কোন এলাকায় সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো প্রয়োজন, বাজেটে কোন খাতে কত বরাদ্দ দেওয়া উচিত, কৃষি খাতে জন্য কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন - এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আগে জানতে হবে বাস্তব অবস্থা। আর বাস্তব অবস্থা বুঝতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান। জনসংখ্যা, আয়, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তথ্য পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
সেই তথ্যের প্রধান যোগানদাতা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। ২০ অক্টোবর জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস। জাতিসংঘের বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবসও একই তারিখে পড়ে। বিশ্বজুড়ে এদিন সরকারি পরিসংখ্যানকে সবার জন্য একটি সম্পদ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
জাতীয় পরিসংখ্যান কার্যালয় হিসেবে বিবিএস আদমশুমারি, জরিপ, জাতীয় আয় হিসাব ও মূল্য পরিসংখ্যান তৈরি করে। এসব তথ্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পর্যবেক্ষণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের কাজেও লাগে। এসডিজির সূচকে দেশ কতটা এগোল, তা নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ছাড়া পরিমাপ করা যায় না। ২০২৬-২০৩০ মেয়াদের কৌশলগত কাঠামোয় তাই পরিসংখ্যানকে জনসম্পদ বলা হয়েছে। জনসম্পদ হিসেবে পরিসংখ্যানের সুফল সবার জন্য প্রাপ্য। নীতিনির্ধারক, গবেষক, গণমাধ্যমকর্মী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিক, সবাই এর মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন।
পরিসংখ্যানের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, সময়মতো প্রকাশ ও সহজলভ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় কয়েকটি চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থার (NSS) আওতায় বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা আইনে স্পষ্ট নয়। আদমশুমারি ও মূল জরিপের অনেকগুলোর অর্থায়ন অনিয়মিত, তাই কাজ পিছিয়ে যায় এবং Advance Release Calendar (ARC) অনুসরণ করা কঠিন হয়। সংস্থাভেদে ধারণা ও শ্রেণিবিন্যাস আলাদা হওয়ায় তথ্য মেলানো যায় না।
ওপেন ডেটা ইনভেন্টরি (ODIN) ২০২৪ অনুযায়ী, ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের কাভারেজ স্কোর ৫৩, উন্মুক্ততার স্কোর ৪০ এবং সামগ্রিক স্কোর ৪৬। ১৯৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩২তম। তথ্য উৎপাদনে অগ্রগতি থাকলেও উপাত্তের উন্মুক্ততা, মেশিন-পাঠযোগ্য ফরম্যাট ও মেটাডেটার ক্ষেত্রে উন্নতির সুযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে সরকারি তথ্যের ব্যবহার বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি ঘটতে পারে।
সংস্কারের প্রস্তাবগুলো মূলত আইন, পেশাগত স্বাধীনতা ও অর্থায়নকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে। পরিসংখ্যান আইন, ২০১৩ সংশোধন করে জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং বিবিএস ও অন্যান্য সংস্থার দায়িত্ব স্পষ্ট করা হবে। প্রশাসনিক তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ে বিবিএসকে আইনি ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি পরিসংখ্যান প্রকাশের নীতিমালা, কারিগরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ জরিপের জন্য নিয়মিত সরকারি বরাদ্দ ও মধ্যমেয়াদি অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা হবে। জরিপের সময়সূচিও আগেই ঘোষণা করা হবে।
তথ্যের মান নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের জাতীয় মান নিশ্চিতকরণ কাঠামো (UN-NQAF) ও জেনেরিক স্ট্যাটিস্টিক্যাল বিজনেস প্রসেস মডেল (GSBPM) অনুসরণের পরিকল্পনা রয়েছে। তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, বিশ্লেষণ ও প্রকাশের প্রতিটি ধাপে মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান পণ্যের সঙ্গে মানসংক্রান্ত প্রতিবেদন এবং জনশুমারির পর শুমারি-পরবর্তী যাচাই জরিপের ব্যবস্থাও থাকবে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে পদ্ধতিগত পরামর্শক কমিটি ও জাতীয় পরিসংখ্যান সমন্বয় পরিষদ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, রাজস্ব ও নিবন্ধনসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিন্যাসে সামঞ্জস্য আনা হবে।
সময়মতো প্রকাশও সংস্কারের অংশ। খানা আয়-ব্যয় জরিপ, শ্রমশক্তি জরিপ, স্বাস্থ্য ও রুগ্নতা জরিপ এবং কৃষি শুমারিসহ মূল জরিপের প্রকাশের তারিখ আগে থেকে জানানো হবে। প্রতিটি প্রকাশের সঙ্গে মেটাডেটা ও সংশোধননীতি থাকবে। তথ্য সংগ্রহ থেকে প্রকাশ পর্যন্ত সময় কমানো এবং জরিপের দুই দফার মধ্যে সময়ের ফাঁক ছোটো করা অগ্রাধিকার পাবে।
মাঠের কাজে কম্পিউটার-সহায়ক সরাসরি সাক্ষাৎকার (CAPI), ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (GIS) ও জিও-ফেন্সিং আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহার হবে। রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ডে তথ্য সংগ্রহের অগ্রগতি দেখা যাবে। ফলে ভুল ধরা পড়বে দ্রুত।
হাতে হাতে পাঠানো তথ্যের জায়গায় স্বয়ংক্রিয় এপিআই-নির্ভর আদান-প্রদান আসবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ভ্যাট, কাস্টমস, নিবন্ধন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষার তথ্যব্যবস্থা এর আওতায় থাকবে। এই তথ্য দিয়ে জনসংখ্যা, ব্যবসা ও খামারের নিবন্ধন হালনাগাদ রাখা হবে। তথ্য সংরক্ষণের জন্য নিরাপদ ডেটা ওয়্যারহাউস ও মেটাডেটা ভান্ডার গড়া হবে।
জনসংখ্যা, ব্যবসা ও কৃষি খাতের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ রাখতে নিবন্ধনভিত্তিক ব্যবস্থাও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধনভিত্তিক জনসংখ্যা ব্যবস্থা (NPR), ব্যবসা নিবন্ধন (SBR) এবং খামার নিবন্ধন অন্তর্ভুক্ত। জনসংখ্যা নিবন্ধনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক তথ্য, ব্যবসা নিবন্ধনে অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪, রাজস্ব বোর্ড, নিবন্ধন ও ভ্যাটের তথ্য এবং খামার নিবন্ধনে কৃষি শুমারি ও কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য বিভাগের তথ্য কাজে লাগানো হবে।
স্থানীয় পর্যায়ের চাহিদা মেটাতেও প্রযুক্তি কাজে লাগবে। ক্ষুদ্র এলাকা পরিমাপ পদ্ধতি ও ভূস্থানিক তথ্য দিয়ে জেলা ও উপজেলার হিসাব তৈরি হবে। এসব হিসাব স্থানীয় পর্যায়ে এসডিজির অগ্রগতি দেখার কাজে আসবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ঝুঁকির তথ্যের গুরুত্ব বাড়ছে। ভূস্থানিক তথ্য, পরিবেশ হিসাব ও দুর্যোগ পরিসংখ্যান যুক্ত করে এসডিজি ও সেন্ডাই কাঠামোর (Sendai Framework for Disaster Risk Reduction 2015-2030) সঙ্গে মিল রেখে এসব সূচক তৈরি করা হবে। এখন গবেষক বা সাংবাদিক বিস্তারিত ডেটা চাইলে পিডিএফ প্রতিবেদন, ছড়ানো ওয়েবপেজ বা আনুষ্ঠানিক আবেদনের ওপর নির্ভর করেন। এতে সময় যায়, অনেক সময় একই তথ্য বারবার চাওয়া হয়।
প্রস্তাবের কেন্দ্রে আছে বেনামি মাইক্রোডেটার অনলাইনে ও বিনামূল্যে প্রকাশ। মাইক্রোডেটা মানে জরিপের ব্যক্তিপর্যায়ের উত্তর। এখান থেকে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করার সব সূত্র মুছে ডেটা প্রকাশ করা হবে। সঙ্গে থাকবে প্রশ্নপত্র, কোডবুক, নমুনা পদ্ধতি, ওজন-নির্ধারণের নিয়ম, পদ্ধতির টিকা, মান-সংক্রান্ত বিবৃতি ও ব্যবহারের শর্ত। অগ্রাধিকার ডেটাসেটের মধ্যে আছে আদমশুমারি, খানা আয়-ব্যয় জরিপ, শ্রমশক্তি জরিপ, কৃষি শুমারি ও অর্থনৈতিক শুমারি। ডেটাসেটের তালিকা, হালনাগাদের সময়সূচি ও ব্যবহারকারীদের মতামত জানানোর সুযোগও থাকবে। জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, শ্রম, মূল্য, জিডিপি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, জলবায়ু ও এসডিজি সূচকের উপাত্ত এক জায়গায় আনতে বিবিএস, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ (SID) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো নিয়মিত উপাত্ত প্রকাশের ব্যবস্থা করবে।
উপাত্তের গোপনীয়তা রক্ষায় তিন স্তরের প্রবেশাধিকার থাকবে। প্রথম স্তরে সবার জন্য উন্মুক্ত উপাত্ত পাওয়া যাবে। দ্বিতীয় স্তরে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মাধ্যমে নির্দিষ্ট উপাত্ত ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। আর অতি সংবেদনশীল উপাত্ত ব্যবহারের জন্য থাকবে নিরাপদ গবেষণাগার।
এসব কার্যক্রম পরিচালনায় একটি মাইক্রোডেটা ও মেটাডেটা ইউনিট গঠন করা হবে। এর মূলনীতি হবে, উপাত্ত সাধারণভাবে উন্মুক্ত থাকবে, তবে নকশা থেকেই এর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করা হবে। এতে তথ্যপ্রাপ্তির প্রশাসনিক জটিলতা কমবে, গবেষণার মান বাড়বে এবং সরকারি উপাত্ত সবার জন্য সহজলভ্য হবে। পাশাপাশি, সহজ ভাষায় ব্যাখ্যামূলক নোট ও ব্যবহারকারী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে উপাত্তের ভুল ব্যাখ্যার ঝুঁকি কমবে। ব্যবহারকারীদের মতামত ও উপাত্ত ব্যবহারের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ডেটাসেট হালনাগাদ করা যাবে। এতে গবেষণা ও উদ্ভাবনের নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং নীতিনির্ধারণে আরও কার্যকর তথ্য পাওয়া যাবে।
উপাত্তের সঠিক ব্যবহার এবং এর যথাযথ ব্যাখ্যার জন্য সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে তথ্য সাক্ষরতা বা 'ডাটা লিটারেসি' বাড়ানো জরুরি। নীতিনির্ধারক, গণমাধ্যমকর্মী, গবেষক এবং স্থানীয় সরকার কর্মকর্তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বস্তরে সঠিক পরিসংখ্যানের ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভুল তথ্যের অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব।
জনআস্থার জন্য স্বচ্ছতা দরকার। সংশোধনের কারণ, পদ্ধতি ও প্রশাসনিক তথ্যের ব্যবহার নিয়ে বিবিএস খোলামেলা জানাবে। নীতি-সংক্ষেপ, সহজ ভাষার নোট ও ড্যাশবোর্ড বড়ো প্রকাশনার সঙ্গে থাকবে। ব্যবহারকারীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ হবে এবং একজন মুখপাত্র গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তর দেবেন। ব্যবহারকারী সন্তুষ্টি জরিপও নিয়মিত করার কথা আছে।
২০৩০ সালের মধ্যে দুটি লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণ করে মূল পরিসংখ্যান পণ্যের অন্তত ৯৫ শতাংশ প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি, সব মূল পণ্যের বেনামি মাইক্রোডেটা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকাশ করা হবে। প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি পরিমাপে ফলাফলভিত্তিক পরিবীক্ষণ কাঠামো থাকবে। উপাত্ত উৎপাদন, মান, প্রকাশ, প্রশাসনিক তথ্যের ব্যবহার, ডিজিটাল রূপান্তর ও ব্যবহারকারীর সন্তুষ্টির সূচকে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে। পরিসংখ্যান পরিষদ বাস্তবায়ন তদারক করবে। পাশাপাশি, নিয়মিত স্বাধীন পর্যালোচনার ব্যবস্থাও থাকবে।
এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে নীতিনির্ধারকদের সহযোগিতা দরকার। পরিসংখ্যানকে জনসম্পদ হিসেবে দেখা, মূল জরিপের জন্য নিরাপদ অর্থায়ন ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং নিজ নিজ দপ্তরের ডেটা উন্মুক্ত করা, এই তিন কাজে তাঁদের সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা রাখবে। সময়মতো ও উন্মুক্ত পরিসংখ্যান থাকলে প্রতিটি সিদ্ধান্ত যাচাই করা যায়, আর নাগরিকেরা সরকারি তথ্যে ভরসা পান।
লেখক : বিসিএস পরিসংখ্যান ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। পিআইডি ফিচার
ডেল্টা টাইমস/মো. নিজাম -উদ-দৌলা/সিআর/এমই