এডিস শুধু রোগ ছড়ায় না; সে আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা, নাগরিক দায়বদ্ধতা ও জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তব চিত্রও দেখিয়ে দেয়। বর্ষা এলেই শহরের আকাশে শুধু মেঘ জমে না, অদৃশ্যভাবে জমতে থাকে আরেকটি আতঙ্ক—ডেঙ্গু। হাসপাতালের করিডরে বাড়তে থাকে রোগীর ভিড়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে ওঠে রক্ত ও প্লাটিলেটের আবেদন, আর সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন নতুন করে যোগ হয় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। আমরা সহজেই বলি—“এডিস মশার কারণে ডেঙ্গু।” কথাটি সত্য। কিন্তু পুরো সত্য নয়।
একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, মশাটি কেবল বাহন। তার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ, জমে থাকা পানি, অপরিকল্পিত নির্মাণ, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা এবং নাগরিক অসচেতনতার সমন্বয়েই তৈরি হয় তার বিস্তারের সুযোগ। তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত—ডেঙ্গু কি শুধু একটি মশাবাহিত রোগ, নাকি এটি আমাদের শহরেরও একটি রিপোর্ট কার্ড? সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দেশে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৭,১৭০ জন এবং মারা গেছেন ১০২ জন। শুধু ১ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১,৩২৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছে পাঁচজনের। সংখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রতিবছর একই সংকট ফিরে আসার পরও আমরা কেন মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারছি না?
মশা নয়, সুযোগটাই আসল বিষয়
এডিস মশাকে আমরা প্রায়ই নোংরা ডোবা-নালার সঙ্গে কল্পনা করি। বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। Aedes aegypti মানুষের বসতবাড়ির আশপাশে জমে থাকা স্বচ্ছ ও স্থির পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। ফুলের টবের নিচে জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত বোতল বা টায়ার, পানির পাত্র, ছাদের কোনো কোণ কিংবা নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি—এসবই হয়ে উঠতে পারে এডিসের প্রজননস্থল।অর্থাৎ, ডেঙ্গুর ঝুঁকি সব সময় দূরের কোনো নোংরা জলাশয়ে লুকিয়ে থাকে না। অনেক সময় সেটি আমাদের নিজেদের বসতবাড়ির খুব কাছেই তৈরি হয়।সেখানেই আমাদের প্রথম আত্মসমালোচনা। মশা আমাদের ঘরে পৌঁছানোর আগেই কি আমরা তার বংশ বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছি না?
ফগিংয়ের ধোঁয়ার বাইরে যে লড়াই
ডেঙ্গুর মৌসুমে ফগিং দেখলে মনে হয়, মশার বিরুদ্ধে বড় অভিযান চলছে। কিন্তু একটি শহরের দীর্ঘমেয়াদি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের ওপর নির্ভর করতে পারে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পানি জমতে না দেওয়া, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, নজরদারি এবং জনসম্পৃক্ততাকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।অর্থাৎ, ধোঁয়া দেখা যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—যে জায়গায় নতুন মশার জন্ম হতে পারে, সেটি আমরা সময়মতো শনাক্ত ও নির্মূল করতে পারছি কি না।
একটি কার্যকর ডেঙ্গু প্রতিরোধব্যবস্থার সাফল্য তাই শুধু কতবার ওষুধ ছিটানো হলো, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। দেখতে হবে—কতগুলো ঝুঁকিপূর্ণ স্থান শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা হলো, নজরদারি কতটা নিয়মিত হলো এবং নাগরিকদের কতটা সম্পৃক্ত করা গেল। শহরের উন্নয়ন শুধু ইট-পাথরে মাপা যায় না। একটি শহরের উন্নয়ন আমরা সাধারণত রাস্তা, ভবন, সেতু কিংবা নতুন অবকাঠামো দিয়ে বিচার করি। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তাও একটি শহরের উন্নয়নের মৌলিক সূচক। যে শহরে বহুতল ভবন আছে, কিন্তু নির্মাণস্থলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়; প্রশস্ত সড়ক আছে, কিন্তু পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা দুর্বল; আধুনিক আবাসন আছে, কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনিয়মিত—সেখানে উন্নয়নের দৃশ্যমান চেহারার পাশাপাশি অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হয়। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনঘনত্ব, পানি সংরক্ষণের ধরন, বর্জ্য এবং পরিবেশগত পরিবর্তন ডেঙ্গুর ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।তাই ডেঙ্গু আমাদের শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করে না; এটি প্রশ্ন করে আমাদের নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং দৈনন্দিন নাগরিক আচরণ নিয়েও।
দায়িত্ব কার? প্রশ্নটির উত্তর একক নয়।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা, বর্জ্য অপসারণ, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখা, নির্মাণাধীন স্থানে নজরদারি এবং কার্যকর মশকনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।অন্যদিকে, নিজের বসতবাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি না করা নাগরিকের দায়িত্ব। একটি বাড়ির পরিচ্ছন্নতা হয়তো ব্যক্তিগত বিষয়; কিন্তু সেই বাড়ির অবহেলা যখন আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, তখন সেটি আর শুধু ব্যক্তিগত থাকে না—তা জনস্বাস্থ্যের অংশ হয়ে যায়। তাই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইকে ‘প্রশাসন বনাম নাগরিক’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হতে হবে সমন্বিত দায়িত্ব ও সম্মিলিত সচেতনতার লড়াই।
মৌসুমি তৎপরতা নয়, চাই স্থায়ী অভ্যাস
প্রতিবছর ডেঙ্গু বাড়লে আমরা তৎপর হই। কিন্তু ডেঙ্গু কমে গেলে সেই তৎপরতাও কমে যায়। এই মৌসুমি মানসিকতা বদলানো জরুরি।প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা যেতে পারে। নির্মাণাধীন ভবন, বাজার, পরিত্যক্ত স্থান ও জলাবদ্ধ এলাকাকে নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা যেতে পারে। আবাসিক সমিতি, স্কুল, মসজিদ, সামাজিক সংগঠন ও স্থানীয় পর্যায়ের উদ্যোগকে যুক্ত করে এলাকাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা কার্যক্রম গড়ে তোলা সম্ভব।যে প্রতিষ্ঠান বা আবাসিক এলাকা নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখছে, তাদের স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। আবার যেখানে বারবার জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, সেখানে কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার।ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে যদি শুধু ‘মশা নিধন কর্মসূচি’ হিসেবে না দেখে ‘নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা’ হিসেবে দেখা যায়, তাহলে আমাদের প্রতিরোধের ধরনও বদলাবে।
ডেঙ্গু শুধু একটি রোগের নাম নয়। এটি আমাদের শহরের আয়না। প্রতিবছর সেই আয়নায় আমরা নিজেদের মুখ দেখতে পাই—কোথাও অব্যবস্থাপনা, কোথাও উদাসীনতা, আবার কোথাও অসংখ্য মানুষের নীরব ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ। প্রশ্ন হলো, আগামী বছরও কি আমরা একই আয়নায় একই চিত্র দেখতে চাই? নাকি এবার এমন একটি শহর গড়তে চাই, যেখানে মশা আসার পর নয়—মশার জন্মের সুযোগ তৈরি হওয়ার আগেই আমরা তাকে থামাতে পারি?
মশা ছোট—কিন্তু তার দেখানো সত্যটি অনেক বড়।
লেখক: সহ সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।
ডেল্টা টাইমস/রেহানা ফেরদৌসী/সিআর/এমই