শিল্প খাতকে পুনর্গঠন করা সময়ের দাবি

রায়হান আহমেদ তপাদার:

মতামত

আমাদের জাতীয় অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে আছে আমাদের শিল্প খাতে। অথচ সেই প্রাণস্পন্দনেই আজ নেমে এসেছে এক তীব্র ও

2026-08-30T10:10:44+06:00
2026-08-30T10:10:44+06:00
রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩

শিল্প খাতকে পুনর্গঠন করা সময়ের দাবি
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: রোববার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১০ এএম   (ভিজিট : ১)

আমাদের জাতীয় অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে আছে আমাদের শিল্প খাতে। অথচ সেই প্রাণস্পন্দনেই আজ নেমে এসেছে এক তীব্র ও অভূতপূর্ব স্তব্ধতা। এটি কেবল সাময়িক কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা কিংবা বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা নয়; বরং আমাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিমূলকে গভীরভাবে নড়িয়ে দেওয়ার মতো এক সতর্কসংকেত। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত সামঞ্জস্যহীনতার এক ত্রিভুজ সংকটে পড়ে দেশের প্রায় ৯৫টি শিল্প কারখানা বন্ধ ও স্থগিত হওয়ার মুখোমুখি হয়েছে। একটি কারখানার চাকা থমকে যাওয়া মানে কেবল কতগুলো যান্ত্রিক কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যাওয়া নয়। এর পেছনে লুকিয়ে থাকে লাখো শ্রমিকের বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা, হাজারও পরিবারের রুটি-রুজির হাহাকার, ব্যাংকিং খাতের ঋণ পুনরুদ্ধারের আশঙ্কা এবং জাতীয় রাজস্বে বড় ধরনের ধস। শিল্প খাতের এই বর্তমান স্থবিরতা যদি অবিলম্বে নিরসন করা না যায়, তবে তা সমগ্র সামষ্টিক অর্থনীতিকেই এক দীর্ঘস্থায়ী আঁধারের দিকে ঠেলে দেবে। জাতিসংঘ চূড়ান্ত অনুমোদন দিলে চলতি বছর এলডিসি উত্তরণ করব আমরা। সরকার যদিও তা তিন বছর পেছানোর আবেদন করেছে এবং জাতিসংঘও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তবে একসময় আমাদের এলডিসি উত্তরণ করতেই হবে। এর আগে প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির উৎপাদনশীলতাকে রফতানির মাধ্যমে বহুমুখী করা জরুরি। এক্ষেত্রে দেশীয় বায়োটেকনোলজি ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের বাণিজ্য সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। খাত দুটো দেশের বিকাশমান শিল্পের মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর। তাই এ দুই খাতের জন্য কাঙ্ক্ষিত বাজার খোঁজার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। 

তুলনামূলক বিচারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একক বাজার এ দুই শিল্পের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্য সম্পর্কিত বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকার চুক্তির আওতায় এলডিসি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ওষুধ খাতে পেটেন্ট ছাড়ের এক বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে। এ সুবিধার ফলেই দেশের ফার্মা খাত বিশ্বমানের ওষুধ আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে স্থানীয় জনগণকে দিতে পেরেছে এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের স্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে আমাদের দেশের মোট ব্যবহৃত ওষুধের প্রায় ৯৮ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় এবং আমরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রফতানি করছি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এলডিসি উত্তরণের পর এ পেটেন্ট ছাড়ের মেয়াদ বা বিশেষ সুবিধা আর কার্যকর না থাকলে ফার্মা ও লাইফ সায়েন্স খাতের বাণিজ্যিক রূপরেখা কেমন হবে? ইইউর মতো সংবেদনশীল ও নিয়মকানুনভিত্তিক বাজারে আমরা কি সেই নতুন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত? এমন প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।অন্যদিকে এলডিসি উত্তরণের পর ইইউর বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে বাংলাদেশকে ‘জিএসপি প্লাস’ সুবিধার জন্য দরকষাকষি করতে হবে। তবে জিএসপি প্লাস বাণিজ্য শুল্কে ছাড় দিলেও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি বা পেটেন্ট আইনের কঠোর বাধ্যবাধকতা শিথিল করে না। ফলে নতুন ও উচ্চমানের ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধ, অটো-ইমিউন ডিজিজের চিকিৎসাসামগ্রী, মেটাবলিক ডিজঅর্ডার কিংবা হৃদরোগের আধুনিক জৈব ওষুধের ওপর আমদানিনির্ভরতা বা পেটেন্ট ফি দেয়ার কারণে স্থানীয় বাজারে দাম বহুগুণ বাড়বে। একই সময়ে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ার্ড জেনেরিক পণ্য নিয়ে ইউরোপে সরাসরি রফতানির পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। 

বৈশ্বিক ওষুধ শিল্প এখন কেমিক্যালভিত্তিক সিন্থেটিক ওষুধ থেকে দ্রুত স্থানান্তরিত হচ্ছে জিন ও অণুজীবভিত্তিক বায়োলজিকসের দিকে। ভ্যাকসিন, মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি, রিকম্বিন্যান্ট প্রোটিন এবং জিন থেরাপিই হলো বিশ্ব চিকিৎসার নতুন ভবিষ্যৎ। তাই ট্রিপস-পরবর্তী বাস্তবতায় ইইউ বাজারে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকে অতি দ্রুত ‘জেনেরিক রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং’ মডেল থেকে বেরিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি ও হোমগ্রোন উদ্ভাবনী মডেলে প্রবেশ করতেই হবে। আমাদের বুঝতে হবে, লাইফ সায়েন্স শিল্পে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার অর্থ শুধু মানুষের ওষুধ তৈরি করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতও। বর্তমানে আমাদের পোলট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাতের চাহিদা মেটাতে বার্ষিক হাজার হাজার কোটি টাকার পশুখাদ্য অ্যাডিটিভস, এনজাইম ও অ্যানিমেল ভ্যাকসিন আমদানি করতে হয়। এর বিশাল অংশ কেমিক্যাল বা পেটেন্টেড প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। যদি আমরা ফারমেন্টেশন প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রয়োগ বাড়িয়ে দেশীয় অণুজীবভিত্তিক প্রোবায়োটিকস, এগ্রো-ভিটামিন ও স্থানীয় জীবাণুর স্ট্রেইন ব্যবহার করে পশুচিকিৎসা ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে পারি, তবে একদিকে যেমন ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ঘটবে, অন্যদিকে কৃষি শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় বন্ধ হবে। তখন ইইউর কঠোর অর্গানিক মানদণ্ড মেনে বিশ্ববাজারে কৃষিপণ্য রফতানির সুযোগ তৈরি হবে। বিশ্বের যেকোনো দেশে বায়ো-টেকনোলজিভিত্তিক শিল্প বৈপ্লবিক উন্নতি করেছে একাডেমিয়ার সঙ্গে শিল্পসংযুক্তি। আমাদের স্থানীয় ফার্মা কোম্পানিগুলোকে এখন যৌথভাবে বিশ্ববিদ্যালয়- গুলোর বায়ো-গবেষণায় বিশেষ তহবিল স্পন্সরশিপ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। 

একই সঙ্গে ইউরোপিয়ান মেডিসিন্স এজেন্সির (ইএমএ) মানদণ্ড মেনে উৎপাদন প্রক্রিয়া সাজাতে ইউরোপীয় বায়োটেক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর জোরদার করতে হবে। এলডিসি-পরবর্তী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারকদের এখনই কয়েকটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেয়া দরকার। ওষুধ ও স্বাস্থ্য প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি দূরদর্শী ‘জাতীয় বায়োম্যানুফ্যাকচারিং পলিসি’ প্রণয়ন করতে হবে। গবেষণাগার থেকে পণ্য বাজারে আনার মধ্যবর্তী পথকে সহজ করতে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ অর্থায়নে একটি বিশেষ ‘ভেনচার ক্যাপিটাল ফান্ড’ গঠন জরুরি। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বায়োলজিকস, ভ্যাকসিন এবং বায়ো-সিমিলারের দ্রুত অনুমোদন ও বৈশ্বিক মান নিশ্চিত করতে আমাদের ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তরের নীতি ও কারিগরি সক্ষমতা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাশাপাশি ইউরোপিয়ান মেডিসিন্স এজেন্সির মানদণ্ডে উন্নীত করতে হবে। চলতি সালের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন কেবল একটি চ্যালেঞ্জের বার্তা নয়, বরং এটি আমাদের শিল্প খাতকে পুনর্গঠন করার এক ঐতিহাসিক সুযোগ। ট্রিপস নমনীয়তা চলে যাওয়া আমাদের দেশীয় লাইফ সায়েন্স শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করার এবং ইউরোপের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের টেকসই ভাবমূর্তি তৈরির জন্য একটি প্রয়োজনীয় উদ্দীপক হিসেবে কাজ করতে পারে। মাইক্রোবায়োলজি ও বায়োটেকনোলজি প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমরা যদি এখন থেকেই যৌথ গবেষণা, বাণিজ্যিক রূপান্তর, ইইউ রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয় এবং নীতিগত সহায়তা জোরদার করি।

তবে ট্রিপস-পরবর্তী যুগে বাংলাদেশ কেবল তার ওষুধ খাতের আত্মনির্ভরশীলতাই ধরে রাখবে না; বরং এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান বায়ো-ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে ইউরোপসহ বিশ্ববাজারে এক নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠা করবে। 
রপ্তানিমুখী এবং উৎপাদনশীল মূল শিল্পাঞ্চলগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ রেশনিংয়ের মাধ্যমে সরবরাহের গতি বাড়াতে হবে, যাতে কারখানার চাকা সচল থাকে।ঋণ পুনর্গঠন ও চলতি মূলধন সহায়তা: সংকটাপন্ন কারখানাগুলোকে খেলাপি ঘোষণা না করে তাদের ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা অন্তত এক বছরের জন্য স্থগিত করা দরকার। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে বন্দরগুলোতে দ্রুত কাঁচামাল খালাসের ব্যবস্থা করতে হবে। অহেতুক ডেমারেজ চার্জ মওকুফ করে কাস্টমস প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ব্যবসাবান্ধব করে তোলা সময়ের দাবি। জাতীয় অর্থনীতিকে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক ও শিল্প উদ্যোক্তাদের এক টেবিলে বসে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে হবে। শিল্প না বাঁচলে কর্মসংস্থান বাঁচবে না, আর কর্মসংস্থান না থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সমস্ত সূচকই অর্থহীন হয়ে পড়বে। বন্ধ হওয়ার মুখে থাকা ৯৫টি কারখানাসহ গোটা শিল্প খাতের চাকা দ্রুত সচল করার উদ্যোগ নেওয়াই হোক এই মুহূর্তের প্রধান জাতীয় অগ্রাধিকার।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ