সমৃদ্ধির নতুন দিগন্তে চীন-বাংলাদেশ

রায়হান আহমেদ তপাদার:

মতামত

বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী এবং ব্যাপক কৌশলগত ও সহযোগিতামূলক অংশীদার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর খুবই

2026-06-29T09:52:40+06:00
2026-06-29T09:52:40+06:00
মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

সমৃদ্ধির নতুন দিগন্তে চীন-বাংলাদেশ
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ৯:৫২ এএম   (ভিজিট : ২৭)

বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী এবং ব্যাপক কৌশলগত ও সহযোগিতামূলক অংশীদার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর খুবই গুরুত্ব দিচ্ছে চীন। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে স্থাপিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আমলে এই সম্পর্কের আরও উন্নয়ন হয়।তাই এখন বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করতে চায় চীন। বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় চীন বাংলাদেশের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে এটাই চীন কর্তৃপক্ষের অভিমত। চলতি মাসের ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে দুই প্রধানমন্ত্রী একান্ত বৈঠকে বসেন। আনুষ্ঠানিক বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়; যেমন: অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এবং খোলা মনে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো জোরদার করার লক্ষ্যে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়েও কথা হয়েছে এবং এ বিষয়ে চীন বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশ্বস্ত করেছে। বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বিষয়ক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ সহায়তা, জিডিআই, মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়তা, চীনের ভাষাশিক্ষা এবং গণমাধ্যমের নানা পরিসরে সহায়তা। 

বিনিয়োগ সহযোগিতায় চারটি চুক্তি ও বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি, গণমাধ্যম খাতে সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এ ছাড়া গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের ডিফারেন্ট কো-অপারেশন প্ল্যান, বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল রপ্তানি, চীনের ভাষা ম্যান্ডারিন স্কুল কারিকুলামে যুক্ত করা এবং টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশন কো-অপারেশনে পৃথক দুটি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যেও একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৬ জুন সকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের আলোচনায় দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও শিক্ষা, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বিনিময় ও সহযোগিতা জোরদার, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারি ইত্যাদি গুরুত্ব পায়। চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন সব সময় বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে এবং উভয় দেশের মৌলিক স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়গুলোতে পরস্পরকে সমর্থন অব্যাহত রাখবে। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি করতে চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চীনের সহযোগিতার কথা জানান। তিনি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় জোরদার করার ব্যাপারে চীনের আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন। এছাড়াও ২৫ জুন চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোয়োইং ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়। 

চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী এসব বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। সেদিন প্রধানমন্ত্রী চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের সঙ্গেও দলীয় পর্যায়ে বৈঠক করেন। লিউ হাইশিং বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করে দুই দলের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরো জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তারেক রহমান বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল নির্মাণে চীনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ঐতিহ্য ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। চীনে অবস্থানকালে বিভিন্ন বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ নির্বাহী, চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দেশের উন্নয়নযাত্রায় আরো কার্যকর অবদান রাখার আগ্রহ দেখান। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথকভাবে আরো দেখা করেন চীনভিত্তিক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান মেগা রিচ ইন্ডাস্ট্রিয়াল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা অংশীদার কেভিন উ, দেশটির শীর্ষস্থানীয় টেক্সটাইল ও পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হান্ডা গ্রুপের চেয়ারম্যান হান চুন এবং শীর্ষস্থানীয় অটোমোবাইল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান চেরি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ইন টংইউয়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৩ জুন চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) নিউ চ্যাম্পিয়নসের ১৭তম বার্ষিক সভায় অংশগ্রহণ করেন। তিনি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু সম্পর্কিত ঝুঁকির মুখে থাকা বাংলাদেশসহ বদ্বীপ অঞ্চলের অন্যান্য দেশকে সহায়তা করার জন্য ফোরামকে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানান। 

ওই সম্মেলনের ফাঁকে তিনি ডব্লিউইএফের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলোইস জুইংগির সঙ্গেও বৈঠক করেন। তিনি বাংলাদেশের নদ-নদীতে পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার, বন্যার ঝুঁকি হ্রাস এবং পরিবেশ সুরক্ষায় তাঁর পরিকল্পনার কথা অবহিত করে বলেন, বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহ দিতে কর প্রণোদনা চালু করেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আলোইস জুইংগি জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার আশাবাদ ব্যক্ত করে আশ্বাস দেন যে বাংলাদেশের উত্থাপিত বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হবে। এ ছাড়া তিনি ফোরামের পক্ষ থেকে সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। অর্থাৎ সব বৈঠকেই উভয় পক্ষের মধ্যে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়েছে। চীন ও বাংলাদেশ এবং তাদের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরো সম্প্রসারিত, জোরদার ও বহুমুখী করার অঙ্গীকার করা হয়। এই সফরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো যেমন বাংলাদেশ ও তার মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে বেগবান করার সুযোগ সৃষ্টি করবে, তেমনি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরো গভীর ও বহুমাত্রিক করার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত আলো দেখাবে। উভয় দেশ বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে লাভবান হওয়ার পথগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে তা উভয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে। দুই দেশের নেতাদের আলোচনাকে বাস্তবতায় রূপ দিতে পারলে গ্লোবাল সাউথ ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়বে, যা এশীয় শিল্প চেইন ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিকে সহজতর করবে।

চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে কূটনীতিতে তারা এখন পাবলিক ডিপ্লোমেসি’র দিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় ‘পিপল-টু-পিপল’ যোগাযোগ বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চীনের একটা বড় গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে প্রেক্ষাপট বদলেছে। ফলে চীনের মধ্যেও একধরনের ইমেজ সংকট তৈরি হয়েছিল, এখন চীন বাংলাদেশে তাদের এই ইমেজ সংকট কাটাতে পাবলিক ডিপ্লোমেসিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একটা নতুন তত্ত্ব প্রচার করছে চীন। এতকাল আমরা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে প্রথাগত হেজিমনির ধারণা দেখেছি, এর পরিবর্তে চীন এখন পারস্পরিক নির্ভরশীল হেজিমনির কথা বলছে। এই পারস্পরিক নির্ভরশীল হেজিমনি দিয়ে তারা বিশ্বকে বোঝাতে চাইছে যে বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থা আসলে একক কোনো পরাশক্তির নয়, বরং এটি একটি বহুমেরুর বিশ্ব। এখানে একাধিক পরাশক্তি একসঙ্গে সহাবস্থান করবে। এই পরাশক্তিগুলোর মধ্যে কৌশলগত ও সামরিক খাতে একধরনের প্রতিযোগিতা যেমন থাকবে, ঠিক তেমনি অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাতে তারা একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করে যাবে। বাংলাদেশের কোনো চিরস্থায়ী বন্ধু নেই এবং কোনো চিরস্থায়ী শত্রুও নেই। কেবল বাংলাদেশের স্বার্থই চিরস্থায়ী, আর বাংলাদেশের কর্তব্য হচ্ছে সেই স্বার্থ অনুযায়ী চলা। বাস্তবিক অর্থেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা বন্ধু বলতে কিছু নেই, রয়েছে শুধু চিরস্থায়ী স্বার্থ। এজন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজ নিজ স্বার্থে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, আবার যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই নিজ নিজ স্বার্থে রাষ্ট্র দুইটি ৪ দশকব্যাপী স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যেকার সম্পর্ক গড়ে উঠার প্রক্রিয়াটিকেও অনুরূপভাবে স্বার্থের মাপকাঠি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। 


লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ