মাদকের ভয়াল আগুনে পুড়ছে পরিবার, সমাজ ও দেশ

রেহানা ফেরদৌসী

মতামত

একজন বাবা নিজের সন্তানকে হত্যা করেছেন। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষ থেকে পৌঁছে গেছেন পুনর্বাসন কেন্দ্রে। একজন মা

2026-06-27T14:35:19+06:00
2026-06-27T15:40:05+06:00
মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

মাদকের ভয়াল আগুনে পুড়ছে পরিবার, সমাজ ও দেশ
রেহানা ফেরদৌসী
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ২:৩৫ পিএম  আপডেট: ২৭.০৬.২০২৬ ৩:৪০ পিএম  (ভিজিট : ৬৪)

একজন বাবা নিজের সন্তানকে হত্যা করেছেন। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষ থেকে পৌঁছে গেছেন পুনর্বাসন কেন্দ্রে। একজন মা শেষ সম্বল জমি বিক্রি করেও ছেলেকে নেশার অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেননি। এই তিনটি ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো একটি সমাজের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ার গল্প। এই গল্পের নাম মাদক।

শুক্রবার, ২৬ জুন ছিল আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য "বিশ্ব মাদক সমস্যা: চলমান সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং উদ্ভাবনী সমাধান।" প্রতিপাদ্যটি যতটা সময়োপযোগী, বাস্তবতা ততটাই কঠিন। কারণ আমরা প্রতি বছর দিবস পালন করি, সেমিনারে বক্তৃতা দিই, ব্যানার টাঙাই কিন্তু মাদকের বিস্তার থামে না। বরং নতুন রূপে, নতুন কৌশলে এটি ঢুকে পড়ছে আমাদের ঘরে, আমাদের সন্তানের মুঠোফোনে, আমাদের পাড়ার গলিতে।

মাদক নিয়ে আলোচনায় আমরা প্রায়ই সংখ্যায় হারিয়ে যাই। লাখ লাখ আসক্ত, কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য, শত শত অভিযান। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি মানুষের গল্প, একটি পরিবারের নীরব কান্না, একটি অপূর্ণ স্বপ্নের সমাধি। মাদককে কেবল অপরাধের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যায় না। এটি আসলে একটি সামাজিক মহামারি, যা ধীরে ধীরে গ্রাস করছে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি এবং জাতির ভবিষ্যৎ। বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে। কিশোর, শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী, এমনকি বিদ্যালয়গামী শিশুরাও আজ মাদকের ঝুঁকিতে। যে প্রজন্ম দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ হওয়ার কথা, সেই প্রজন্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নেশার জালে আটকে যাচ্ছে। এর চেয়ে বড় জাতীয় সংকট আর কী হতে পারে?

বাংলাদেশে মাদকের ধরন বদলেছে। ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইনের পাশাপাশি এখন আইস বা ক্রিস্টাল মেথ, এলএসডি এবং নানা ধরনের সিনথেটিক মাদকও দেশে ঢুকছে। মাদক ব্যবসায়ীরাও কৌশল বদলেছে। আগে যেখানে সীমান্তভিত্তিক সরবরাহের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল বেশি, এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গোপন ডেলিভারি নেটওয়ার্কে তা পৌঁছে যাচ্ছে ক্রেতার দোরগোড়ায়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এক্ষেত্রে বাড়তি সংকট তৈরি করেছে। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা এবং ভারত সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিলসহ নানা মাদক প্রবেশের অভিযোগ বহু পুরোনো। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাদকচক্রের সক্রিয়তা। ফলে এই সমস্যাকে কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে না দেখে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অপরাধের সমন্বিত চ্যালেঞ্জ হিসেবে মোকাবিলা করতে হবে।

এ প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়। বন্ধুমহলের চাপ, কৌতূহল, হতাশা, বেকারত্ব, সম্পর্কের ব্যর্থতা, পারিবারিক অশান্তি, সব মিলিয়ে একটি তরুণ সত্তাকে ঠেলে দেওয়া হয় নেশার দিকে। অনেকেই ভাবে, "একবার চেষ্টা করলে ক্ষতি কী?" কিন্তু মাদকের সবচেয়ে বড় প্রতারণা এখানেই। শুরু করা সহজ, বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। চিকিৎসকদের মতে, মাদক মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক রাসায়নিক ভারসাম্য ধ্বংস করে দেয়। হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি ও লিভারের জটিলতা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস থেকে শুরু করে বিষণ্নতা, হ্যালুসিনেশন, আক্রমণাত্মক আচরণ, একজন আসক্ত মানুষ ক্রমে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আর এই ক্ষতির ভার বহন করতে হয় পুরো পরিবারকে।

মাদকের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে পরিবারের ভেতরে। যে বাবা একদিন সন্তানের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, নেশার ঘোরে তিনিই হয়ে উঠছেন পরিবারের আতঙ্ক। যে সন্তান বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল, সে-ই হয়ে উঠছে দুঃস্বপ্ন। সংসারের সঞ্চয় শেষ হয়ে যাচ্ছে, বিক্রি হচ্ছে জমি-গয়না, বাড়ছে কলহ ও সহিংসতা। দেশে এমন মর্মান্তিক ঘটনা বিরল নয়, যেখানে মাদকাসক্ত ব্যক্তির হাতে স্ত্রী বা সন্তান প্রাণ হারিয়েছে। এই ঘটনাগুলো কেবল অপরাধের খবর নয়, এগুলো মানবিক মূল্যবোধের ভাঙনের দলিল।

মাদকবিরোধী অভিযান জরুরি, কিন্তু কেবল গ্রেপ্তার ও উদ্ধার অভিযানে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল। সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক সচেতনতা কার্যক্রম, তরুণদের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বৃদ্ধি, সহজলভ্য পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং সেবা এবং পরিবারে সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি, এই সবকিছু মিলিয়েই গড়ে উঠতে পারে প্রকৃত প্রতিরোধ। সবচেয়ে জরুরি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে কেবল অপরাধী হিসেবে নয়, চিকিৎসার প্রয়োজন আছে এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। কলঙ্কের ভয়ে যখন পরিবার সমস্যা লুকিয়ে রাখে, তখন সমাধানের পথ আরও সংকুচিত হয়।

প্রতি বছর ২৬ জুন আসে, যায়। ব্যানার ওঠে, বক্তৃতা হয়, প্রস্তাব পাস হয়। কিন্তু পরদিন থেকে আবার সেই চেনা বাস্তবতা। আমাদের জিজ্ঞেস করতে হবে নিজেদেরকেই। আমরা কি শুধু দিবস পালন করব, নাকি সত্যিই একটি মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার জন্য কাজ করব? মাদক একটি টান দিয়ে শুরু হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেড়ে নেয় স্বপ্ন, সম্পর্ক, সম্মান, সম্ভাবনা এবং জীবন। প্রতিরোধই মুক্তির পথ। আর সেই প্রতিরোধ শুরু হোক পরিবার থেকে, শ্রেণিকক্ষ থেকে, পাড়ার মোড় থেকে, প্রতিটি সচেতন মানুষের ব্যক্তিগত অঙ্গীকার থেকে। মাদকমুক্ত বাংলাদেশ কোনো স্লোগান নয়। এটি হোক আমাদের আগামী প্রজন্মের প্রতি দেওয়া সবচেয়ে জরুরি প্রতিশ্রুতি।



লেখক: সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ, 
পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (কেন্দ্রীয় পুনাক) মোহাম্মদপুর, ঢাকা।


ডেল্টা টাইমস্/রেহানা ফেরদৌসী/আইইউ








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ