দাম্পত্যের দায়িত্ববোধেই গড়ে ওঠে দায়িত্বশীল পিতৃত্ব

রেহানা ফেরদৌসী:

মতামত

আমাদের সমাজে একটি কথা প্রায়ই শোনা যায়—“স্বামী হিসেবে মানুষটি ভালো না হলেও বাবা হিসেবে অসাধারণ।” কথাটি বলার সময়

2026-10-15T10:28:17+06:00
2026-10-15T10:46:41+06:00
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৩১ আশ্বিন ১৪৩৩

দাম্পত্যের দায়িত্ববোধেই গড়ে ওঠে দায়িত্বশীল পিতৃত্ব
রেহানা ফেরদৌসী:
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২৮ এএম  আপডেট: ১৫.১০.২০২৬ ১০:৪৬ এএম  (ভিজিট : ২২)

আমাদের সমাজে একটি কথা প্রায়ই শোনা যায়—“স্বামী হিসেবে মানুষটি ভালো না হলেও বাবা হিসেবে অসাধারণ।” কথাটি বলার সময় আমরা হয়তো ভুলে যাই, একজন মানুষের পারিবারিক আচরণ তার সন্তানের বেড়ে ওঠার পরিবেশকেও প্রভাবিত করে। যে পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অবহেলা, অসম্মান, অবিশ্বাস কিংবা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতায় ভারাক্রান্ত, সেখানে সন্তানের সুস্থ মানসিক বিকাশের পথও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অবশ্যই, দাম্পত্য জীবনের দুর্বলতা দিয়ে একজন মানুষের পিতৃত্বের সম্পূর্ণ মূল্যায়ন করা যায় না। কিন্তু স্বামী হিসেবে দায়িত্ববোধের অভাব সন্তানের প্রতি কর্তব্য পালনেও প্রভাব ফেলতে পারে—এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করারও সুযোগ নেই। বিষয়টি পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, বরং পরিবারে একজন মানুষের বহুমাত্রিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান।

সংসার শুধু উপার্জনের হিসাব নয়। পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, কিন্তু অর্থ উপার্জনই একজন স্বামী কিংবা বাবার একমাত্র কর্তব্য নয়। সংসারের দৈনন্দিন কাজ, সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসা, পরিবারের সদস্যদের মানসিক সুস্থতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাস্তবে অনেক পরিবারে দেখা যায়, একজন অভিভাবক উপার্জনের পাশাপাশি সংসারের প্রায় সব কাজ সামলাচ্ছেন, অন্যজনের অংশগ্রহণ সীমিত। কখনো দুজনই কর্মজীবী, অথচ ঘরের কাজ ও সন্তান প্রতিপালনের অধিকাংশ দায়িত্ব একজনের ওপরই বর্তায়। ফলে তাকে নিজের বিশ্রাম, পেশাগত উন্নতি কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজন বিসর্জন দিতে হয়। “আমি উপার্জন করি, আমার দায়িত্ব শেষ”—এমন ধারণা সংসারের অংশীদারত্বকে সংকুচিত করে। কারণ অর্থ পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু একাকিত্ব দূর করতে পারে না; সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে দেওয়া যায়, কিন্তু তার মনের কথা শোনার বিকল্প তৈরি করা যায় না।

সন্তানের প্রথম শিক্ষালয় তার পরিবার। শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে শেখে না, চারপাশের আচরণ দেখেও জীবন সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। বাবা-মা একে অপরের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেন, মতবিরোধের সময় কীভাবে কথা বলেন এবং বিপদের দিনে পরস্পরের পাশে দাঁড়ান কি না—এসব অভিজ্ঞতা তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কবোধকে প্রভাবিত করতে পারে।

যে শিশু দেখে তার মায়ের পরিশ্রমকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে, তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না কিংবা সামান্য ভুলেও তাকে অপমানিত হতে হচ্ছে, তার কাছে অসম্মানজনক আচরণ স্বাভাবিক বলে মনে হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একইভাবে, যে শিশু দেখে বাবা-মা পরস্পরের কথা শোনেন, কাজ ভাগ করে নেন এবং মতবিরোধেও মর্যাদা বজায় রাখেন, সে সহযোগিতা ও শ্রদ্ধার বাস্তব শিক্ষা পায়। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: সন্তানের সামনে সব সময় মতবিরোধহীন থাকার প্রয়োজন নেই; বরং মতপার্থক্যকে কীভাবে সম্মানজনকভাবে সামলানো যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

সুস্থ সম্পর্কের শিক্ষা নিখুঁত আচরণ থেকে আসে না, আসে দায়িত্বশীল আচরণ থেকে। সন্তানের জীবনে বাবার ভূমিকা কেবল খরচ বহন কিংবা শাসন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া, অসুস্থতায় পাশে থাকা, ব্যর্থতায় সাহস দেওয়া, আনন্দের মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া এবং তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়াও পিতৃত্বের অংশ।

ধরা যাক, একটি শিশু স্কুল থেকে ফিরে বাবাকে কিছু বলতে চায়। বাবা বারবার ফোনের দিকে তাকিয়ে বলেন, “পরে বলো।” ঘটনাটি একদিনের হলে তাতে বড় কোনো সমস্যা নাও থাকতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন এমন ঘটতে থাকলে শিশুটি ধীরে ধীরে নিজের কথা ভাগ করে নেওয়ার আগ্রহ হারাতে পারে। পরে সেই সন্তান বাবার সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখলে শুধু তার আচরণ নিয়ে অভিযোগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; সম্পর্কের ভিত কোথায় দুর্বল হয়েছে, সেটিও বুঝতে হবে।

তবে কর্মস্থলে ব্যস্ততা, দূরে অবস্থান কিংবা অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে সব সময় শারীরিকভাবে পাশে থাকা সম্ভব হয় না। তাই অনুপস্থিতি মানেই অবহেলা নয়। দূরে থেকেও নিয়মিত যোগাযোগ, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ এবং সন্তানের প্রয়োজনের প্রতি আন্তরিক মনোযোগের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। পার্থক্যটি পরিস্থিতিগত সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘস্থায়ী উদাসীনতার মধ্যে।

এই দায়িত্বহীনতার পেছনে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও ভূমিকা আছে। আমাদের সমাজ দীর্ঘদিন ধরে পুরুষকে উপার্জনকারী ও কর্তৃত্বশীল ভূমিকায় দেখতে অভ্যস্ত। অন্যদিকে, সন্তান প্রতিপালন এবং ঘরের কাজকে নারীর স্বাভাবিক কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে অনেক পুরুষ ছোটবেলা থেকেই সংসারের কাজে অংশ নেওয়ার কিংবা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার যথেষ্ট সুযোগ পান না। এই সামাজিক শিক্ষার প্রভাব স্বীকার করা জরুরি, তবে তা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত হতে পারে না। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকেই নিজের আচরণের দায় নিতে হয়। একজন স্বামী যদি স্ত্রীর ক্লান্তি বুঝতে চেষ্টা করেন, সংসারের কাজে অংশ নেন এবং সন্তানের পরিচর্যায় সক্রিয় হন, তাহলে তিনি নিজের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

এখানে নারীদেরও একটি ভূমিকা রয়েছে। কখনো অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, অবিশ্বাস কিংবা “তুমি পারবে না, আমিই করি”—এমন মনোভাব অন্য অভিভাবকের অংশগ্রহণের সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে। তাই দায়িত্ব ভাগ করার পাশাপাশি একে অপরকে শেখার, ভুল শোধরানোর এবং ধীরে ধীরে দক্ষ হয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তবে এর অর্থ এই নয় যে দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা কিংবা অসম দায়িত্বের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকেই দায়ী করা হচ্ছে।

পরিবর্তনের শুরু হোক নিজের পরিবার থেকেই। সমাধানের জন্য সব সময় বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিন কিছুটা সময় ফোন সরিয়ে, সব দুশ্চিন্তা দূরে রেখে পরিবারের সদস্যদের কথা শোনা, সন্তানদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, ঘরের কাজ ভাগাভাগি করা কিংবা স্ত্রীর দিনটি কেমন কেটেছে তা জানতে চাওয়া—ছোট এই অভ্যাসগুলো সম্পর্কের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে পারে।

একই সঙ্গে ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো দরকার, শক্তিশালী হওয়ার অর্থ অন্যের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা নয়; প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো, নিজের ভুল স্বীকার করা এবং দায়িত্ব গ্রহণ করাও শক্তির পরিচয়। স্কুল, পরিবার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক পিতৃত্ব এবং যৌথ অভিভাবকত্ব নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে।

পরিবারের কোনো সদস্য দীর্ঘদিন অবহেলা, অপমান কিংবা অন্যায্য চাপের শিকার হলে সেটিকে শুধু ঘরোয়া বিষয় বলে উপেক্ষা করা উচিত নয়। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত ব্যক্তির সহায়তা, পারিবারিক পরামর্শ কিংবা উপযুক্ত পেশাগত সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। সম্পর্ক রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই চেষ্টায় কারও মর্যাদা ও মানসিক সুস্থতাকে বিসর্জন দেওয়া সমাধান নয়।

পরিশেষে, একজন ভালো বাবা হওয়ার জন্য নিখুঁত মানুষ হওয়া আবশ্যক নয়। প্রয়োজন নিজের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতা, ভুল শোধরানোর মানসিকতা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতি যথাযথ সম্মান। দাম্পত্যের দায়িত্ববোধ ও পিতৃত্বের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে; একটি সুস্থ সম্পর্ক সন্তানের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করে। তবে সেই সম্পর্ক গড়ে ওঠে দুজনের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও পারস্পরিক সহযোগিতায়। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে শুধু তার জন্য কতটা ব্যয় করা হলো তা নয়, তার সামনে কেমন সম্পর্কের দৃষ্টান্ত রেখে যাওয়া হলো, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একজন বাবা তার সন্তানকে নিজের পরিচয় দেন, কিন্তু তার আচরণ সেই সন্তানকে শেখায় কীভাবে অন্য মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। তাই পরিবারের কর্তা হওয়ার চেয়ে পরিবারের নির্ভরযোগ্য মানুষ হয়ে ওঠাই বড় অর্জন। বাবা হওয়া জৈবিক পরিচয়; দায়িত্ববান বাবা হয়ে ওঠা প্রতিদিনের চর্চা। আর সেই চর্চার অন্যতম ভিত্তি হলো দাম্পত্যে সম্মান, সহযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
     
লেখক: সহ সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।

ডেল্টা টাইমস/রেহানা ফেরদৌসী/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ