ঘৃণার রাজনীতির উৎপত্তি, বিভাজন, স্মৃতি এবং রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণ

মুহাম্মদ আজগর হোসেন জিহাদ

মতামত

ঘৃণার রাজনীতি (Politics of Hate বা Hate politics) কোনো আকস্মিক বা স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা নয়। এটি একটি ধীর, সংগঠিত

2026-06-25T14:37:03+06:00
2026-06-25T14:37:03+06:00
মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

ঘৃণার রাজনীতির উৎপত্তি, বিভাজন, স্মৃতি এবং রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণ
মুহাম্মদ আজগর হোসেন জিহাদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ২:৩৭ পিএম   (ভিজিট : ৬৫)

ঘৃণার রাজনীতি (Politics of Hate বা Hate politics) কোনো আকস্মিক বা স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা নয়। এটি একটি ধীর, সংগঠিত এবং বহুস্তরীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। সমাজের ভেতরে বিদ্যমান ক্ষোভ, অনিশ্চয়তা এবং ভিন্নতার মধ্য থেকে রাজনৈতিকভাবে ঘৃণাকে নির্মাণ করা সম্ভব হয়।

এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত তিনটি মৌলিক উপাদানের মাধ্যমে বিকশিত হয়;

ক. অতীতের আংশিক ব্যাখ্যা;
ঘৃণার রাজনীতির প্রথম ভিত্তি হলো ইতিহাস বা অতীতকে সম্পূর্ণভাবে নয়, বরং নির্বাচিত ও আংশিকভাবে উপস্থাপন করা। অতীতের জটিল বাস্তবতাকে সরলীকরণ করে একটি নির্দিষ্ট বর্ণনার কাঠামোয় ফেলা হয়, যেখানে কিছু ঘটনা অতিরঞ্জিত করা হয় এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়।

এই আংশিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ইতিহাসের “নেতিবাচক চরিত্র” হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ঘৃণার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

খ. “আমরা বনাম তারা” মনস্তত্ত্বে ছায়ায় ঘুরপাকের মাধ্যমে

মূলত ঘৃণার রাজনীতির দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো সমাজকে দ্বিধাবিভক্ত করা; “আমরা” এবং “তারা” এই দুটি বিপরীত শিবিরে ভাগ করে ফেলা।

এই মনস্তত্ত্বে মানুষকে নাগরিক হিসেবে নয়, বরং শত্রু বা মিত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ধীরে ধীরে পরিচয়ভিত্তিক বিভাজনে রূপ নেয়। এই বিভাজন যত গভীর হয়, সমাজের ভেতরে পারস্পরিক আস্থা তত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সহাবস্থানের সম্ভাবনা সংকুচিত হয়।

গ. রাজনৈতিক প্রচারণার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে
ঘৃণার রাজনীতি টিকে থাকে পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে। একই বর্ণনা, একই অভিযোগ এবং একই আবেগঘন বার্তা বারবার বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করা হলে তা মানুষের মনস্তত্ত্বে ধীরে ধীরে স্থায়ী ধারণা হিসেবে গড়ে ওঠে। এই পুনরাবৃত্তি মানুষের সমালোচনামূলক চিন্তাকে দুর্বল করে দেয় এবং আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়াকে শক্তিশালী করে।

এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে কাজ করলে একটি সমাজে অবিশ্বাস, বিভাজন এবং পারস্পরিক সন্দেহ ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। তখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আর কেবল মতের ভিন্নতা থাকে না; বরং তা শত্রুতার কাঠামোয় পরিণত হয়।

ঘৃণার রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এটি কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক যোগাযোগ এবং নাগরিক আস্থার ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়।

একটি পরিপক্ব রাষ্ট্র তাই ঘৃণার রাজনীতিকে কেবল নৈতিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি কাঠামোগত রাজনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ ঘৃণা যখন রাজনীতির ভাষা হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে পড়ে।

অতএব আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো; "ঘৃণা কখনো স্বতঃস্ফূর্ত নয়; এটি নির্মিত হয় ইতিহাসের বিকৃতি, বিভাজনের মনস্তত্ত্ব এবং পুনরাবৃত্ত প্রচারণার মাধ্যমে।'

লেখক: রাচিন্তক ও প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় 
কার্যনির্বাহী সদস্য আমজনতার দল।


ডেল্টা টাইমস্/মুহাম্মদ আজগর হোসেন জিহাদ/আইইউ








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ