আধুনিক ও দুর্যোগ সহনশীল ময়মনসিংহের স্বপ্ন নিয়ে গঠিত ‘ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (মউক) জাতীয় সংসদে স্থায়ী আইন হিসেবে পাস হওয়া এক অনন্য মাইলফলক। তবে এর ভৌগোলিক সীমানা কেবল বিভাগীয় সদরের সিটি কর্পোরেশন এলাকার মধ্যে আটকে রাখা গভীর আশঙ্কার জন্ম দেয়। মউক’র এখতিয়ার এই সংকীর্ণ নগর-গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকলে তা অদূর ভবিষ্যতে পুরো জেলা-জুড়ে পরিবেশগত ও কাঠামোগত বিপর্যয় ডেকে আনবে। সাড়ে চার হাজার বর্গকিলোমিটারের বিশাল ময়মনসিংহের টেকসই রূপান্তরের জন্য সবকটি উপজেলাকে মউকের মহাপরিকল্পনার আওতায় আনা বড় কৌশলগত দাবি।
নগর পরিকল্পনার সফল মডেলগুলো এই দাবির যৌক্তিকতা প্রমাণ করে। ১৯৫৬ সালে রাজউকের পূর্বসূরি ‘ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট’ (ডিআইটি) সীমিত সীমানা নিয়ে যাত্রা করলেও, মূল ঢাকাকে বাঁচাতে এবং বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে পরবর্তীতে সাভার, কেরানীগঞ্জ, টঙ্গী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জকে যুক্ত করে রাজউকের সীমানা দেড় হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি বিস্তৃত করা হয়। সাভারকে এই মহাপরিকল্পনায় যুক্ত করার ফলেই সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ইপিজেডের মতো জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন স্থাপনা সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল।
একই দূরদর্শিতার নজির আমরা দেখতে পাই সাম্প্রতিককালের কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রেও, যার এখতিয়ার কেবল পৌরসভার সামান্য কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ না রেখে উখিয়া, টেকনাফ, রামু ও চকরিয়ার মতো সংবেদনশীল পরিবেশগত এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে। এই সাহসী সিদ্ধান্তের কারণেই সেখানে পাহাড় কাটা রোধ কিংবা প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অবৈধ বহুতল ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে। রাজউক বা কউক’র এই সফল নজিরগুলো ময়মনসিংহের নীতিনির্ধারকদের জন্য শিক্ষণীয় উদাহরণ।
প্রকৃতি কোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সীমানা মেনে চলে না। ময়মনসিংহের বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার দীর্ঘ ঐতিহাসিক পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ কেবল সিটি কর্পোরেশনের ভৌগোলিক সম্পত্তি নয়। এর উৎস, অববাহিকা এবং প্রবাহের সাথে জামালপুর থেকে শুরু করে ফুলপুর, সদর, ত্রিশাল, গফরগাঁও, ঈশ্বরগঞ্জ ও নান্দাইলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক অবিচ্ছেদ্য গভীর প্রতিবেশগত সংযোগ রয়েছে। নদের উৎসমুখ ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং দীর্ঘদিন অপরিকল্পিত খননের কারণে ব্রহ্মপুত্র শুষ্ক মৌসুমে ধুধু বালুচরের মরা খালে পরিণত হয়েছে, যা এখন কার্যত চারণভূমিতে রূপ নিয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের মিঠা পানির মাছের ঐতিহ্যবাহী জৈবভাণ্ডার ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ত্রিশটিরও বেশি দেশীয় সুস্বাদু মাছের প্রজাতি এখন বিলুপ্তপ্রায়।
একই সাথে মুক্তাগাছা, ফুলবাড়ীয়া কিংবা ভালুকার লাল মাটির পাহাড় এবং শালবনের নিজস্ব জলবায়ুগত গুরুত্ব রয়েছে। আমরা যদি কেবল সিটি কর্পোরেশন এলাকাকে আইন দিয়ে পরিপাটি ও পরিকল্পিত রাখি, অথচ এর ঠিক বাইরে সংলগ্ন উপজেলাগুলোতে নির্বিচারে জলাশয় ভরাট, নদী দখল কিংবা পাহাড় কাটা চলতে থাকে, তবে তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে মূল বিভাগীয় শহরে মারাত্মক জলাবদ্ধতা, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়ার মতো চরম বিপর্যয় দেখা দেবে।
পুরো জেলার এই সমান্তরাল ইকোসিস্টেম বা প্রতিবেশকে রক্ষা করতে হলে খণ্ডিত নগর পরিকল্পনা দিয়ে কোনো লাভ হবে না, প্রয়োজন একটি সামগ্রিক আঞ্চলিক ল্যান্ড-ইউজ জোনিং, যা কেবল জেলার সবকটি উপজেলাকে মউক’র অধীনে আনলেই কার্যকর করা সম্ভব।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকট তৈরি হচ্ছে ঢাকা-ময়মনসিংহ ফোর-লেন মহাসড়ককেন্দ্রিক ত্রিশাল-ভালুকা শিল্প করিডোরে। এই দুই উপজেলায় বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও দ্রুত বর্ধনশীল ম্যানুফ্যাকচারিং, টেক্সটাইল এবং ভারী ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব গড়ে উঠছে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল শিল্পাঞ্চলটি কোনো সুনির্দিষ্ট এবং পেশাদার আঞ্চলিক পরিকল্পনাবিদের তদারকি ছাড়াই স্রেফ স্থানীয় পৌরসভা বা উপজেলা পরিষদের কারিগরিভাবে অত্যন্ত দুর্বল ল্যান্ড-ইউজ পারমিটের ওপর ভর করে প্রতিনিয়ত অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে উঠছে। সুনির্দিষ্ট আঞ্চলিক জোনিং এবং পেশাদার তদারকির অভাবের কারণে ইতিমধ্যেই ভালুকা ও ত্রিশালের সুপেয় পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে গেছে।
কারখানার অপরিশোধিত বিষাক্ত কেমিক্যাল বর্জ্য সরাসরি স্থানীয় নদী-নালা ও খালে ফেলায় ঐতিহ্যবাহী ক্ষীরু নদীটি এখন আক্ষরিক অর্থেই একটি ‘আলকাতরার নদী’ বা বিষের নহরে পরিণত হয়েছে, যার পানি ঘন জেলি ও কুচকুচে কালো রূপ নিয়েছে।
এছাড়া, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বনের জমি দখল, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং স্থানীয়দের ভিটেমাটি কেড়ে নিয়ে অপরিকল্পিত কারখানা স্থাপন অব্যাহত রয়েছে। যদি এখনই মউক’র রিজিওনাল মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় এনে এই করিডোরের ইমারত নির্মাণ, জোনিং, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং লাখো শ্রমিকের আবাসনকে কঠোর নিয়মের মধ্যে না বাঁধা হয়, তবে আগামী এক দশকের মধ্যে এই সুফলা অঞ্চলটি আরেকটি অপরিকল্পিত, দূষিত, যানজটপ্রবণ ও অবাসযোগ্য গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জে পরিণত হবে। টেকসই শিল্পায়নের স্বার্থেই এই করিডোরের লজিস্টিকস ও অবকাঠামো মউক’র একক নিয়ন্ত্রণে আসা বাধ্যতামূলক।
একই সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নটি। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, ফুলপুর ও তারাকান্দার মতো উত্তর-সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলো এই অঞ্চলের প্রধান কৃষি ও মৎস্যভাণ্ডার। যদিও মউক’র মূল গেজেটে কৃষি ভূমি, বনভূমি, নিম্নভূমি ও জলাভূমি সংরক্ষণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন ও আশঙ্কাজনক। প্রবাসী রেমিট্যান্স এবং অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসার আগ্রাসনে প্রতিনিয়ত শত-শত একর তিন-ফসলি জমি বিলীন হয়ে বহুতল ভবন কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনা উঠছে। স্থানীয় পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদগুলোর এই জমির রূপান্তর ঠেকানোর মতো কোনো কারিগরি সক্ষমতা বা জনবল নেই।
পাশাপাশি, মউকের জেলাব্যাপী বিস্তৃতি কেবল নগরায়ণ নয়, বরং বিকেন্দ্রীকরণ ও সাংস্কৃতিক-প্রতিবেশগত সুরক্ষার মূল রক্ষাকবচ। বলা বাহুল্য, স্থানীয় প্রশাসনের সীমাবদ্ধতার কারণেই শালবন উজাড় বা প্লাবনভূমিতে ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণ রোধ করা যাচ্ছে না। তাই ‘উপ-শহর’ মডেল বাস্তবায়ন, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং ঈশ্বরগঞ্জে ইপিজেড স্থাপন ও ত্রিশাল বা মুক্তাগাছার ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে ‘হেরিটেজ জোন’ হিসেবে সুরক্ষা দিতে মউকের হাতেই সর্বোচ্চ আইনি ক্ষমতা থাকা আবশ্যক। মউক কেবল ‘নীতি নির্ধারক’ থাকবে না, বরং উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের মূল চালিকাশক্তি হবে; আর স্থানীয় প্রশাসন কাজ করবে কেবল এর সহায়ক উইং হিসেবে। এই একক ও কঠোর তদারকিই জেলাব্যাপী সার্কুলার ইকোনমি নিশ্চিত করার একমাত্র উপায়।
তাছাড়া, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার বহির্ভূত পৌরসভা এলাকাগুলোতে ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের জন্য গঠিত স্থানীয় ‘বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন কমিটি’ গুলো অত্যন্ত ভঙ্গুর ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। তারা ভবনের মাটির গুণগত মান, কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার মতো কারিগরি দিকগুলো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। ফলে গ্রামীণ শহরতলি ও পৌরসভাগুলোতে এখন সংকীর্ণ গলিপথের পাশে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হাইরাইজ অবকাঠামো গড়ে উঠছে, যা বাংলাদেশ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বা বিএনবিসি’র ন্যূনতম মানদণ্ডও মানে না। ১৩টি উপজেলার ভবন অনুমোদন এবং আবাসন প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ যদি মউক’র পেশাদার কারিগরি সেলের অধীনে আনা যায়, তবে একদিকে যেমন মূল্যবান তিন-ফসলি কৃষি জমি রক্ষা পাবে, অন্যদিকে পুরো জেলা একটি নিরাপদ ও ভূমিকম্প-সহনশীল কাঠামোর ওপর দাঁড়াবে।
মউকের সীমানা সম্প্রসারণের অন্যতম নিয়ামক এর সংবেদনশীল ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূ-রাজনীতি। মেঘালয় সীমান্ত সংলগ্ন ধোবাউড়া ও হালুয়াঘাটের মতো উপজেলাগুলো কেবল প্রান্তিক ভূখণ্ড নয়, বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার। বর্তমানে হালুয়াঘাটের গোবরাকুড়া ও কড়ইতলী স্থলবন্দর দিয়ে সীমিত পরিসরে বাণিজ্য চললেও, এখানে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সীমান্ত অঞ্চলের সড়ক অবকাঠামো, ল্যান্ড-ইউজ জোনিং এবং একটি আধুনিক ড্রাই-পোর্ট বা লজিস্টিকস পার্কের মহাপরিকল্পনা এখনই মউকের অধীনে বড় পরিসরে করা প্রয়োজন।
ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যা এবং আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানি প্রবাহের মতো প্রতিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হলে এই বর্ডার বেল্টের সামগ্রিক ড্রেনেজ নেটওয়ার্ককে মউক’র দূরদর্শী মহাপরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। এই সীমান্ত অঞ্চলকে যদি মউক’র পরিকল্পনার এখতিয়ারের বাইরে রাখা হয়, তবে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশ, দুটোই বাধাগ্রস্ত হবে।
একটি অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সচলতা ও মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ভর করে তার সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর। ময়মনসিংহের প্রান্তিক উপজেলাগুলো থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা ও জীবিকার তাগিদে জেলা সদরে বা এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় যাতায়াত করে। অথচ আমাদের বর্তমান আঞ্চলিক পরিবহন নেটওয়ার্ক অত্যন্ত খণ্ডিত ও সমন্বয়হীন। গফরগাঁও, ধোবাউড়া বা মুক্তাগাছার মতো উপজেলাগুলো যদি মউক’র মহাপরিকল্পনার বাইরে থাকে, তবে একটি নিখুঁত ‘আঞ্চলিক পরিবহন মহাপরিকল্পনা’ তৈরি করা কোনোদিনই সম্ভব হবে না, যার খেসারত হিসেবে মূল শহরের প্রবেশমুখগুলোতে আজীবন তীব্র যানজট লেগেই থাকবে।
তাই ময়মনসিংহকে খণ্ডিত শহর না ভেবে রাজউক বা কউকের মতো একটি সামগ্রিক ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতি জোর দাবি, অবিলম্বে বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জেলার সব উপজেলাকে মউকের সীমানাভুক্ত করা হোক। এর সাথে জেলাব্যাপী গেজেট প্রকাশ, স্থানীয় নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া মউকের ডিজিটাল ডাটাবেজে আনা, ত্রিশাল-ভালুকা গ্রিন করিডোর জোন গঠন এবং ব্রহ্মপুত্র নদ পুনরুদ্ধার মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তবেই জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার যাত্রায় ময়মনসিংহ একটি সুপরিকল্পিত ও আদর্শ জেলা হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
লেখক: পরিকল্পনাবিদ ও উন্নয়ন গবেষক।
ডেল্টা টাইমস/ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল/সিআর/এমই