অভিযোগ দাখিল করা যেতে পারে। এছাড়া সরাসরি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এর জেলা কার্যালয়ে বা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এর হটলাইন নম্বর ১৬১২১ এ যোগাযোগ করে অথবা এই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে অভিযোগ দাখিল করা যেতে পারে। ডিজিটাল স্কেল হলো পরিমাপের একটি আধুনিক ও উন্নত মাধ্যম। ইসলাম ধর্মসহ সকল ধর্মে ওজন পরিমাপের যন্ত্র কি হবে তা নিয়ে কথা বলে না বরং ওজন পরিমাপের সময় মানবিক সততা ও নৈতিকতা বজায় রাখার ওপর জোর দেয়। ডিজিটাল স্কেলের মাধ্যমে যদি সততার সাথে পূর্ণ ও সঠিক ওজন পরিমাপ নিশ্চিত করা হয়, তবে তা হবে সকল ধর্মের নৈতিক শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

লেখক: সামাজিক বৈষম্য ও উন্নয়ন বিশ্লেষক।


ডেল্টা টাইমস্/মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ/আইইউ








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ