জিয়া থেকে তারেক: উত্তরাধিকারের মুকুট নাকি অগ্নিপরীক্ষা

মোহাম্মদ ইয়ামিন

মতামত

একটি মুকুট কখনো কখনো আগুনের বলয় হয়ে ওঠে। বিএনপির ইতিহাসে সেই মুকুট এখন তারেক রহমানের মাথায়—প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের

2026-09-01T11:32:00+06:00
2026-09-01T11:32:00+06:00
মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

জিয়া থেকে তারেক: উত্তরাধিকারের মুকুট নাকি অগ্নিপরীক্ষা
মোহাম্মদ ইয়ামিন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৩২ এএম   (ভিজিট : ০)

একটি মুকুট কখনো কখনো আগুনের বলয় হয়ে ওঠে। বিএনপির ইতিহাসে সেই মুকুট এখন তারেক রহমানের মাথায়—প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া, খালেদা জিয়ার চার দশকের সংগ্রামে পোক্ত হওয়া এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। কিন্তু ইতিহাস বারবার একটি সত্য মনে করিয়ে দেয়—উত্তরাধিকার ক্ষমতা এনে দিতে পারে, ক্ষমতা ধরে রাখার গ্যারান্টি দেয় না। ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে ক্ষমতায় ফেরা বিএনপির সামনে তাই আজ একটাই প্রশ্ন জ্বলজ্বল করছে—এই উত্তরাধিকার কি তারেক রহমানের জন্য গর্বের মুকুট হয়ে থাকবে, নাকি পরিণত হবে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অগ্নিপরীক্ষায়?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ৪৮ বছর কম সময় নয়। একটি রাজনৈতিক দল এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিষ্ঠাতাকে হারিয়েছে, নেতৃত্বে প্রজন্মের পরিবর্তন দেখেছে, একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় গেছে, আবার দীর্ঘ সময় বিরোধী দলের রাজনীতিও করেছে। আন্দোলন, নির্বাচন, ক্ষমতার পালাবদল ও রাজনৈতিক সংকট—সবকিছুর মধ্য দিয়ে টিকে থাকার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত বিএনপি এখন তৃতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বে। জিয়াউর রহমানের পর দলের হাল ধরেন তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া। চার দশকের বেশি সময় দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার পর তাঁর মৃত্যুতে সেই অধ্যায়ের অবসান হয়েছে। এখন দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে তারেক রহমান। এটি নিছক নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়—বিএনপির জন্য এটি একটি যুগের অবসান এবং নতুন যুগের সূচনা। আর এই নতুন যুগের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে তারেক রহমান কতটা আধুনিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও জনমুখী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পারবেন।

বিএনপির জন্ম হয়েছিল একটি অস্থির রাজনৈতিক সময়ে। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরতার ধারণাকে সামনে রেখে ১৯ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমান। বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পথের মানুষকে একই প্ল্যাটফর্মে আনার ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হলে দলের সামনে নেতৃত্বের বড় সংকট তৈরি হয়। সেই সংকট থেকে বিএনপিকে টেনে তোলার দায়িত্ব নেন খালেদা জিয়া। রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশ ছিল অনেকটাই পরিস্থিতির প্রয়োজনে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনিই হয়ে ওঠেন বিএনপির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও প্রভাবশালী নেতা।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয় এবং সরকার পরিচালনা—সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি একটি পূর্ণাঙ্গ গণভিত্তিক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। তিনবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চার দশকের বেশি সময় দলীয় চেয়ারপারসনের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। তবে তাঁর দীর্ঘ নেতৃত্ব বিএনপির জন্য যেমন শক্তি তৈরি করেছে, তেমনি একটি বড় প্রশ্নও রেখে গেছে—দলের সাংগঠনিক কাঠামো কতটা প্রাতিষ্ঠানিক, আর কতটা ব্যক্তিনির্ভর? এই প্রশ্ন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থান এক দিনে হয়নি। তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে এসেছেন তিনি। ২০০২ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হওয়ার পর সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় করার নানা উদ্যোগে যুক্ত হন। ২০০৫ সালে দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলন আয়োজন এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় তাঁর সাংগঠনিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

কিন্তু ওয়ান-ইলেভেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বড় বাঁক তৈরি করে। গ্রেপ্তার ও পরবর্তী সময়ে বিদেশে অবস্থানের কারণে দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকতে হয় তাঁকে। ২০০৯ সালে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে তাঁর অবস্থান আরও সুস্পষ্ট হয়।

২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের কার্যত সর্বোচ্চ নেতৃত্ব তাঁর হাতে আসে। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থেকেও দল পরিচালনা, আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ এবং তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। এখন তিনি দলের চেয়ারম্যান—অর্থাৎ বিএনপির নেতৃত্বে জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয়েছে। কিন্তু এখানেই উত্তরাধিকার শেষ নয়; শুরু হয়েছে পরীক্ষা। কারণ বিরোধী দলের নেতা হিসেবে সফল হওয়া এবং সরকারপ্রধান হিসেবে সফল হওয়া এক বিষয় নয়।

দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকার পর ক্ষমতায় ফিরে আসা বিএনপির জন্য বড় রাজনৈতিক অর্জন। কিন্তু ক্ষমতায় ফিরে আসার পরই একটি দলের আসল পরীক্ষা শুরু হয়। বিরোধী দলে থাকলে সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করা যায়, কিন্তু সরকারে থাকলে প্রতিটি ব্যর্থতার দায় নিতে হয়। দ্রব্যমূল্য বাড়লে সরকারকে জবাব দিতে হয়, কর্মসংস্থান না হলে জবাব দিতে হয়, আইনশৃঙ্খলার অবনতি হলেও সরকারকে জবাবদিহি করতে হয়। প্রশাসনের কোনো অনিয়মও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সরকারের ওপরই এসে পড়ে। সুতরাং তারেক রহমানের প্রথম বড় পরীক্ষা হবে—দল ও সরকারকে কতটা আলাদা রাখতে পারেন তিনি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নতুন নয়। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় পরিচয়ে সুবিধা নেওয়া, সরকারি কাজে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো কিংবা পদ-পদবি ঘিরে দলীয় প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সরকারের জনপ্রিয়তা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারেক রহমানকে তাই শুরুতেই একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—দলীয় পরিচয় কাউকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের লাইসেন্স দেয় না।

দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর প্রত্যাশা বেড়ে যায়। কে পদ পাবেন, কে মনোনয়ন পাবেন, কে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাবেন—এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা গ্রুপিংয়ে পরিণত হলে তা বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করতে পারে।

বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক নেতা নিজেদের আলাদা বলয় তৈরি করলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠবে। জাতীয় নির্বাচনের সময় মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধ কিংবা সাংগঠনিক কমিটি গঠন নিয়ে দ্বন্দ্ব দলের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। এই জায়গায় তারেক রহমানকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ব্যক্তিগত আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে দলের ভেতরে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ রেখেও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।

বিএনপির সামনে আরেকটি বড় প্রশ্ন—পুরোনো ও নতুন নেতৃত্বের সমন্বয়। দলের প্রবীণ নেতাদের রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। তাঁরা আন্দোলন দেখেছেন, নির্বাচন করেছেন, সরকার পরিচালনা করেছেন, রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেছেন। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের নেতাদের রাজনৈতিক চিন্তা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক জনসম্পৃক্ততার ধরন আলাদা।

তারেক রহমানের নেতৃত্বের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে এই দুই প্রজন্মকে একই রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে কতটা কার্যকরভাবে রাখতে পারেন তার ওপর। শুধু পুরোনো নেতৃত্বকে আঁকড়ে থাকলে দল সময়ের সঙ্গে পিছিয়ে পড়তে পারে। আবার অভিজ্ঞ নেতৃত্বকে উপেক্ষা করে দ্রুত নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গেলে অভ্যন্তরীণ বিরোধ তৈরি হতে পারে। প্রয়োজন হবে ভারসাম্যের।

ক্ষমতায় থাকার সময় একটি দলের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিস্বার্থের সম্পর্ক তৈরি হওয়া। একজন নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দখল, চাঁদাবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা থাকে না; দলের ভাবমূর্তির সঙ্গেও জড়িয়ে যায়।

এ কারণে বিএনপিকে এমন একটি সাংগঠনিক সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যেখানে দলের পদ যত বড়ই হোক, অভিযোগের তদন্ত থেকে কেউ বাইরে থাকবেন না। দলীয় শৃঙ্খলা শুধু কর্মীদের জন্য নয়, কেন্দ্রীয় নেতাদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য—এই বার্তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনৈতিক দলের জন্য জবাবদিহি কোনো দুর্বলতা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি শক্তির ভিত্তি।

বিএনপির জন্য শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হবে রাষ্ট্র পরিচালনা। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ও জনবান্ধব করার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করা সহজ হবে না। অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, নির্বাচনব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংস্কারের দাবি রয়েছে। রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে হলে শুধু সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা।

বিশেষ করে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে কার্যকর করা, নির্বাচনব্যবস্থায় মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সরকারের জন্য কঠিন কাজ হবে। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

বিএনপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি ছিল জনসম্পৃক্ততা। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর এই সম্পর্কই সবচেয়ে দ্রুত দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিরোধী দলে থাকলে নেতাকর্মীরা মানুষের কাছে যান, অভিযোগ শোনেন, আন্দোলনে পাশে থাকেন। ক্ষমতায় গেলে প্রশাসনিক প্রটোকল, নিরাপত্তা এবং ক্ষমতার দূরত্ব সেই যোগাযোগ কমিয়ে দিতে পারে। তারেক রহমানের জন্য তাই বড় চ্যালেঞ্জ হবে—ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে জনগণের বাস্তব জীবনকে দেখতে পারা।

দ্রব্যমূল্য, চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা কিংবা স্থানীয় উন্নয়ন—এসব প্রশ্নের উত্তর মানুষ প্রতিদিনের জীবনে খুঁজবে। সরকারের নীতির সাফল্য বা ব্যর্থতা মানুষ অনুভব করবে বাজারে, কর্মক্ষেত্রে, হাসপাতালে, স্কুলে এবং রাস্তায়। সেখানে পরিবর্তন দৃশ্যমান না হলে রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে জনপ্রিয়তা ধরে রাখা কঠিন হবে।

বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসে নেতৃত্বের তিনটি পর্ব স্পষ্ট। জিয়াউর রহমান দলটি প্রতিষ্ঠা করে রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছেন। খালেদা জিয়া সেই দলকে গণভিত্তি দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা ও আন্দোলনের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আর তারেক রহমান এখন সেই দীর্ঘ উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। কিন্তু রাজনীতিতে উত্তরাধিকার একটি প্রাথমিক শক্তি হতে পারে; চূড়ান্ত সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়।

তারেক রহমানের সামনে তাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে নিজের নেতৃত্বকে কতটা প্রাতিষ্ঠানিক করতে পারেন। বিএনপিকে কি তিনি এমন একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত করতে পারবেন, যেখানে সিদ্ধান্ত হবে নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়? দলীয় নেতাকর্মীদের কি তিনি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, যাতে ক্ষমতা তাঁদের কাছে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে? আর সরকারকে কি তিনি এমনভাবে পরিচালনা করতে পারবেন, যাতে জনগণ বাস্তব পরিবর্তন দেখতে পায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে বিএনপির পরবর্তী ইতিহাস।

৪৮ বছর আগে জিয়াউর রহমান যে দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটি এখন তারেক রহমানের হাতে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই অধ্যায় শুধু বিএনপির জন্য নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতায় ফিরে আসা কোনো রাজনৈতিক দলের শেষ সাফল্য নয়—বরং সেখান থেকেই শুরু হয় সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব: ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা, ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখা।

তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন তাই উত্তরাধিকার দিয়ে হবে না; হবে তাঁর সরকারের কাজ, দলের শৃঙ্খলা, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং জনগণের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তনের মাধ্যমে। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস একটি দলকে তার প্রতিষ্ঠাতা দিয়ে মনে রাখতে পারে, উত্তরসূরিদের নামও লিখে রাখতে পারে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ইতিহাসে জায়গা করে দেয় তার কাজ। বিএনপির ৪৮ বছরের পরবর্তী অধ্যায়ে সেই কাজের পরীক্ষাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : অনলাইন নিউজ এডিটর,  দৈনিক ডেল্টা টাইমস।

ডেল্টা টাইমস/মোহাম্মদ ইয়ামিন/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ