একটি আধুনিক ও উন্নত সমাজের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করে তার পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা, সুশাসন ও নাগরিক শৃঙ্খলা। সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া কোনো জাতির টেকসই সমৃদ্ধি সম্ভব নয়। অথচ আমাদের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, যত্রতত্র আবর্জনা এবং অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জনজীবনকে প্রতিনিয়ত চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও চারপাশের পরিবেশ সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক কোয়ার্টারসহ মোট ১৩টি সংবেদনশীল স্থানে আকস্মিক পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনের সময় উত্তরায় কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল এবং আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টার চত্বরের অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ প্রত্যক্ষ করে তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তৎক্ষণাৎ চারপাশের জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ করে এলাকাগুলোকে মানুষের বাসযোগ্য করে তোলার জন্য কঠোর নির্দেশ দেন এবং একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেন। একই দিনে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট পরিদর্শনকালে এক চিকিৎসকের কক্ষে অসৌজন্যমূলক ধূমপান ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে তিনি তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ জারি করেন। সরকারের এই কঠোরতা ও সরাসরি তদারকি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের স্থবিরতায় এক নতুন বার্তা ও গতির সঞ্চার করেছে। তবে বাস্তবতা হলো—কেবল সরকারের নির্দেশ বা প্রশাসনিক কড়াকড়ি দিয়ে কোটি কোটি মানুষের এই বিশাল শহরকে সার্বক্ষণিক পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না সাধারণ জনগণ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছেন।
বর্তমানে ঢাকা শহরসহ সারাদেশে ডেঙ্গুর যে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তা মূলত পরিবেশগত অবহেলা ও নাগরিক উদাসীনতারই চরম মাশুল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানেও তা স্পষ্ট। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ৪১৩ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হন এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন। পক্ষান্তরে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৭১ জন এবং এ সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ১৯ হাজার ৮০১ জন। কেবল গত সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের। ডেঙ্গুর এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে রয়েছে জমে থাকা পানি, বন্ধ ড্রেন এবং চরম নাগরিক উদাসীনতা।
অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ মানবস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। চারপাশের ফেলা ময়লা-আবর্জনা ও জমে থাকা পচা পানি মশা, মাছি, ইঁদুর ও নানা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার অবাধ বংশবৃদ্ধির উর্বর ক্ষেত্র। এর সরাসরি পরিণতি হিসেবে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, ডায়রিয়া, জন্ডিস ও কলেরার মতো পানিবাহিত ও মশাবাহিত সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। বাতাসে ধূলিকণা ও বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধ মিশে গেলে হাঁপানি, কফ ও ফুসফুসের সংক্রমণসহ বিভিন্ন ধরনের জটিল শ্বাসতন্ত্রের রোগ দেখা দেয়। এছাড়া, দূষিত পানি ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে চর্মরোগ ও মারাত্মক ত্বকের সংক্রমণ ঘটে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা বারবার পেটের অসুখ ও কৃমির সংক্রমণে ভোগে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিতে বড়ো ধরনের বাধা তৈরি করে।
শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি চারপাশের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ মানুষের মানসিক শান্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যত্রতত্র ফেলা আবর্জনা পচে বাতাসে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়, যা মানুষের মেজাজ খিটখিটে করে তোলে এবং কাজের মানসিক মনোযোগ নষ্ট করে। কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অপরিচ্ছন্ন থাকলে কাজের উৎপাদনশীলতা ও শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ ব্যাহত হয়। অধিকন্তু, পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেনে ফেলার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, যা পুরো নগরজীবনকে থমকে দেয়। বৃষ্টির পানির সাথে মিশে ক্ষতিকর বর্জ্য নদী-নালা ও ভূগর্ভস্থ পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। রাস্তাঘাট ও পর্যটন কেন্দ্রের আবর্জনার ভাগাড় কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই বিনষ্ট করে না, বরং বৈশ্বিক দরবারে আমাদের নাগরিক অসচেতনতা ও সামাজিক শৃঙ্খলায় ঘাটতিকে তুলে ধরে।
পরিবেশ সুরক্ষায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ইতিবাচক দিক উন্মোচন করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঘোষিত বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষা ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে বেশ কিছু আধুনিক ও যুগোপযোগী পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণে স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, দেশব্যাপী সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ রাখা হয়েছে, যার আওতায় থাকবে—বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন, বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা (Recycling) এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন (Waste-to-Energy) প্রকল্প।
প্লাস্টিক দূষণরোধে ‘3R’ নীতি (Reduce, Reuse, Recycle) কার্যকর করে পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টিকারী ক্ষতিকর প্লাস্টিক এবং বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার ধাপে ধাপে সীমিত করে পরবর্তীতে তা বন্ধ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত প্রায় দুই লাখ পরিচ্ছন্নতা কর্মীকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে মেটেরিয়াল রিকভারি সেন্টার গঠন এবং কার্বন নির্গমন মাপার জন্য কেন্দ্রীয় পরিমাপ, রিপোর্টিং ও ভেরিফিকেশন (MRV) ব্যবস্থা চালু করার কথাও বলা হয়েছে। নদী ও খালের নাব্যতা ও পরিচ্ছন্নতা ফেরাতে পাঁচ বছরের মধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল পুনঃখননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ ও ডোর-টু-ডোর বর্জ্য সংগ্রহের মতো আধুনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতার এই প্রচেষ্টাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে যুক্ত করা হয়েছে জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। পরিবেশ দূষণ কমানো ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। সিটি কর্পোরেশন ও সরকারি দপ্তরগুলো কেবল বর্জ্য পরিষ্কারেই সীমাবদ্ধ না থেকে ফাঁকা জায়গা, সড়ক দ্বীপ, নদী তীর ও প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় ব্যাপকভাবে ফলজ ও বনজ গাছ রোপণ করছে, যা শহরের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি বাতাসকে নির্মল রাখতে সহায়ক হবে।
তবে সব ধরনের সরকারি ও প্রশাসনিক উদ্যোগের মূল চাবিকাঠি হলো জনসম্পৃক্ততা। প্রশাসন যতই কঠোর হোক, কোটি কোটি নাগরিক সম্পৃক্ত না হলে একটি শহরকে সর্বদা পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়। মূলত সকল ভালো কাজের সূচনাটা হতে হবে নিজেকে দিয়ে, নিজের আঙিনা থেকে। বিশেষ করে পরিবেশ সুরক্ষা কিংবা পরিচ্ছন্ন নগর গড়তে নাগরিক সচেতনতার বিকল্প নেই। নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা দায়িত্ববোধ ও আইন মেনে চলার মানসিকতা গড়ে উঠলে নগর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম আরও সহজ, গতিশীল ও কার্যকর হয়ে ওঠে। এতে পরিচ্ছন্ন ও নির্মল পরিবেশ মেলে, পাশাপাশি নাগরিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমে। মূলত নাগরিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সকল ধরনের জনদুর্ভোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি লাঘব করা সম্ভব।
কেবল সরকারি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর নির্ভর না করে নাগরিক হিসেবে আমাদেরকে পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে। বসতবাড়ির আবর্জনা নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলতে হবে, বন্ধ করতে হবে যত্রতত্র অস্বাস্থ্যকর-আবর্জনা ফেলা। বাসাবাড়িতে পচনশীল খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ এবং অপচনশীল ময়লা-আবর্জনা দুটি আলাদা পাত্রে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। চলার পথে রাস্তা, পার্ক বা ড্রেনে বর্জ্য না ফেলে নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করে পাট বা কাপড়ের থলে ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে হবে। প্রতি তিন দিন পরপর টব, ড্রাম ও ছাদে জমা পানি পরিষ্কার করতে হবে। শুধু নিজের বাড়ির আঙিনা নয়, নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থলেও একই ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যুক্ত করতে হবে পরিবারের সকলকে। সর্বোপরি, তরুণ প্রজন্ম ও স্থানীয় মহল্লা কমিটির মাধ্যমে নিজ নিজ এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
একটি পরিচ্ছন্ন নগরী কেবল নান্দনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত আবাস নয়, এটি একটি জাতির সুশিক্ষা, নাগরিক শৃঙ্খলা ও সভ্যতার পরিচয় বহন করে। পরিবেশকে অবহেলা করার মাশুল যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, বর্তমান ডেঙ্গু মহামারি আমাদের প্রতিদিই মনে করিয়ে দিচ্ছে। রাষ্ট্র অবকাঠামো বানাতে পারে, সরকারপ্রধান নিজে রাস্তায় নেমে নজরদারি করতে পারেন; কিন্তু নিজের চারপাশ পরিষ্কার রাখা এবং নিজের জীবন রক্ষার মূল দায়িত্ব দিনশেষে আমাদেরই। আমার শহরকে সুন্দর ও বাসযোগ্য রাখার কাজটি শুরু হোক আমারই ঘর থেকে। তবেই বাংলাদেশকে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য আবাস হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
লেখক: সিনিয়র তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর, ঢাকা। পিআইডি ফিচার
ডেল্টা টাইমস/মো. আবুবকর সিদ্দীক/সিআর/এমই