যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা, দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং হিজবুল্লাহ, হামাসসহ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থনের অবসান ঘটানো। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত তাঁর এসব উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য থেকে সরে যেতে হয়েছে এবং তিনি এমন অবস্থায় সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, যেখানে ইরান কেবল তাঁকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা পারমাণবিক বোমা তৈরি করবে না এবং ভবিষ্যতে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও আলোচনা করবে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে যেগুলো ধনী, সেসব দেশের মানুষ গত কয়েক দশক ধরে যুদ্ধকে দেখেছেন টেলিভিশনের পর্দায়। এত দিন যুদ্ধ হয়েছে তাঁদের প্রতিবেশী গরিব দেশগুলোতে-ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিনের গাজায়; কিন্তু নিজেদের দেশে নয়। এই মানুষগুলো এত দিন নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত ছিল। কারণ পশ্চিমা দেশগুলো তাদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের ফলে এই নিরাপত্তার ভ্রম ভেঙে গেছে। এই সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাবোধকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিয়েছে। তাদের প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। তাদের মাটিতে থাকা আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলো তাদের রক্ষা করতে তো পারেইনি; উল্টো সেগুলো হাজার হাজার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ আপাতত থেমে গেছে বলে মনে হলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা তৈরি হচ্ছে, তা তাদের ওপর ইরানের হুমকি কমাতে বিশেষ সাহায্য করবে না।
এই উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি অঞ্চলের একাধিক আরব নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করে এমন কিছু করবে না। তবুও এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। নিজেদের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠায় তারা এখন সামরিক শক্তি বাড়াতে ও প্রতিরক্ষায় আরও বেশি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। গত এক দশকের বড় বড় উন্নয়নমূলক ও আশাবাদী প্রকল্পের জায়গায় এখন নতুন এক সতর্ক মানসিকতা দেখা যাচ্ছে। কাতারের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা খালিদ আল-জাবের বলেন, এই যুদ্ধ এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এই ক্ষত সারাতে অনেক সময় লাগবে। গত কয়েক মাসে দুবাই ও দোহার মতো শহরে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে অকল্পনীয় ছিল। তাঁরা সেখানে বড় বড় বিস্ফোরণ দেখেছেন, বিলাসবহুল অট্টালিকাকে জ্বলতে দেখেছেন। যুদ্ধের সময় মিসাইল হামলার সতর্কবার্তা মোবাইলে বেজে উঠলে বাবা-মায়েরা সন্তানদের নিয়ে বাড়ির করিডরে আশ্রয় নিতেন। আমিরাতে কয়েক সপ্তাহ স্কুল বন্ধ ছিল এবং অনেক ধনী বিদেশি বাসিন্দারা দেশ ছেড়ে চলে যান। এই পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করতে গেলে অনেকেই শুধু তিন দশকেরও বেশি আগে কুয়েতে ইরাকের আগ্রাসনের কথাই মনে করতে পারছেন। উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও ৩০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য সফরের অংশ হিসেবে বাহরাইনের আল-সাখির প্রাসাদে দেশটির বাদশাহ হামাদ বিন ইসা আল-খলিফার সঙ্গে করমর্দন করছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংকট ও উপসাগরীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করার লক্ষ্যে রুবিওর এ সফর। দুবাইয়ের একটি গবেষণা সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ বাহারুন বলেন, এই যুদ্ধ গোটা অঞ্চলে এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের পদক্ষেপ এমন এক মানসিকতা তৈরি করেছে, যেখানে সহজেই শক্তি প্রয়োগকে স্বাভাবিক বলে মনে করা হচ্ছে। মোহাম্মদ বাহারুন বলেন, এখন পরিস্থিতি অনেকটা বুনো পশ্চিমের মতো হয়ে গেছে। তাঁর কথায়, যুদ্ধবিরতি বারবার খুব সহজেই ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আর এ নিয়ে কারও কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। এসব কারণে প্রত্যেক দেশ এখন ইরানের প্রতি নিজেদের মতো করে নীতি গ্রহণ করছে। ফলে এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে একত্রিত করার বদলে তাদের মধ্যে বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের জোট আরও শক্তিশালী করেছে। কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়েছে। সৌদি আরব নিজেদের বিকল্প খোলা রাখার চেষ্টা করছে। একদিকে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে চায়, অন্যদিকে তারা ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখছে।অন্যদিকে ওমান হরমুজ প্রণালিতে পরিষেবা ফি আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করায় ট্রাম্পের অসন্তোষের কারণ হয়েছে। এই প্রণালি দিয়েই উপসাগরীয় দেশগুলো তেল ও গ্যাস রপ্তানি করে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো, ইরানের কার্যত এই প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। ভবিষ্যতে ইরান আবারও এটি বন্ধ করতে পারে-এই আশঙ্কা এখন পুরো অঞ্চলের ওপর ভর করছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে, কীভাবে তেল, খাদ্য এবং অন্যান্য পণ্য তাদের দেশে আনা-নেওয়া করা হবে।
আমিরাত সরকার এখন ‘হরমুজ নির্ভরতা শূন্য’ নীতি গ্রহণ করেছে। তারা প্রণালির বাইরে নতুন বন্দর গড়ে তুলছে এবং তেল পাইপলাইন ও রেলপথ নির্মাণ করছে। অন্যদিকে সাধারণত শান্তশিষ্ট বলে পরিচিত ওমান এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সেখান থেকে স্থলপথে পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে। এই সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যেও বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে-এই সংঘাত কি সত্যিই শেষ হয়েছে? কাতারের গবেষক আল-জাবের বলেন, তাঁদের ভয় হচ্ছে, এই যুদ্ধ হয়তো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
প্রকাশ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। কারণ এই সংঘাত তাদের দেশগুলোর জন্য এতটাই ক্ষতিকর ছিল যে খুব কম লোকই চেয়েছিলেন এটি আরও দীর্ঘস্থায়ী হোক। গত মাসে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-সেভেন বৈঠকে আমিরাতের প্রভাবশালী নেতা শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আপনার সমর্থন ও আপনার বন্ধুদের প্রতি অঙ্গীকারের জন্য ধন্যবাদ। এটা আমাদের কাছে অনেক বড় বিষয়, আর আপনি আমাদের দেখিয়েছেন আসল মিত্র কে।’ তবে পর্দার আড়ালে চিত্রটা অন্যরকম। বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর বহু কর্তা তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে এক ধরনের হতাশা ও অসন্তোষ অনুভব করছেন।যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক যে চুক্তি হয়েছে, তাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর মূল উদ্বেগের বিষয়গুলো প্রায় উল্লেখই করা হয়নি। এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর তেলের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে। এটি ইরানের অর্থনীতির জন্য বড় সুবিধা হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া মার্কিন কর্মকর্তারা প্রস্তাব দিয়েছেন, ইরানের পুনর্গঠনের জন্য তিন শ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিলে উপসাগরীয় দেশগুলোও অবদান রাখতে পারে।
কিন্তু এই প্রস্তাব অঞ্চলটিতে খুব একটা ভালোভাবে গ্রহণ করা হয়নি। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে একটি বড় উদ্বেগ থেকেই গেছে। বাহরাইনের গবেষক মাহদি ঘুলুমের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে এমন একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা কিছুটা কমে গেছে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হুমকি হয়তো আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে একটি বড় উদ্বেগ থেকেই গেছে। তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর উচিত ইরানের সঙ্গে নিজেদের উদ্যোগে আলাদা করে আলোচনা শুরু করা, এমনকি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তির পথও খোঁজা যেতে পারে। এই যুদ্ধের মধ্যে কিছু ইতিবাচক দিকও থাকতে পারে। এই সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও শক্তিশালী ও অভিযোজনক্ষম করে তুলেছে। তবে যত কথাই বলা হোক, শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের এই সমঝোতা স্মারক একটি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত। এর রাজনৈতিক মূল্য যা-ই হোক না কেন, সংঘাত যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে হবে। এই ভুলভাবে পরিকল্পিত যুদ্ধ শেষ হতে যাচ্ছে দেখে গবেষকরা স্বস্তি অনুভব করছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন আবারও সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে না-এটা নিশ্চিত করার মতো নিশ্চয়তা এখানে খুব একটা নেই। বারাক ওবামার আমলের জেসিপিওএ আলোচনায় অংশ নেওয়া মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা রবার্ট ম্যালি লিখেছেন, এই দুই চুক্তির তুলনা করা খুব একটা অর্থবহ নয়। কারণ, এগুলো মৌলিকভাবে ভিন্ন দুটি চুক্তি, যা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে হয়েছে। মূল কথা হলো, এই সমঝোতা স্মারক বর্তমানে যেকোনো বিকল্প প্রস্তাবের তুলনায় অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।’ আর এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক রাজনীতি কোনদিকে মোড় নেয় সেটাই দেখার বিষয়।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।
ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই