ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর: জাতীয় বিপ্লব ও সংহতির চেতনা

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

মতামত

৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক গতিপথে

2026-11-07T11:04:58+06:00
2026-11-07T11:11:45+06:00
শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর: জাতীয় বিপ্লব ও সংহতির চেতনা
ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম
প্রকাশ: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:০৪ এএম  আপডেট: ০৭.১১.২০২৬ ১১:১১ এএম  (ভিজিট : ৮)

৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটায়। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা এ দিনটিকে ঐতিহাসিক মর্যাদা দিয়েছে। এটি কেবল একটি দিবস নয়; বরং জাতীয় আত্মমর্যাদা ও ঐক্যের প্রতীক।

বাংলাদেশের জন্ম, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক উত্থান-পতন থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে। ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না, আবার অতীতের গণ্ডিতে আটকে থেকেও সামনে এগোনো সম্ভব নয়। ৭ নভেম্বরের অন্যতম শিক্ষা হলো, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
১৯৭৫ সালের পটভূমি: চার দিনের অনিশ্চয়তা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর দেশে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি অংশ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর বাসভবনে বন্দি করে। বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়, রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রধান বিচারপতি আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ৬ নভেম্বর গভীর রাতে সাধারণ সিপাহিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাল্টা অভ্যুত্থান শুরু করেন। তাঁদের সঙ্গে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। পাল্টা অভ্যুত্থানের সময় খালেদ মোশাররফ ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী নিহত হন।

৭ নভেম্বর সৈনিক ও সাধারণ মানুষ ঢাকার রাজপথে নেমে আসেন। তাঁদের এই সম্মিলিত উপস্থিতি সারা দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। রেডিওতে জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে ভেসে আসে, ‘আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি।’ তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার এবং নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।

সেদিন রাজধানীর রাজপথ ছিল মিছিলের নগরী। সিপাহি ও সাধারণ মানুষ পরস্পরকে আলিঙ্গন করেন। ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ ও ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। সাধারণ মানুষ ট্যাঙ্কের নলে ফুলের মালা পরিয়ে দেন। এভাবেই ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়।

আন্তর্জাতিক সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড গ্রন্থে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছেন। তাঁর বর্ণনায়, ৫ ও ৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে প্রচারপত্র ছড়ানো হয়। ৭ নভেম্বর ভোরে সিপাহিরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে আসেন এবং দ্রুত পুরো ক্যান্টনমেন্টের নিয়ন্ত্রণ নেন। একদল সৈনিক জিয়াউর রহমানের বাসভবনে গিয়ে তাঁকে মুক্ত করেন। পরে তাঁকে কাঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ২ ফিল্ড আর্টিলারির সদর দপ্তরে।

মাসকারেনহাসের বর্ণনায়, রেডিওতে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের খবর প্রচারিত হওয়ার পর হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। সৈনিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আনন্দ ও সংহতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তাঁর ভাষায়, সেই রাত ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি স্মরণীয় রাত।

৭ নভেম্বরের তাৎপর্য ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব

৭ নভেম্বরের মূল তাৎপর্য স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জাতীয় আত্মমর্যাদাবোধের জাগরণ। এ দিন দেশের মানুষ নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রত্যয় প্রকাশ করে। বৈদেশিক আধিপত্যের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় স্বকীয়তা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এ দিনের চেতনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বরের পর রেডিওতে দেওয়া ভাষণে সাময়িকভাবে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের কথা জানান। সেনাবাহিনীর অনুরোধ এবং দেশের পরিস্থিতির কারণে তিনি এ দায়িত্ব নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে সবাইকে কাজে যোগ দেওয়া এবং দেশ পুনর্গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। দলটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পথের মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়।

জিয়াউর রহমানের জীবন ও মুক্তিযুদ্ধ

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার বাগাবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মুহাম্মদ মনসুর রহমান এবং মা জাহানারা খাতুন। ডাকনাম ছিল কমল। শৈশবের একটি সময় বগুড়ায় কাটলেও পরে পরিবারের সঙ্গে কলকাতা ও করাচিতে বসবাস করেন। করাচি একাডেমি স্কুল থেকে ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন।

১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সামরিক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করলে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে চট্টগ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন মেজর জিয়াউর রহমান। ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। মুজিবনগর সরকার গঠনের পর তিনি সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনটি সেক্টরের সমন্বয়ে গঠিত জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে কর্নেল, ১৯৭৩ সালে ব্রিগেডিয়ার এবং পরে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন।

রাষ্ট্রনায়ক জিয়া ও বহুদলীয় গণতন্ত্র

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বিএনপি প্রতিষ্ঠা। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত দলটিতে বাম, ডান ও মধ্যপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ যুক্ত হন। তরুণদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য।

১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন। একই বছরের মে মাসে ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচির পক্ষে জনসমর্থন যাচাইয়ে ৩০ মে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল দেশ ও জনগণ। তিনি গ্রামাঞ্চল সফর করে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করতেন। তাঁর নেতৃত্বে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ রামপুরা টেলিভিশন ভবনে এক সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা সকলে বাংলাদেশী। আমরা প্রথমে বাংলাদেশী এবং শেষেও বাংলাদেশী। এই মাটি আমাদের, এই মাটি থেকে আমাদের অনুপ্রেরণা আহরণ করতে হবে। জাতিকে শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য। ঐক্য, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও কঠোর মেহনতের মাধ্যমেই তা সম্ভব।’

১৯ দফা কর্মসূচি ও উন্নয়নের রাজনীতি

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা, কৃষির উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রসার এবং প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ।

কর্মসূচিতে আরও গুরুত্ব পায় নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, যুবসমাজকে সংগঠিত করা, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক গড়ে তোলা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার সংরক্ষণ।

১৯ দফার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ছিল—

১. দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা।
২. গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও সামাজিক-অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
৩. আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠন।
৪. প্রশাসন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
৫. কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন।
৬. খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন।
৭. সবার জন্য বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা।
৮. নিরক্ষরতা দূরীকরণ।
৯. সবার জন্য ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা।
১০. নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও যুবসমাজকে জাতি গঠনে সম্পৃক্ত করা।
১১. বেসরকারি খাতের বিকাশ ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করা।
১২. শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধি।
১৩. সরকারি কর্মচারীদের জনসেবায় উদ্বুদ্ধ করা।
১৪. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ।
১৫. সব দেশের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
১৬. প্রশাসন ও উন্নয়ন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ।
১৭. স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা।
১৮. দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায়নীতিভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা।
১৯. ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ও জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করা।

জিয়াউর রহমানের সময়ে কৃষি, শিক্ষা, শিল্প, যোগাযোগ ও গ্রামীণ উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়। সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণে খাল খনন ও পুনঃখনন, গণশিক্ষা কার্যক্রম, গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার প্রসারে উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেসরকারি খাতের বিকাশ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং শিল্পায়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্পসহ অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণে তাঁর সরকারের উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। নারী ও যুবসমাজকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের বিকাশেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ

জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সব দেশের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। ভারত, চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তিনি উদ্যোগী হন। মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন।

জাতিসংঘকেন্দ্রিক কূটনৈতিক তৎপরতা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল। তাঁর সময়কার কূটনৈতিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও তাঁর পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পরবর্তী সময়ে এ উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে: শহীদ জিয়াউর রহমান

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। এর আগে ২৯ মে তিনি চট্টগ্রামে পৌঁছান। স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসনে নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন।

৩০ মে গভীর রাতে একদল সেনাসদস্য সার্কিট হাউসে হামলা চালায়। গোলাগুলির মধ্যে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত কয়েকজন কর্মকর্তা ও সদস্য নিহত হন। একপর্যায়ে হামলাকারীরা জিয়াউর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে। ভোরের দিকে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে।

তাঁর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে। রাজধানী ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবনের উত্তর পাশে চন্দ্রিমা উদ্যানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ জনমনে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তার পরিচয় বহন করে।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নে তাঁর সমর্থক ও সমালোচকদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিএনপি এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শন দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছে।
২০২৬ সালের প্রাসঙ্গিকতা: জাতীয় ঐক্যের অঙ্গীকার

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ছিল স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবিতে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান, ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ছিল ফ্যাসিবাদী ও জনবিরোধী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের জাগরণ। এসব আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন।

বর্তমান বাস্তবতায় ৭ নভেম্বরের শিক্ষা হলো, দলীয় বিভেদ, প্রতিহিংসা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

৭ নভেম্বরের চেতনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। এটি লাখো শহীদের আত্মত্যাগ এবং কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার ফসল। তাই জাতীয় ঐক্য, দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধারণ করেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে হবে।

এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—কেউ যেন দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার হরণ করতে না পারে। বাংলাদেশের স্বার্থই হবে সব সিদ্ধান্তের প্রধান বিবেচনা। দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী মানুষের উচ্চারণ হোক, ‘দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’

৭ নভেম্বর কোনো আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের চেতনা ধারণের দিন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় তিনি তুলে ধরেছিলেন, ৭ নভেম্বরের চেতনা সেই লক্ষ্য অর্জনে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়।


                                                                        লেখক: ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র।








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ