পরিচয়ের রাজনীতি ও নাগরিকের রাষ্ট্র

মুহাম্মদ আজগর হোসেন জিহাদ:

মতামত

পরিচয় রাজনীতি (Identity Politics) আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এর উদ্ভব মূলত সেই সব জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা

2026-06-28T11:28:37+06:00
2026-06-28T11:30:02+06:00
মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

পরিচয়ের রাজনীতি ও নাগরিকের রাষ্ট্র
মুহাম্মদ আজগর হোসেন জিহাদ:
প্রকাশ: রোববার, ২৮ জুন, ২০২৬, ১১:২৮ এএম  আপডেট: ২৮.০৬.২০২৬ ১১:৩০ এএম  (ভিজিট : ৪৩)

পরিচয় রাজনীতি (Identity Politics) আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এর উদ্ভব মূলত সেই সব জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা ও স্বীকৃতির প্রশ্নকে কেন্দ্র করে, যারা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, বঞ্চনা কিংবা প্রান্তিকতার শিকার। এ অর্থে পরিচয় রাজনীতি বহু ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, সমতা ও সামাজিক স্বীকৃতির আন্দোলন হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তবে রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে পরিচয় রাজনীতির কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিশেষত, যখন এটি নাগরিকত্বের ধারণাকে ছাপিয়ে রাজনীতির প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়, তখন সমাজে নতুন ধরনের বিভাজন ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

পরিচয় রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি মানুষকে প্রথমত একজন ব্যক্তি বা নাগরিক হিসেবে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান, সামাজিক অভিজ্ঞতা ও নাগরিক দাবিকে তার ব্যক্তিসত্তার পরিবর্তে গোষ্ঠীগত পরিচয়ের আলোকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা তৈরি হয়।

এর ফলে নাগরিকের সমস্যা আর কেবল নাগরিকের সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয় না; বরং তা ধীরে ধীরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিযোগিতা কিংবা সংঘাতের অংশে পরিণত হতে পারে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার কিংবা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো তখন সমান নাগরিক অধিকারের বিষয় হিসেবে নয়, বরং পরিচয়ভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব হিসেবে উপস্থাপিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা রাষ্ট্রের জন্য একটি জটিল সংকট সৃষ্টি করতে পারে। কারণ রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ের মানুষকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সমান নাগরিক হিসেবে যুক্ত করা। কিন্তু যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু নাগরিকত্বের পরিবর্তে গোষ্ঠীগত পরিচয় হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের অভিন্ন নাগরিক ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হতে শুরু করে।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে মানুষের পরিচয় অস্বীকার করতে হবে। ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি, জাতিগত ঐতিহ্য কিংবা সামাজিক অভিজ্ঞতা মানুষের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র অবশ্যই এই বৈচিত্র্যকে সম্মান করবে এবং সকল পরিচয়ের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে।

কিন্তু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভিত্তি যদি কেবল পরিচয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সমান নাগরিকত্বের ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ তখন মানুষ নিজেকে প্রথমে নাগরিক হিসেবে নয়, বরং একটি পৃথক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ভাবতে শুরু করে। এর ফলে জাতীয় ঐক্যের পরিবর্তে গোষ্ঠীগত বিভাজন গভীরতর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

আধুনিক রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য তাই একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য অপরিহার্য। একদিকে মানুষের বহুমাত্রিক পরিচয়ের স্বীকৃতি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে নাগরিকত্বের অভিন্ন ভিত্তিকেও সমানভাবে শক্তিশালী করতে হবে। এই ভারসাম্য রক্ষা করা না গেলে বহুত্ববাদ সহজেই বিভাজনে রূপ নিতে পারে এবং নাগরিক সংহতি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

একটি পরিপক্ব রাষ্ট্র মানুষের পরিচয়কে সম্মান করে, কিন্তু তার রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেয় নাগরিকত্বকে। কারণ পরিচয় মানুষকে বৈচিত্র্যময় করে, আর নাগরিকত্ব সেই বৈচিত্র্যের মধ্যেই মানুষকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে যুক্ত করে।

রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি শক্তি পরিচয়ের প্রতিযোগিতায় নয়; বরং সমান মর্যাদা, সমান অধিকার ও সমান নাগরিকত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা যৌথ অংশীদারিত্বে নিহিত।

অতএব, আধুনিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত—পরিচয়ের স্বীকৃতি, কিন্তু নাগরিকত্বের অগ্রাধিকার; বৈচিত্র্যের সম্মান, কিন্তু রাজনৈতিক সমতার ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা।

পরিচয় মানুষের বাস্তবতা, কিন্তু নাগরিকত্ব রাষ্ট্রের ভিত্তি। তাই পরিচয়ের স্বীকৃতি যেমন অপরিহার্য, তেমনি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত সমান নাগরিকত্ব।"

লেখক : রাস্ট্রচিন্তক ও রাজনৈতিক।

ডেল্টা টাইমস/মুহাম্মদ আজগর হোসেন জিহাদ/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ