কাজী নজরুল ইসলাম ও রাজনীতি

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

মতামত

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তাঁর অদম্য চেতনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এবং বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য ‘চির-বিদ্রোহী’

2026-08-31T18:46:08+06:00
2026-08-31T18:46:08+06:00
সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

কাজী নজরুল ইসলাম ও রাজনীতি
এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৪৬ পিএম   (ভিজিট : ০)

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তাঁর অদম্য চেতনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এবং বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য ‘চির-বিদ্রোহী’ বা ‘বিদ্রোহী কবি’ বলেই অবিহিত করা হয়ে থাকে। তাঁর সাহিত্য ও জীবন সবসময় নিপীড়িত মানুষের মুক্তির কথা বলে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে তিনি তার সাহিত্য ও কবিতার মাধ্যমে তরুণ সমাজকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তিনি ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষে মানুষে সাম্য প্রচার করেছেন। কাজী নজরুল ইসলামকে শুধু একজন কবি হিসাবে স্মরণ নয়, আমাদের রাজনৈতিক ও মানবিক চেতনারও পুনরাবিষ্কারের ক্ষেত্রেও তার ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সাম্য, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিরোধের যে স্বপ্ন নজরুল দেখেছিলেন, আজকের সময়েও তা গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম জীবনের শুরু থেকেই রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিলেন। তিনি একদিকে কবিতার মাধ্যমে পুজিঁবাদের কশাঘাতে বঞ্চিত মানুষের অধিকারের কথা বলতেন, অপরদিকে অধিকার আদোয়ের লক্ষ্যে রাজনৈতিক মাঠে সরব মেতে ছিলেন। ১৯২০ সাল থেকে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক আদর্শ ও তার দাবি প্রকাশ করার জন্য সাংবাদিকতায় নিয়োজিত হন। ১৯২০ সালে মুজাফ্ফর আহমদের সাথে খেলাফত আন্দোলনে একনিষ্ঠভাবে কাজ করেন কাজী নজরুল। তখন জুলাই মাসের ১২ তারিখে নবযুগ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঐ পত্রিকার মাধ্যমেই কবি নজরুল নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেন। ঐ বছরই এই পত্রিকায় “মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে?” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। যার জন্য পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত হয় এবং কবি নজরুলের উপর পুলিশের নজরদারী শুরু হয়।

সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি তৎকালিন সামাজিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। ১৯২২ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের উদীয়মান নক্ষত্র কবি নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। অভিযোগ ছিল “আনন্দময়ীর আগমনে” কবিতার মাধ্যমে তিনি বিদ্রোহ ছড়িয়েছেন। এই রাজনৈতিক কবিতা প্রকাশিত হওয়ায় ৮ নভেম্বর ধুমকেতু পত্রিকার উক্ত সংখ্যাটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। একই বছরের ২৩ নভেম্বর তার “যুগবাণী” গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং একই দিনে তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে কুমিল্লা থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারী নজরুল বিচারাধীন বন্দী হিসাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে এক জবানবন্দী প্রদান করেন। চিফ প্রেসিডেন্সি মেজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে এই জবানবন্দী দিয়েছিলেন। তার এই জবানবন্দী বাংলা সাহিত্যে “রাজবন্দীর জবানবন্দী” নামে বিশেষ সাহিত্যিক সম্মান লাভ করেছে।

এই জবানবন্দীতে কবি নজরুল বলেছেন- “আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দী এবং আমি রাজদ্বারে অভিযুক্ত। আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সতকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সে বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়, সত্যদ্রোহী নয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধুমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নি-মশাল হয়ে অন্যায়-অত্যাচার দগ্ধ করবে”।

কাজী নজরুল ইসলামকে কবি হিসেবে তৈরি করেছে তার সমকাল। ভারত ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ শতক ছিল রাজনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিশ শতকের প্রথমার্ধ। এই অর্ধশতকের রাজনৈতিক উত্তাল ঘটনা প্রবাহ সকলেরই অবগত। কাজী নজরুলের রাজনৈতিক দর্শন ছিলো সমাজতন্ত্রান্ত্রিক প্রেক্ষাপট থেকে উৎসারিত। আর সোভিয়েত ইউনিয়নের শ্রমিক শ্রেণির জাগরণ ছিলো তার প্রেরণা ও শক্তির মূল উৎস। পৃথিবীর ইতিহাসের দীর্ঘতর সময় ধরে শ্রমজীবী মানুষ শোষিত হবার পর এই প্রথম সামগ্রিকভাবে শ্রমজীবীরা জেগে ওঠে, বিদ্রোহ করে এবং তাদের কাঙিক্ষত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতির্ন হন। ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকারী এই জাগরণকে পুঁজী করেই কাজী নজরুল ইসলাম আমরণ বিদ্রোহ করেছেন রাষ্ট্র ও রাজশক্তির বিরুদ্ধে। কাজী নজরুলের মানসপটে বিশ্বের বঞ্চিত, শোষিত, শ্রমজীবী মানুষের শক্তি যেন একীভূত হয়েছিলো। কুলি-মজুর কবিতায় দেখা যায় সেই দৃষ্টান্ত- “দেখিনু সেদিন রেলে, কুলি বলে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে! চোখ ফেটে এল জল, এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?”

সাহিত্য ও সঙ্গীত অঙ্গনের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও সক্রিয় ছিলেন সমানভাবে কাজী নজরুল ইসলাম। নির্বাচনী প্রচার ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে সশস্ত্র আন্দোলনের সাথেও তিনি যোগসূত্র রাখতেন ও অংশগ্রহন করেছেন। ভারতে ঔপনিবেশিক শাসকের হাত থেকে উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা যতোক্ষণ পর্যন্ত শ্রমজীবী মানুষের হাতে না আসবে, ততোক্ষণ সাম্যবাদের মৌলিক বিষয়টি কার্যকর হবে না বলে মনে করতেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কাজী নজরুল ইসলাম মনে করতেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তিই জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের মূল নিয়ামক শক্তি। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন, সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমেই ভারতবর্ষকে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত করা সম্ভব। আর সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য চাই বোধের জাগরণ। সাহিত্যে তিনি সব সময় নির্যাতিত-নিপিড়িত সর্বহারা শ্রেণিকে জাগানোর জন্য চেষ্টা করতেন। সর্বাহারা শ্রেণির জাগরণেই আসবে জাতীয় মুক্তি।

জাতীয় নির্বাচনেও অংশগ্রহন করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। বড় কবি বলেই নির্বাচনে জিতবেন, পুষ্পমাল্যে ভূষিত হবেন—ব্যাপারটা অত সহজ নয়; ইতিহাসের সাক্ষ্য মেনে কাজী নজরুল ইসলাম তাই পরাজয় বড়ন করেছিলেন। বিষয়টা এমন ছিল যে, গো-হারা হেরেছিলেন। জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। তাতে কী, রাজনীতি কাজী নজরুলকে ছেড়ে যায়নি, এমনকি কাজী নজরুলও রাজনীতিত্যাগ করেন নাই। বাঙালি এই কবি আদি-অন্ত রাজনীতিপ্রবণ ছিলেন। কেমন সেই রাজনীতি? ভোটের? ক্ষমতার? জিঘাংসার? বাঙালি ও বাংলাদেশের ঘোরতর কোলাহলের যুগে এই প্রশ্ন জাগে।

কাজী নজরুল ইসলামের কাছে রাজনীতি প্রধানত প্রকাশ পায় পরিচয়কেন্দ্রিক নানা প্রশ্নের মাধ্যমে। তিনি প্রশ্ন করেন,  আমি কে? কোথায় নিহিত ‘আমার’ ও ‘আমাদের’ ইতিহাসের সূত্র? কীভাবে রচিত হয় দেশ-কাল ও ব্যক্তির সম্পর্ক? ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই হলো তাঁর ছিল আদি জিজ্ঞাসা। গল্প-কবিতার তীব্র উচ্চারণে অথবা আড়ালে–আভাসে কাজী নজরুল খুঁজে নিতে চেয়েছেন এসব প্রশ্নের উত্তর। পরিচয়ের নানা আবরণ উম্মুক্ত করে তিনি দেখান তাঁর বাঙালিত্ব, মুসলমানত্ব, জাতীয়তা; এসবের কোনোটিকেই তিনি আটকে ফেলেন না একমাত্রিক পরিসরে। মুসলমান হয়েই তিনি বাঙালি, বাঙালি হয়েই তিনি মুসলমান। আবার বঙ্গবাসী হয়েই তিনি সর্বভারতীয়তার। কোনোটির সঙ্গেই ছিল না তাঁর বিরোধিতা।

১৯২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর আনুষ্টানিকভাবে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। কাজী নজরুল যে ভারতবর্ষে অর্থাৎ কলকাতায় সর্বপ্রথম ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ গড়ার গোপন প্রচেষ্টার প্রাথমিক পর্বের সাথে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন, সেই বিষয়ে নিরপেক্ষ গবেষকদের কোন সন্দেহ নাই। ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রণয়নে দলের লক্ষ্য ও আদর্শ বিষয়ক যে খসড়া প্রথম তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেই খসড়া প্রণয়নে কবির বন্ধুদের সাথে কবি নজরুলেরও সহযোগিতা ছিল। পরবর্তীকালে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে কবির বন্ধুরা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সেটার অনেক আগে থেকেই নজরুল ‘সাম্যবাদী’ ভাবনা চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁর রচনার মাধ্যমে সাম্যবাদের কথা প্রচার করতে শুরু করেছিলেন। আর ঐ বছরই ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে প্রকাশিত হয় লাঙল পত্রিকা। একটি বিশেষ গোষ্ঠীর পত্রিকা বলেই নামের নিচে যুক্ত করা হয়েছিল দলীয় পরিচয় ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায়ের মুখপত্র’। এ সংখ্যাতেই ছাপা হয়েছিল কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতা ‘সাম্যবাদী’। কবিতাটি নজরুলের রাজনীতিচিন্তার বহিঃপ্রকাশ হিসাবেই বিবেচিত হয়। এ কবিতার মাধ্যমে কবি জাতীকে শুনিয়েছিলেন সমতার কথা। শ্রমিক প্রজা স্বরাজ দলের ইশতেহারে রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসাবে স্পষ্টভাবে লেখা হয়েছিল কৃষকের ভূমিস্বত্ব, শ্রমিকের মজুরি, আবাসন, শ্রমিক সংঘ ও শ্রমিক-কৃষকের সংঘবদ্ধতার কথা। তবে চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, ‘নারী-পুরুষনির্বিশেষে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতাসূচক স্বরাজ্য লাভ।’

আর এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই তিনি আঘাত হনেছিলেন আমলাতন্ত্রের ওপর। তার বড় কারণ বিদেশিদের তত্ত্বাবধানে গড়ে তোলা আমলাতন্ত্রই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিস্তৃতি পেয়েছে, জন্ম দিয়েছে উচ্চবর্গীয় ক্ষমতাকাঠামোর। শুধু তা-ই নয়, জাতীয় আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এই আমলাতন্ত্রের কাজ ও লক্ষ্যের কোনো মিল নাই। শ্রমিক প্রজা স্বরাজ দলের ইশতেহার স্পষ্টভাবে কবি নজরুল জানিয়েছিলেন অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ, রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার ফলে জাতীয় দাবিও অর্জিত হয় নাই। তাহলে মুক্তির পথ কী? কাজী নজরুল ইসলামের মতে, অর্থাৎ শ্রমিক-স্বরাজ দলের মতে দরকার তাই জনগনৈর অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন ‘গণ–আন্দোলন’; ওই ইশতেহারে লেখা হয়েছে, ‘গণ–আন্দোলনের চলমান শক্তির প্রয়োগ দ্বারাই নিরস্ত্র জাতির পক্ষে স্বাধীনতা লাভের একমাত্র উপায়...।’

এতকাল পরে এসে আজকের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়, কাজী নজরুল ইসলামকে বা তার রাজনীতির যে ধরন আমরা দেখি, সে ধারার রাজনীতি কি আমরা আদৌ গ্রহণ করতে পেরেছি? বিগত শত বছরে আমরা কি অতখানি প্রস্তুত হতে পেড়েছি ? ক্ষমতার কুক্ষীগত, আমলাতন্ত্র কিংবা অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো প্রস্তুতি কি আমরা আদৌ গ্রহন করতে পেড়েছি ? জবাব আসলেই অনেকটাই হতাশার। কারন, ইতিহাসের উল্টো দিকে হাঁটার প্রবণতা নজরে পড়েছে বার বার। কাজী নজরুল ইসলামের রাজনীতি ছিল আত্মত্যাগ ও নির্ভেজাল দেশপ্রেমের ফল। যা যে কোন দল-মত নির্বিশেষে পরিচালিত হয়েছিল। তাঁর রাজনীতিও সেদিক থেকে বলতে গেলে আত্মত্যাগ ও আত্মনিবেদনের মন্ত্রে সঞ্জীবিত সম্পূর্ণ ভিন্ন অথচ নিজস্ব এক রাজনৈতিক চিন্তা প্রসূত ছিল। তাঁর সেই চিন্তার সাথে তথাকথিত কোন রাজনৈতিক ফর্মুলার সম্পূর্ণ মিল হওয়া সম্ভবই ছিল না। তারই ফলে পেশাদার রাজনৈতিক আবহাওয়ায় তিনি চিরকালই যেন বেমানান ছিলেন। কবির ‘আমার কৈফিয়ৎ’ অন্ততঃ সেটারই প্রমাণ বহন করে। কবি স্বয়ং পেশাদার রাজনীতির পরিণতি ও কুফল সম্পর্কে চিরকালই নিজের অনাস্থা প্রকাশ করে এসেছিলেন। সমকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৃহৎ অংশ সম্ভবতঃ সেই কারণেই কাজী নজরুল ইসলামেকে কখনো মেনে নিতে পারেন নাই। তাঁরাই দল বেঁধে গোড়া থেকে নজরুলকে ‘বিভ্রান্ত’ ও ‘অ-রাজনৈতিক’ বলে প্রচার চালিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের মতে, “নীতিহীন দোদুল্যমানতা, অন্তঃসারশূন্য প্রগলভতা এবং ভারসাম্যহীন মানসিকতা দিন দিন নজরুলকে চঞ্চল অস্থির, উদ্ভ্রান্ত করে তুলেছিল যার শেষ পরিণতি সম্পূর্ণ উন্মাদ হওয়া।” কবি কাজী নজরুলই প্রথম প্রকাশ্যে লিখিতভাবে ভারতের ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’র জন্য দাবি তুলেছিলেন। তাঁরাই নজরুলের কারাবাস ও আত্মত্যাগের স্মৃতিকে মেনে নিতে অক্ষম হয়েছিলেন, একই সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ আট বছরের তুলকালাম রাজনৈতিক ক্রিয়াকাণ্ডকে বিস্মৃত হয়েছিলেন। অথচ এটাই সত্য যে, কাজী নজরুলের মধ্যেই সাম্য ও সম্প্রীতি, স্বাধীনতা ও মানবতার জয়গান, নারীর অধিকার বিষয়ক প্রশ্নগুলি একই সাথে প্রথমে সোচ্চারভাবে উচ্চারিত হয়েছিল। এগুলি নিশ্চয়ই রাজনীতির বহির্ভূত বিষয় নয়। অথচ সেদিনের মত রাজনৈতিক সুবিধাবাদী মহল, এগুলোকে আজও গুলিয়ে দেবার জন্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় হয়ে রয়েছেন।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কাজী নজরুল ইসলাম যেমন কখনো রাজনীতি বহির্ভূত ছিলেন না, তেমনি তাঁর দেশপ্রেম ও মানবিক-বোধগুলিও নিঃসন্দেহে তাঁর নিজস্ব বোধতাড়িত এক রাজনীতিবোধেরই প্রত্যক্ষ ফল ছিল। সুতরাং নজরুলের অজ্ঞাতেই তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও বিস্তার ঘটেছিল। তথাকথিত ‘পেশাদার চলতি রাজনীতি’ থেকে সেটা পৃথক অথচ অনস্বীকার্য ছিল। স্রোতের বিপক্ষে দাঁড়ানোর যে বুদ্ধিবৃত্তিক দায়, সেটি কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে শতভাগ ছিলো। বাঙালির জাতীয় জীবনে কাজী নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা চিরন্তন। বর্তমান চলমান সময়ের প্রেক্ষাপটেও যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কাজী নজরুলের রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা আজও হারিয়ে যায় নাই, এখনো তা অনেকখানিই বিরাজমান—হোক তা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সম্পর্ক বিবেচনায় কিংবা দেশ গঠন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়।

লেখক : রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক 


ডেল্টা টাইমস/ আরএফ 








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ