মহাকাশের পথে লাইকা: বিজ্ঞানের সাফল্য, নৈতিকতার প্রশ্ন

রেহানা ফেরদৌসী:

মতামত

৩ নভেম্বর ১৯৫৭—মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। মানুষ তখনো মহাকাশে পা রাখেনি। অথচ পৃথিবীর কক্ষপথে একটি জীবন্ত

2026-11-04T11:13:54+06:00
2026-11-04T11:13:54+06:00
বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

মহাকাশের পথে লাইকা: বিজ্ঞানের সাফল্য, নৈতিকতার প্রশ্ন
রেহানা ফেরদৌসী:
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:১৩ এএম   (ভিজিট : ১১)

৩ নভেম্বর ১৯৫৭—মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। মানুষ তখনো মহাকাশে পা রাখেনি। অথচ পৃথিবীর কক্ষপথে একটি জীবন্ত প্রাণীকে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেই অভিযানের যাত্রী ছিল মস্কোর রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো একটি ছোট্ট মেয়ে কুকুর। তার নাম লাইকা। ১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর স্পুটনিক-২ নভোযানে করে তাকে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হয়। পৃথিবীকে প্রদক্ষিণকারী কক্ষপথে পৌঁছানো প্রথম প্রাণী হিসেবে লাইকার নাম মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। কিন্তু এই অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন এক পরিণতি, যা আজও মানুষকে ভাবায়।

লাইকার জন্ম কোনো গবেষণাগারে নয়,তার জীবন শুরু হয়েছিল মস্কোর রাস্তায়। মহাকাশ অভিযানের জন্য নির্বাচিত হওয়ার আগে তার নাম ছিল কুদ্রিয়াভকা, যার অর্থ ছোট্ট কোঁকড়ানো। সে ছিল একটি পথকুকুর। স্পুটনিক-২ অভিযানের প্রস্তুতিতে লাইকার পাশাপাশি আলবিনা ও মুশকা নামের আরও দুটি কুকুরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত লাইকা নির্বাচিত হয়। সংকীর্ণ কেবিনে অবস্থান, উৎক্ষেপণের সময় কম্পন, শব্দ এবং ত্বরণের সঙ্গে অভ্যস্ত করার জন্য তাকে নানা ধরনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তার হৃদ্স্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস ও শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।

লাইকার এই যাত্রার পেছনে ছিল তৎকালীন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শুরু হওয়া স্নায়ুযুদ্ধ তখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। সামরিক শক্তির পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের প্রতিযোগিতাও চলছিল। ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহকে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করে। এর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে স্পুটনিক-২ উৎক্ষেপণ ছিল মহাকাশ গবেষণায় তাদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। তবে এবার নভোযানে ছিল একটি জীবন্ত প্রাণী, যার শারীরিক প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করাই ছিল অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।

স্পুটনিক-২-এ লাইকার জন্য অক্সিজেন সরবরাহ, খাদ্য, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তার শরীরে সংযুক্ত যন্ত্রের মাধ্যমে মহাকাশযাত্রার সময় শারীরিক পরিবর্তনের তথ্য পৃথিবীতে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তখন মহাকাশযানকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার প্রযুক্তি প্রস্তুত ছিল না। ফলে লাইকার জন্য কোনো প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। অর্থাৎ, বিজ্ঞানীরা জানতেন যে এই অভিযানে পাঠানো হলেও তাকে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

উৎক্ষেপণের সময় লাইকার হৃদ্স্পন্দন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়ে গিয়েছিল। মহাকাশে পৌঁছানোর পর কিছু সময় তার শারীরিক অবস্থার তথ্যও পাওয়া যায়। কিন্তু নভোযানের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ায় কেবিনের ভেতরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়। অতিরিক্ত তাপ ও শারীরিক চাপের কারণে উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাইকার মৃত্যু হয় বলে পরবর্তী সময়ে জানা যায়। দীর্ঘদিন সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ প্রকাশ করেনি। ২০০২ সালে প্রকাশিত তথ্যের মাধ্যমে অতিরিক্ত তাপের কারণে তার মৃত্যুর বিষয়টি স্পষ্ট হয়। লাইকার মৃত্যুর পরও স্পুটনিক-২ পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকে এবং ১৯৫৮ সালের ১৪ এপ্রিল বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে ধ্বংস হয়।

লাইকার অভিযানের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মহাকাশযাত্রার সময় একটি প্রাণীর হৃদ্স্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস ও অন্যান্য শারীরিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পান। ওজনহীন পরিবেশে প্রাণীর শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, উৎক্ষেপণের চাপ কতটা প্রভাব ফেলে এবং মহাকাশযানে জীবনধারণের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়। পরবর্তী সময়ে প্রাণী বহনকারী বিভিন্ন পরীক্ষামূলক অভিযানের মাধ্যমে মহাকাশযাত্রার ঝুঁকি ও জীবনরক্ষার প্রযুক্তি সম্পর্কে আরও অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। ১৯৬০ সালে বেলকা ও স্ত্রেলকা নামের দুটি কুকুরকে মহাকাশে পাঠিয়ে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হয়। এর পরের বছর, ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল ইউরি গ্যাগারিন প্রথম মানুষ হিসেবে পৃথিবীর কক্ষপথে পরিভ্রমণ করেন।

তবে বিজ্ঞানের ইতিহাসের এই অধ্যায়কে শুধু সাফল্যের বিবরণ হিসেবে দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালে থেকে যায়। লাইকা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে এই অভিযানে অংশ নেয়নি। মহাকাশযাত্রার উদ্দেশ্য, ঝুঁকি কিংবা তার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে তার জানার সুযোগ ছিল না। মানুষের জ্ঞান ও প্রযুক্তির পরিধি বাড়ানোর জন্য একটি নিরীহ প্রাণীকে এমন এক যাত্রায় পাঠানো হয়েছিল, যেখান থেকে তার ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। এখানেই বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি সামনে আসে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রাণীর ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে লাইকার ঘটনা এই আলোচনাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল। গবেষণার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও প্রাণীর কষ্ট, নিরাপত্তা ও জীবন রক্ষার বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব পাওয়া উচিত—এ প্রশ্ন নতুন করে আলোচিত হয়। বিজ্ঞান মানুষের জীবনকে সহজ ও নিরাপদ করার জন্য কাজ করে,সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্য প্রাণীর জীবন ও কল্যাণের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গবেষণার নৈতিক মানদণ্ডও উন্নত হওয়া জরুরি।

আজ লাইকার স্মৃতি বিভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভ, ভাস্কর্য, ডাকটিকিট, বই ও শিল্পকর্মে সংরক্ষিত রয়েছে। তার নাম মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। কিন্তু তাকে স্মরণ করার অর্থ কেবল প্রথম কক্ষপথযাত্রী প্রাণী হিসেবে তার পরিচয় তুলে ধরা নয়। বরং তার অভিযানের সাফল্য, সীমাবদ্ধতা এবং করুণ পরিণতি থেকে শিক্ষা নেওয়াও জরুরি।

আজ ৩ নভেম্বর। ৬৯ বছর আগে এই দিনে স্পুটনিক-২-এর যাত্রার মধ্য দিয়ে লাইকা পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছেছিল। মহাকাশ গবেষণা আজ অনেক দূর এগিয়েছে। মানুষ চাঁদে গিয়েছে, বিভিন্ন গ্রহ ও উপগ্রহ অনুসন্ধানে মহাকাশযান পাঠিয়েছে, দূর মহাকাশের তথ্য সংগ্রহ করছে। এই অগ্রযাত্রার ইতিহাসে লাইকার অভিযান একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে তার জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞানের সাফল্য মূল্যায়নের সময় শুধু অর্জনের হিসাব করলেই চলে না; সেই অর্জনের পেছনে কী মূল্য দিতে হয়েছে, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

লাইকা তার অভিযানের গুরুত্ব বুঝতে পারেনি, নিজের জীবনের পরিণতিও বেছে নিতে পারেনি। কিন্তু তার মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য পরবর্তী মহাকাশ গবেষণায় অবদান রেখেছে। তাই আজ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে স্বীকার করার পাশাপাশি প্রাণের প্রতি মানুষের দায়িত্বও স্মরণ করা। ভবিষ্যতের বিজ্ঞান যেন আরও উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি আরও মানবিক ও নৈতিক হয়—লাইকার স্মৃতি থেকে আমাদের এই প্রত্যাশাই থাকা উচিত।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক পাঠ

১. NASA — 60 Years Ago: The First Animal in Orbit
২. NASA — A Brief History of Animals in Space
৩. Smithsonian Magazine — Laika Declassified

লেখাটি প্রস্তুতে উপর্যুক্ত তথ্যসূত্রের পাশাপাশি মহাকাশ গবেষণার ইতিহাস বিষয়ক কিছু প্রামাণ্য নিবন্ধ ও প্রকাশনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। তথ্যগুলো বাছাই করে নিজস্ব ভাষা ও বিশ্লেষণে লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

লেখক: সহ সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।

ডেল্টা টাইমস/রেহানা ফেরদৌসী/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ