অন্যের আচরণের অভিঘাতে ভেঙে পড়া মানুষগুলোর কথাও হোক

রেহানা ফেরদৌসী:

মতামত

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে নার্সিসিস্টিক আচরণের পাশে থাকা মানুষটির মানসিক স্বাস্থ্যের কথাও জরুরি॥ একজন মানসিক রোগীর কষ্ট দৃশ্যমান;

2026-10-11T10:45:24+06:00
2026-10-11T10:45:24+06:00
রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

অন্যের আচরণের অভিঘাতে ভেঙে পড়া মানুষগুলোর কথাও হোক
রেহানা ফেরদৌসী:
প্রকাশ: রোববার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৫ এএম   (ভিজিট : ৮)

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে নার্সিসিস্টিক আচরণের পাশে থাকা মানুষটির মানসিক স্বাস্থ্যের কথাও জরুরি॥ একজন মানসিক রোগীর কষ্ট দৃশ্যমান; কিন্তু তার পাশে থাকা মানুষগুলোর নীরব মানসিক ক্ষয়—তার খবর কে রাখে? “তোমার কষ্টটা অদৃশ্য, কিন্তু অবাস্তব নয়।”

আজ ১০ অক্টোবর, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এই দিনটিতে আমরা বিষণ্নতা, উদ্বেগ, একাকীত্ব ও মানসিক চাপ নিয়ে কথা বলি। প্রয়োজনও আছে। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা এখনও অনেকটাই আড়ালে—কোনো মানসিকভাবে ক্ষতিকর আচরণের মধ্যে দীর্ঘদিন বসবাস করতে করতে যে মানুষটি নিজেই মানসিক চাপে ভেঙে পড়ছেন, তার কথাও কি আমরা যথেষ্ট বলছি? আমরা সাধারণত মানসিক সমস্যায় থাকা মানুষটির দিকে তাকাই। কিন্তু তার আচরণের অভিঘাত যারা প্রতিদিন বহন করছেন, তাদের মানসিক অবস্থার খবর কতটা রাখি? বিশেষ করে এমন মানুষের পাশে থাকা ব্যক্তির কথা, যার আচরণে অতিরিক্ত আত্মকেন্দ্রিকতা, ক্রমাগত দোষারোপ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, নিয়ন্ত্রণ, অপমান কিংবা অন্যের অনুভূতিকে অস্বীকার করার প্রবণতা রয়েছে—সেই মানুষটির দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

এখানে নারী-পুরুষের কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় নেই। নার্সিসিস্টিক আচরণ নারী বা পুরুষ—যে কারও মধ্যেই থাকতে পারে। আর তার অভিঘাতও পড়তে পারে যে কোনো ঘনিষ্ঠ মানুষের ওপর—জীবনসঙ্গী, পরিবারের সদস্য, বন্ধু কিংবা অন্য কোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মানুষ। অর্থাৎ বিষয়টি কোনো একটি লিঙ্গ বা একটি নির্দিষ্ট সম্পর্কের নয়। বিষয়টি হলো—একজন মানুষের আচরণ কীভাবে তার আশপাশের আরেকজন মানুষের মানসিক নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও স্বাভাবিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। 

আঘাত সবসময় দৃশ্যমান হয় না,মানসিক নির্যাতন সবসময় উচ্চস্বরে শুরু হয় না। কখনো তা আসে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে, কখনো তুচ্ছ মন্তব্যে, কখনো তুলনা করে, কখনো এমনভাবে দোষ চাপিয়ে যে শেষ পর্যন্ত মানুষটি নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে যান।

“তোমার জন্যই সব সমস্যা।”
“তুমি কিছুই ঠিকমতো করতে পারো না।”
“তোমার কোনো যোগ্যতা নেই।”
“আমি তো এমন বলিনি—তুমি ভুল মনে করছ।”

একটি-দুটি কথা হয়তো সামলে নেওয়া যায়। কিন্তু একই ধরনের আচরণ দিনের পর দিন, বছরের পর বছর চলতে থাকলে তার অভিঘাত গভীর হতে পারে। মানুষটি নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ করতে পারেন, নিজের অর্জনকে ছোট করে দেখতে পারেন, এমনকি অন্যায় আচরণের পরও ভাবতে পারেন—“হয়তো সত্যিই আমারই ভুল।” এভাবেই ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ক্ষয়ে যেতে পারে। নিজের অনুভূতি, স্মৃতি ও বিচারবোধ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এ ধরনের আচরণের একটি পরিচিত রূপ হলো গ্যাসলাইটিং—যেখানে একজনের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি বা অনুভূতিকেই বারবার অস্বীকার করা হয়। তখন ক্ষত শুধু কথার মধ্যে থাকে না; তা মানুষের নিজের ওপর আস্থাতেও গিয়ে পৌঁছায়।

বাইরে এক রূপ, ভেতরে আরেক…এই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে জটিল দিকগুলোর একটি হলো সামাজিক অদৃশ্যতা। যে মানুষটি বাইরে অত্যন্ত মেধাবী,নম্র-ভদ্র, দায়িত্বশীল,ক্ষমতাবান বা সামাজিক ভাবে সম্মানিত কিংবা কথায় আকর্ষণীয়,বন্ধুসুলভ,পরোপকারি তাকে ঘনিষ্ঠ পরিসরে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখা যেতে পারে।
ফলে ভেতরের মানুষটি যখন নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন, তখন অনেক সময় তাকেই শুনতে হয়—

“ও তো এমন মানুষ নয়!”

এই অবিশ্বাস সমস্যাটিকে আরও গভীর করে। কারণ তখন তাকে শুধু আচরণের অভিঘাতই বহন করতে হয় না; নিজের কষ্ট যে সত্যি, সেটিও যেন প্রমাণ করতে হয়। অথচ একটি মানুষ হাসছেন, কাজ করছেন, সামাজিকতা বজায় রাখছেন—এতে প্রমাণ হয় না যে তিনি ভেতর থেকেও ভালো আছেন।

তাহলে প্রশ্নটা কী হওয়া উচিত? বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে তাই প্রশ্নটি শুধু হওয়া উচিত নয়— “আপনি এতদিন কীভাবে সহ্য করলেন?” প্রশ্ন হওয়া উচিত— “আপনি এখন কীভাবে ভালো থাকবেন?”

প্রথম প্রয়োজন নিজের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার না করা। দীর্ঘদিনের অপমান, অবমূল্যায়ন, ভয়, অস্থিরতা কিংবা মানসিক চাপ যদি ঘুম, আত্মবিশ্বাস, কাজ বা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, তবে সেটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। মানসিক কষ্টের দৃশ্যমান ক্ষত না থাকলেও তার বাস্তবতা কমে যায় না। এরপর প্রয়োজন একটি নিরাপদ পরিসর। এমন একজন বিশ্বস্ত মানুষ, যার কাছে নিজের কথা বলতে গিয়ে প্রতিটি ঘটনার পক্ষে প্রমাণ হাজির করতে হবে না। তিনি বন্ধু হতে পারেন, পরিবারের কেউ হতে পারেন কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হতে পারেন। প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়াও দুর্বলতার লক্ষণ নয়। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, আত্মবিশ্বাসের পতন কিংবা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে পেশাদার সহায়তা পরিস্থিতিকে বুঝতে এবং সামলানোর পথ খুঁজে নিতে সহায়তা করতে পারে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি হলো—অন্য একজনের আচরণের দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার নয়। কারও রাগ, অপমান, অবমূল্যায়ন কিংবা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণকে নিজের ব্যর্থতার ফল হিসেবে সারাজীবন বহন করার প্রয়োজন নেই। নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করাও মানসিক সুস্থতার অংশ। কোন ধরনের ভাষা গ্রহণ করবেন না, কখন কোনো বিতর্ক থেকে সরে আসবেন, কোন পরিস্থিতিতে কথোপকথন থামাবেন কিংবা কখন নিজেকে মানসিকভাবে দূরে রাখবেন—এসব সিদ্ধান্ত আত্মরক্ষার অংশ হতে পারে।

তবে প্রত্যেক মানুষের বাস্তবতা আলাদা। পরিবার, সন্তান, আর্থিক নির্ভরতা, সামাজিক চাপ বা নিরাপত্তার বিষয় জড়িত থাকলে হঠাৎ সিদ্ধান্তের বদলে পরিস্থিতি বুঝে পরিকল্পনা করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া জরুরি। ভালো থাকার পথ সবার জন্য এক নয়। কিন্তু নিজের মানসিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া সবার অধিকার।দীর্ঘদিনের অবমূল্যায়ন মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে সে ধীরে ধীরে ভুলে যায়—সে আসলে কে। তার পছন্দ, দক্ষতা, স্বপ্ন, বন্ধুত্ব, সৃজনশীলতা কিংবা নিজের জন্য নির্ধারিত সময়—সবকিছুই যেন অন্যের কণ্ঠের নিচে চাপা পড়ে যায়। তাই নিজের কাজ, দক্ষতা, সম্পর্ক, সৃজনশীলতা, বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত পরিসরকে আবার গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ একজন মানুষ কোনো সম্পর্কের পরিচয়ের মধ্যেই সম্পূর্ণ সীমাবদ্ধ নন। তার একটি স্বতন্ত্র সত্তা আছে। সেই সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখাও মানসিক সুস্থতার অংশ।

পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব—উপদেশ নয়, সহমর্মিতা নিয়ে পাশে থাকা। কেউ যখন দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের কথা বলেন, তখন তাকে সঙ্গে সঙ্গে বলা উচিত নয়—
“সব সম্পর্কেই এসব হয়।”

“আরও একটু মানিয়ে নাও।”
“ও তো বাইরে খুব ভালো মানুষ।”

বরং প্রথমে তাকে শুনতে হবে। তার হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়, তার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া, বিচার না করে পাশে থাকা এবং প্রয়োজন হলে সাহায্যের পথ খুঁজে দিতে এগিয়ে আসাই বেশি জরুরি। কখনো সমাধানের চেয়েও একজন নির্ভরযোগ্য শ্রোতা মানুষের জন্য বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠেন। তাই প্রশ্ন হতে পারে—“তোমার কী ধরনের সাহায্য দরকার?”

এই একটি প্রশ্নও কাউকে অনুভব করাতে পারে—তার কষ্ট একেবারে একা বহন করার নয়। মানসিক স্বাস্থ্য শুধু অসুস্থ মানুষের বিষয় নয়, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেওয়ার একটি সুযোগ—মানসিক স্বাস্থ্যের আলোচনা শুধু মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষকে ঘিরে হওয়া উচিত নয়।তাদের পাশে থাকা মানুষটির মানসিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।

যে মানুষটি প্রতিদিন অন্যের আচরণের অভিঘাত সামলে নিজের দায়িত্ব পালন করছেন, হাসছেন, কাজ করছেন, পরিবার সামলাচ্ছেন কিংবা সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন—তার ক্লান্তি, ভয়, আত্মসন্দেহ ও ভেতরের ক্ষতও যত্ন পাওয়ার যোগ্য। তাই তাকে শুধু বলা নয়—“আরও একটু সহ্য করুন।”বরং বলা দরকার— আপনার কষ্টকে ছোট করে দেখার প্রয়োজন নেই। সবসময় শক্ত থাকার অভিনয় করতে হবে না। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়। নিজেকে রক্ষা করা স্বার্থপরতা নয়। আপনার মানসিক শান্তিও গুরুত্বপূর্ণ।

হয়তো সুস্থ হয়ে ওঠার প্রথম পদক্ষেপটি খুব ছোট— নিজের কাছে সত্যি করে বলা, “আমি ভালো নেই। এবং ভালো থাকার অধিকার আমারও আছে।” সেখান থেকেই শুরু হতে পারে নিজের কাছে ফিরে আসার পথ। কারণ সম্পর্কের মূল্য শুধু একসঙ্গে থাকার মধ্যে নয়; সেই সম্পর্কের ভেতরে মানুষ দুজনেরই মর্যাদা, স্বাতন্ত্র্য ও মানসিক নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ থাকায়।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে তাই শুধু মানসিক অসুস্থতার কথা নয়—মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন সম্পর্কের পাশে থাকা মানুষগুলোর কথাও হোক। তাদের কষ্ট দেখা হোক, তাদের কথা শোনা হোক, তাদের সুস্থ থাকার অধিকারটুকুও স্বীকার করা হোক। সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেক মানুষকে এমন সম্পর্কের আশ্রয় দিন, যেখানে ভালোবাসার সঙ্গে সম্মান, কাছাকাছি থাকার সঙ্গে নিরাপত্তা এবং সম্পর্কের সঙ্গে মানসিক প্রশান্তিও থাকে।


লেখক: সহ সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।

ডেল্টা টাইমস/রেহানা ফেরদৌসী/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ