দক্ষিণাঞ্চলের দ্বীপজেলা ভোলা। মেঘনা, তেঁতুলিয়া, ইলিশা ও কালাবদরসহ অসংখ্য নদী ঘিরে এই জনপদের মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতি। অথচ সেই নদীই আজ অনেকের কাছে আতঙ্কের নাম। বছরের পর বছর ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, মসজিদ ও পারিবারিক কবরস্থান। একটি ভাঙন শুধু কয়েক শতাংশ জমি কেড়ে নেয় না; কখনো কখনো পুরো পরিবারকে নিঃস্ব করে দেয়।
যে পরিবার কয়েক পুরুষ ধরে একটি ভিটায় বসবাস করেছে, একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে তাদের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার মুখে। কৃষকের জমি নেই, ব্যবসায়ীর দোকান নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাবে, কীভাবে বাঁচবে—এই অনিশ্চয়তায় কাটে তাদের দিন। বাস্তুচ্যুত এই মানুষগুলোর কান্না কি রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের কানে পৌঁছায় না?
প্রাকৃতিক কারণেও নদীভাঙন হয়, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এর সঙ্গে প্রভাবশালীদের অবৈধ বালু উত্তোলন যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজার দিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলা নদীর স্বাভাবিক ভারসাম্য, স্রোতের গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় ঝুঁকি বাড়ে। তাই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা এখন ভোলার অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।
আওয়ামী লীগ আমলের অভিযোগভোলায় অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তদন্ত চিত্র-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক জহুরুল ইসলাম নকীব ও তাঁর ভাতিজা আনোয়ার হোসেন শামীম মোরাদারের বিরুদ্ধে মেঘনা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ ওঠে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোলার বাসিন্দা রহমান মোস্তাফিজ ২০২১ সালের ১৮ আগস্ট দুদক চেয়ারম্যানের কাছে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন।
একই বছরের ২৩ নভেম্বর বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা পোস্ট-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে কাচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা বাবুল মিয়াজী অভিযোগ করেন, বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করায় স্থানীয় চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম নকীব ও তাঁর সহযোগী শামীমের লোকজন তাঁর ওপর হামলা চালায়, বাড়িঘর ভাঙচুর করে এবং মালামাল লুট করে। তাঁর দাবি, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তখনো নদী থেকে বালু তোলা হচ্ছিল। এগুলো ভুক্তভোগীর অভিযোগ; সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের তথ্য ওই প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি।
বিএনপি সরকারের সময়েও কি একই চিত্র?রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও ভোলার নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ থামেনি। ২০২৬ সালের ১০ ও ১১ মার্চ দৈনিক বাংলার কণ্ঠ, দৈনিক সংগ্রাম, বাংলাদেশ অবজারভার ও যুগান্তর-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে চরফ্যাশনের বাবুরহাট লঞ্চঘাটসংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠে আসে।
এসব প্রতিবেদনে কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে নজরুলনগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসানের নাম উল্লেখ করা হয়। তাঁর বড় ভাই ও স্থানীয় ইউপি সদস্য জাহিদুল শিকদারের বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগও প্রকাশিত হয়। যুবদল নেতা রুবেল শিকদার ও তানজিবের নামও সংবাদে এসেছে।
২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর WNews360-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বোরহানউদ্দিনের তেঁতুলিয়া নদী থেকে তিনটি ড্রেজার আটকের খবর আসে। সেখানে ড্রেজারের মালিক হিসেবে আল আমিন মোল্লা, নুরনবী ও ফাইজুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়। নুরনবী ও ফাইজুল ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে স্থানীয়দের বক্তব্যও প্রতিবেদনে ছাপা হয়েছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের তথ্য ওই সংবাদে নেই।
এই ঘটনাগুলো একটি প্রশ্ন সামনে আনে: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, ক্ষমতা বদলের পর নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের লোকজনের বিরুদ্ধেও কেন একই অভিযোগ? সরকার বদলায়, জনপ্রতিনিধি বদলান, কিন্তু নদী লুটের চরিত্র কি বদলায় না?
আমার অবস্থান পরিষ্কার: আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্য কোনো দলের পরিচয় ব্যবহার করে জনগণের সম্পদ লুটের অধিকার কারও নেই। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী হলেই কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। বরং ক্ষমতার কাছাকাছি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত আরও নিরপেক্ষ ও দ্রুত হওয়া উচিত।
অভিযান আছে, স্থায়ী সমাধান কোথায়?বিভিন্ন সময়ে প্রশাসন ও কোস্ট গার্ড অভিযান চালিয়েছে। ২০২৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তেঁতুলিয়া নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় আটজনকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালত এক মাসের কারাদণ্ড দেন। ৭ সেপ্টেম্বর মেঘনায় অভিযানে আটক ৩৮ জনকে ১৫ দিন করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জব্দ করা হয় ছয়টি ড্রেজার ও একটি বাল্কহেড। এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও আজকের পত্রিকা।
এর আগে, ৬ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহিবুল্লাহ খোকন মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে আইনি নোটিশ পাঠান। নোটিশে অবৈধ ড্রেজার ও বালুবাহী নৌযান জব্দ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কয়েকজনকে আটক বা কিছুদিনের জন্য ড্রেজার জব্দ করলেই কি সিন্ডিকেট ভাঙবে? প্রকৃত মালিক, অর্থদাতা ও রাজনৈতিক আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এই ব্যবসা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
সংবাদ করলেই হামলা-হুমকিঅবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে সংবাদ প্রকাশও সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালের ৩ অক্টোবর দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে তদন্ত চিত্র-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সেখানে জহুরুল ইসলাম নকীবের বিরুদ্ধে ফোনে হুমকির অভিযোগ এবং ১৪ আগস্টের ফোনালাপের পর ১৬ আগস্ট ধানমন্ডি থানায় সাধারণ ডায়েরি করার তথ্য প্রকাশিত হয়।
একই প্রতিবেদনে ২০২১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের বিপরীতে এক সাংবাদিককে মারধর ও অপহরণের চেষ্টার অভিযোগও ছাপা হয়। অভিযোগে জহুরুল ইসলাম নকীব, আনোয়ার হোসেন শামীমসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ ছিল। এসব অভিযোগের চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তির তথ্য আমার কাছে নেই।
আমার নিজের সাংবাদিকতা জীবনেও ভোলার নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন এবং সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহলের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ করায় বিভিন্ন সময়ে হামলা ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। জনস্বার্থে সত্য তুলে ধরতে গিয়ে সাংবাদিককে ভয় দেখানো শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর আঘাত নয়; তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জনগণের জানার অধিকারের ওপরও আঘাত। সাংবাদিকের কলম থামিয়ে নদী লুটের হিসাব আড়াল করা যায় না। এ ধরনের প্রতিটি হুমকি ও হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
লোকদেখানো অভিযান নয়, সমাধান চাইভোলাকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার তলদেশ, স্রোতের গতিপথ এবং ভাঙনপ্রবণ এলাকা নিয়ে বৈজ্ঞানিক জরিপ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। অনুমোদিত বালুমহালের সীমানা, ইজারাদার ও উত্তোলনের পরিমাণ জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
অবৈধ উত্তোলনে জড়িত ড্রেজার মালিক, অর্থদাতা ও নিয়ন্ত্রকদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। নদীতীর সংরক্ষণে টেকসই প্রকল্প, ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। নদীভাঙনে বসতভিটা হারানো পরিবারগুলোর জন্য সরকারি খাসজমিতে পুনর্বাসন, নিরাপদ আশ্রয় ও জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে।
বালুখেকোদের প্রতি আমার তীব্র নিন্দা। আপনারা হয়তো কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন, কিন্তু আপনাদের লোভে যে পরিবার একদিনে নিঃস্ব হচ্ছে, তাদের কান্নার দায় কে নেবে? একটি পরিবারের বসতভিটা হারানো মানে শুধু জমি হারানো নয়; হারিয়ে যায় পূর্বপুরুষের স্মৃতি, সন্তানের শৈশব, জীবনের সঞ্চয় ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।
সরকারের কাছে আমার আহ্বান: আওয়ামী লীগ হোক বা বিএনপি, যে দলের পরিচয়ই ব্যবহার করা হোক, অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের রেহাই দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক আশ্রয়, অর্থের দাপট বা প্রশাসনিক প্রভাব যেন বিচারের পথে বাধা না হয়।
ভোলা কোনো বালুখেকো সিন্ডিকেটের সম্পত্তি নয়; এটি লাখো মানুষের জন্মভূমি। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, এবার নদী লুটের সংস্কৃতিরও অবসান হোক। ভোলাকে বাঁচান, নদীকে বাঁচান, মানুষের বসতভিটা ও অস্তিত্ব রক্ষা করুন।
লেখক :যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
ডেল্টা টাইমস/আবুল কালাম আজাদ/সিআর/এমই