রুটি, শৈশব অথবা মানুষ-অমানুষের সমাজ

অলোক আচার্য:

মতামত

এক টুকরো রুটি চুরির মহা অপরাধে এক শিশুকে অমানবিক নির্যাতন করেছে একজন মানুষ! হ্যাঁ, তিনি নিরাপত্তাকর্মী হোন, আর

2026-10-07T10:39:11+06:00
2026-10-07T10:39:11+06:00
বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

রুটি, শৈশব অথবা মানুষ-অমানুষের সমাজ
অলোক আচার্য:
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৯ এএম   (ভিজিট : ৭)

এক টুকরো রুটি চুরির মহা অপরাধে এক শিশুকে অমানবিক নির্যাতন করেছে একজন মানুষ! হ্যাঁ, তিনি নিরাপত্তাকর্মী হোন, আর যেন হোন আদতে মানুষের মতোই দেখতে তো! এখানেই আমরা ভুলটা করি। এখন তো মানুষ দেখলেই তাকে মানুষ বলে দেওয়া যাবে না। মানুষ যে মানুষ এটা প্রমাণ করতে হয় কর্মে, আকারে নয়, প্রকারে নয়। অথচ আমরা চার হাত-পা নিয়ে জন্ম নিয়েই নিজেকে মানুষ বলে দাবি করছি। এই যে একটি ছোট্ট শিশুকে সামান্য অপরাধে (এটা কতটুকু অপরাধ সন্দেহ আছে) নির্যাতন করা হয়েছে। অনেক কিছুই ঘটছে, শিশুদের উপর নির্যাতন খুব সহজেই হচ্ছে, আমরা কিছুই করতে পারছি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে নিন্দা করছি, উচিত ছিল না বলছি কিন্তু মানুষগুলোকে সেভাবে তৈরি করতে পারছি না। প্রতিটি মানুষকে যদি মানবিক প্রশিক্ষণের একটা ব্যবস্থা করা যেতো ভালো হতো। যা শিশুকাল থেকেই পাওয়ার কথা, পরিবারের দেওয়ার কথা সেটা বুড়ো হয়ে গেলেও হচ্ছে না। এই ব্যর্থতা কি পরিবারের নাকি সমাজের। কোন সমাজ? মানুষ বেঁচে আছে, মানবতা মরে গেছে। আপাত সমাজের দিকে তাকালে এটাই প্রতীয়মান হয়। কিছুদিন আগে এক নিঃসঙ্গ মায়ের কয়েকদিন আগে মৃতদেহ পাওয়ায় দেশজুড়ে খুব সমালোচনা এখনও হচ্ছে। আলোচনার মূলে রয়েছে সন্তানদের অমানবিকতার বিষয়টি। প্রতিষ্ঠিত কিন্তু মায়ের খোঁজ নেওয়ার সময়টুকু পাননি! সত্যি কি এই কর্পোরেট যুগে এটাই শেষ! না এটা শুরু অথবা অনেক আগেই এর শুরু হয়ে গেছে?  প্রায় একই সময়ে কাছাকাছি ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে গেছে। রাজধানীর পল্লবীর বাসা থেকে ৫৫ বছরের এক নারীর অর্ধগলিত লাশ পুলিশ উদ্ধার করে। এটাই কি মানুষের বর্তমান নিয়তি! সিনিয়র সিটিজেনদের নিঃসঙ্গতা কাটাতে পরিবার কাছে থাকছে না। জাপানের কথা জানি। সেখানে প্রায়ই কোনো ফ্ল্যাট থেকে পঁচে যাওয়া লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কারণ সেখানে বয়স্ক জীবন মানে নিঃসঙ্গ জীবন। স্বামী বা স্ত্রী মারা গেলে শুরু হয় একাকীত্বের জীবন। নয়শো কোটির এই বিশাল পৃথিবীতে মানুষ সত্যিই খুব একা হয়ে পরছে। এবার আসি আমাদের দেশের বৃদ্ধাশ্রমগুলোর হিসাবে। কিছুদিন আগেই টিভির একটি প্রতিবেদনে দেখেছিলাম এক সময় ঢাকার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ সন্তানের উপর অভিমান করে বৃদ্ধাশ্রমে এসে রয়েছেন। অভিমান এমনি এমনি হয়নি। সন্তানের ব্যবহারের কারণে হয়েছে। দেশে যে এত বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে সেখানে যাদের ঠাঁই হচ্ছে তাঁদের একটি বড়ো অংশের সন্তানরাই কিন্তু সমাজে প্রতিষ্ঠিত এবং তথাকথিত হাই সোসাইটির সম্মানিত সদস্য। এটা লজ্জার না অনুশোচনার সেখানে পরে আসছি। মূলত চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরেই আজীবন সংসারের দায়িত্ব পালন করা মানুষগুলো পরিবারের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠছেন। তাদের আর্থিক কন্ট্রিবিউশন না থাকায় তাঁরা অবহেলার স্বীকার হন। একটা সময় তাদের ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে। পল্লবীর ঘটনায় যে পদক্ষেপ নেওয়া হলো বৃদ্ধাশ্রমে থাকা সেইসব পিতামাতার সন্তানদের বিরুদ্ধে কি আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না খোঁজ নেওয়া হবে কোনোদিন। শুধু মরে গিয়ে পঁচে গেলেই সমাজের নাকে গন্ধ যায়, বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মা-বাবাদের অন্তর যে অনেক আগেই পুড়ে গেছে সেই গন্ধ সমাজ কেন পায় না সেটাই আশ্চর্যের।  

মানুষ মানবতা নিয়ে অন্য প্রাণীর সাথে নিজের পার্থক্য খোঁজে। অন্য প্রাণীও সম্ভবত আজকাল মানুষের মানবতা নিয়ে উপহাস করে। আজকাল আধুনিক সমাজে আমরা যতটা এগিয়েছি সাথে সাথে আমাদের মনের প্রসন্ন দরজাগুলো মনে হয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় আপনি বা আমি বিপদে থাকলে বাকি সবাই থাকবে কনটেন্ট তৈরির কাজে ব্যস্ত! তাদের দরকার ভিউ হয় এরকম কনটেন্ট! অতএব যাই হোক কারও কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা থাকে না বললেই চলে। এই সমাজের মানুষগুলো এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে শিখে গেছে। রাস্তার পাশে কারও বিপদ দেখাটাও এক ধরনের বিনোদন! ফ্ল্যাটে অর্ধগলিত লাশ পাওয়ার ঘটনা নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে অথচ এই বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে সামর্থ্যবান সন্তানদের পিতামাতা থাকছে সেটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। আমরা কিন্তু এই বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতে শুরু করেছি। দেশে এতিমখানার মতো বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠছে, সেখানে বয়স্ক মানুষ এসে থাকছে! হিসাবটা এরকম যে পরিবারের দায়িত্ব শেষে আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হবে। এটা যখন ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে যাবে তখন পরিবারে আর কোনো বয়স্ক মানুষ থাকবে না। আর থাকলেও তার খোঁজ কেউ রাখবে না। অন্তত এত কাজ কর্ম পেরিয়ে সাহেব-বাবু সন্তানরা মা-বাবার খবর প্রতিদিন নেওয়ার মতো নির্বুদ্ধিতা নিশ্চয়ই করবে না! তখন মারা যাওয়ার কয়েকদিন পর পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করবে, শেষ কাজ করবে! বাংলাদেশে এরকম প্রায়ই শোনা যাবে হয়তো! আশা করছি না আশঙ্কা করছি!   আমরা যখন শিশু ছিলাম তখন তো তারা আমাদের শিশু নিবাসে রেখে আসেনি। তারা তো আমাদের বোঝা মনে করে না। কিন্তু আমরা সেই কাজটি করি। 

আমাদের দেশে আজ অনেক বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে। জনপ্রিয় গায়ক নচিকেতার কন্ঠের সেই ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার, মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার শিরোনামে যে গানটি আমাদের মনে দাগ কেটে যায় তা তো এই হতভাগ্য প্রবীণদের উদ্দেশ্যেই লেখা। যারা তাদের সারাটি জীবন নিজে না খেয়ে সন্তানকে খাইয়ে বড় করেছেন, অফিসার করে গাড়ি বাড়ি চড়ার উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছেন তাদেরই শেষ জীবনের ঠিকানা হয় এই বৃদ্ধাশ্রমে। প্রতি বছর অনেক সন্তান তাদেও বৃদ্ধ মা বাবার প্রতি বছরে একবার দুবার পোষাক বা খাবার পাঠিয়ে অথবা একবার দেখা করেই দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফেরে। ধিক এসব সন্তানকে। জানি না শেষ জীবনে এদের ভাগ্যে কি ঘটবে। এরা তো এটাও জানে না যে মা বাবাকে বৃদ্ধ বয়সে বোঝা মনে করে এই একাকী জীবনে ফেলে দিয়ে গেছে সেই মা বাবাই দিন রাত ঐ বদ্ধ ঘরে বসে সেই সন্তানের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছে যেন তার সন্তান শেষ জীবনে এই পরিণতি বরণ না করে। আমাদের আজকের এই পরিণতি কেন হচ্ছে? এটা ভেবে দেখেছে কেউ? একসময় আমাদের দেশেই একান্নবর্তী পরিবার ছিল। সেই পরিবারগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। এখন মূলত কোনো স্ট্রং পরিবারই থাকছে না। একজনকে ছেড়ে অন্যজনকে নারী-পুরুষ বিয়ে করছে। ফলে সন্তান হয়ে যাচ্ছে একা। এক সময় সেই একাকীত্ব নিয়ে বড়ো হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের প্রতি ভালোবাসা, মায়া, মমতা ও স্নেহ কোনোটাই পাচ্ছে না। শুধু রোবোটিক জীবনের মতো তাকে পড়ালেখা গেলানো হচ্ছে। তো এই ধরনের শিশুর ভিতর মানবিকতা জন্ম নিবে কিভাবে? সে জানেই না মা বাবার ভালোবাসা কাকে বলে? সে জানেই না দায়িত্ববোধ কেমন হয়। কারণ তার প্রতি তো কেউ দায়িত্ববোধ দেখায়নি। শুধু কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করলে সন্তানকে উন্নত স্কুলে পড়ানো যায়, কোচিংয়ে পড়ানো যায়, ভালো চাকরি দেওয়া যায় কিন্তু বুকের ভিতর মমত্ববোধ জাগ্রত করতে হলে পরিবার থেকে তা করতে হয়। না হলে এরকম পঁচা লাশ আরও অনেক পাওয়া যাবে, অতোটা শোরগোল হবে না! কারণ মানুষ কোনো ঘটনা নিয়ে সবসময় শোরগোল করে না। 

মানুষই কখনো কখনো ঈশ্বর হয়ে ওঠেন। আর মানুষই শয়তান। এটা নির্ভর করছে মানুষ প্রকৃতপক্ষে নিজেকে কোথায় নিতে চায় তার উপর। কোনো কোনো ঘটনা আমাদের ঐক্য জাগ্রত করে। মনুষ্যত্ব অর্জিত হলেই মানব জন্ম স্বার্থক হবে। নচেৎ সবটাই বৃথা। মানব জন্ম তখন অনাহূত। এই যে চারিদিকে এত হানাহানি, মারামারি, বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে মানুষের দেহ- সেসবও করছে এই মানুষ। তবে ভিতরের মানুষ করছে কি না সে প্রশ্ন করা যেতেই পারে। কারও কারও জীবনের পুরোটা সময়েই নিজের ভিতরের সত্যিকারের মানুষের খোঁজ পায় না। ধরতেও যায় না। মানব সভ্যতার পিছনে ফেরার সুযোগ নেই। থাকলে অনেক কিছু পেতেই মানুষ পিছনে ফিরে যেতো। এমনকি হারানো মানবতা, মনুষ্যত্ব ফিরে পেতেও! আমাদের বিবেকের জাগ্রত দ্বারে কাউকে ঠাঁই দিতে শিখিনি। এক কুণ্ঠিত বোধ নিয়ে কেবল মনুষ্যত্ব ভঙ্গের অপেক্ষা করে চলেছি। অথচ আমাদেরই সবকিছু করার কথা ছিল। পৃথিবীতে সুন্দর করার কথা ছিল। সেসব না করে মানুষ এখন মানুষের ক্ষতি করছে। যদিও এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে। মানুষই ছুটে যায় মানুষের বিপদে,মানুষই প্রেমিক আবার মানুষই ঘৃণা ছড়ায়। অক্সিজেনের প্রতিটি কণা যেভাবে মানুষের হৃদয়ে গ্রথিত হয় প্রতিনিয়ত সেভাবে যদি ভালোবাসা গ্রথিত হতো তাহলে পৃথিবী অনেক বেশি সুন্দর হতো। ভালোবাসা নেই, মানবতা নেই শুধু খাঁচা নিয়ে মানুষ বেঁচে আছে। সেই গন্ধ মানুষ পায় না, মানুষের ঘ্রাণ শক্তিও প্রখর নয়! বিখ্যাত গায়ক নচিকেতার একটি গান মনে পড়ছে। ভিড় করে ইমারত, আকাশটা ঢেকে দিয়ে,  চুরি করে নিয়ে যায় বিকেলের সোনারোদ। গানের লাইনের মতোই বলতে হয়, আমাদের শিশুদের সোনারোদ চুরি হয়ে গেছে, তাই রুটি চুরির অপরাধেও এমন কঠিন নির্যাতন সহ্য করতে হয় এই সমাজের মানুষের কাছে!

লেখক : শিক্ষক  ও কলামিস্ট, পাবনা।

ডেল্টা টাইমস/অলোক আচার্য/সিআর/এমই    








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ