
ফাইল ছবি
আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের বিকাশে ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের অবদান অনস্বীকার্য। টমাস হবস রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিয়ে, জন লক ব্যক্তি-অধিকার নিয়ে, জ্যাঁ-জাক রুশো জনগণের সার্বভৌমত্ব নিয়ে, কার্ল মার্ক্স অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে, আন্তোনিও গ্রামশি সাংস্কৃতিক আধিপত্য নিয়ে এবং মিশেল ফুকো ক্ষমতার বহুমাত্রিক রূপ নিয়ে গভীর তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। তাঁদের চিন্তাধারা বিশ্বরাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
তবে প্রতিটি রাজনৈতিক দর্শনই জন্ম নেয় একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে। ইউরোপীয় রাজনৈতিক দর্শনের পেছনে ছিল সামন্ততন্ত্র, ধর্মীয় সংস্কার, শিল্পবিপ্লব, আলোকায়ন এবং পুঁজিবাদের উত্থানের অভিজ্ঞতা।
অন্যদিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ ধরে—ঔপনিবেশিক শাসন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-পরবর্তী পুনর্গঠন, সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতির বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। ফলে একই তত্ত্ব ভিন্ন সমাজে প্রয়োগ করলে ফলাফলও ভিন্ন হতে পারে।
সে কারণে বাংলাদেশের জন্য পশ্চিমা দর্শন গ্রহণের অর্থ হওয়া উচিত সমালোচনামূলক গ্রহণ, অন্ধ অনুকরণ নয়। যেসব ধারণা আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেগুলো গ্রহণযোগ্য হতে পারে। আর যেসব প্রশ্নের উত্তর পশ্চিমা তত্ত্বে পাওয়া যায় না, সেগুলোর উত্তর আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির আলোকেই নির্মাণ করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হতে পারে—জাতীয় সার্বভৌমত্ব, জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার, উৎপাদনমুখী ও স্বনির্ভর অর্থনীতি, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ। এই দর্শনের মূল লক্ষ্য হবে রাষ্ট্রকে কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পদে পরিণত না করে জনগণের কল্যাণে পরিচালিত করা।
অতএব বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিন্তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সক্ষমতার ওপর—আমরা কতটা বিশ্ব থেকে শিখতে পারি, আর একই সঙ্গে কতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের বাস্তবতার ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্রচিন্তা গড়ে তুলতে পারি। একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি অন্যের দর্শন মুখস্থ করে না; বরং বিশ্বজ্ঞানকে আত্মস্থ করে নিজের জন্য নতুন দর্শন সৃষ্টি করে।