প্রতিটি মানুষের জীবনে অন্তত একজন শিক্ষক থাকেন যার একটি কথা, একটি প্রশংসা কিংবা একটি বাক্য সারা জীবন মনে থেকে যায়। কারও মনে পড়ে প্রথম বর্ণ চেনানো হাতটি। কারও মনে পড়ে গল্পেগল্পে কঠিন বিষয় বুঝিয়ে দেওয়া শিক্ষকের মোহময়ী ব্যক্তিত্ব। ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস সেই ভাবনার সুযোগ তৈরি করে দেয়। এ বছর দিনটি পড়েছে সোমবার। এবারের দিবসটির তাৎপর্য অন্যবারের চেয়ে একটু আলাদা। কারণ এটি এক ঐতিহাসিক দলিলের ষাট বছর পূর্তির বছর।
একজন শিক্ষকের কাজ ঘণ্টার হিসাবে মাপা যায় না। ক্লাসের চল্লিশ মিনিটের আগে থাকে পাঠ প্রস্তুতির সময়। পরে থাকে খাতা দেখা আর শিক্ষার্থীর পিছিয়ে পড়ার কারণ খোঁজার চেষ্টা। কোন শিক্ষার্থী সকালে না খেয়ে এসেছে, কার ঘরে অশান্তি, কে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে, এসব নজরে রাখাও তাঁর অলিখিত দায়িত্ব। এই অদৃশ্য শ্রমের সিংহভাগই কোনো নথিতে ওঠে না। কোনো বেতন-কাঠামোতেও এর হিসাব হয় না। বিশ্ব শিক্ষক দিবস তাই মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষকতা কেবল পাঠ্যবই শেষ করার কাজ নয়। এটি মানুষ গড়ার কাজ।
১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর আইএলও/ইউনেসকো একটি সুপারিশ গ্রহণ করে। সেখানে শিক্ষকদের অধিকার ও দায়িত্ব, প্রাথমিক প্রস্তুতি ও পরবর্তী শিক্ষা, নিয়োগ এবং চাকরির শর্তের মানদণ্ড ঠিক করা হয়েছিল। পাঠদান ও শিখনের পরিবেশ নিয়েও মানদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সেই সুপারিশের স্মরণে ইউনেসকো ১৯৯৪ সালে ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে চালু করে। এ বছর সুপারিশটির ৬০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ইউনেসকো জানিয়েছে, ২০২৬ সালের আয়োজন শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা বা অবস্থানকে ঘিরে। সেই ভাবনাই ধরা পড়েছে এবারের প্রতিপাদ্যে: "শিক্ষকদের পাশে: পেশা সুরক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ গড়ার ৬০ বছর"।
প্রতিপাদ্যের তিনটি অংশ আলাদা করে ভাবার মতো। প্রথমটি সুরক্ষা। চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন, সহনীয় কাজের চাপ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ ছাড়া কোনো পেশা টেকে না। দ্বিতীয়টি মর্যাদা বৃদ্ধি। এটি কেবল সামাজিক সম্মানের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পেশাগত স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং নীতিনির্ধারণে শিক্ষকের কণ্ঠস্বর। তৃতীয়টি ভবিষ্যৎ গড়া। ষাট বছর আগে যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তা পূরণ হলো কি না, তার হিসাব মেলানো দরকার। পাশাপাশি আগামী দিনের শ্রেণিকক্ষ কেমন হবে, সেই প্রশ্নও এখানে তোলা হয়েছে।
ইউনেসকো মনে করিয়ে দিচ্ছে, শিক্ষকের অবস্থান বেতন, কাজের চাপ ও কর্মপরিবেশের ওপর নির্ভর করে। আজকের শিক্ষকেরা নতুন সব চ্যালেঞ্জের মুখে। এর মধ্যে আছে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি কঠিন বাস্তবতা। বিশ্বজুড়ে শিক্ষকের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। যে পেশায় লোক কম, কাজের চাপ বেশি আর পারিশ্রমিক নিয়ে অসন্তোষ আছে, সেখানে নতুন প্রজন্মকে টেনে আনা কঠিন। অর্থাৎ শিক্ষকের মর্যাদার প্রশ্নটি শুধু বর্তমান শিক্ষকদের স্বার্থের বিষয় নয়। ভবিষ্যতে কারা শিক্ষক হবেন, এটি তারও প্রশ্ন। এবারের মূল অনুষ্ঠান হবে প্যারিসে ইউনেসকোর সদর দপ্তরে। সেখানে শিক্ষক, মন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা একত্র হবেন। একই অনুষ্ঠানে শিক্ষক উন্নয়নে ইউনেসকো-হামদান পুরস্কারের নবম আসরের পুরস্কারও দেওয়া হবে।
সুরক্ষা ও মর্যাদার আলোচনায় আরেকটি বিষয় বারবার ফিরে আসে। সেটি শিক্ষকের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা। ইউনেসকোর বার্তায় ভালো বেতন ও কর্মপরিবেশের পাশাপাশি শিক্ষকের স্বায়ত্তশাসনের কথাও উঠে এসেছে। শিক্ষানীতি প্রণয়নে তাঁর মতামতের কথাও বলা হয়েছে। যে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিন শিক্ষার্থীর মুখোমুখি হন, তিনি জানেন কোন পদ্ধতি কাজ করে। তিনি এও জানেন, কোনটি কাগজে সুন্দর হলেও বাস্তবে অচল। নিয়ম বা নির্দেশনা উপর থেকে চাপিয়ে দিলে সেই জ্ঞান অব্যবহৃত থেকে যায়। বিপরীতে শিক্ষককে আস্থায় নিলে নীতি আরও বাস্তবসম্মত হয়। তখন শিক্ষকও নিজেকে ব্যবস্থার অংশ বলে ভাবতে পারেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রতিপাদ্য যেন আমাদেরই কথা বলছে। আমাদের অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক কম। একেকটি শ্রেণিকক্ষে ভিড় বেশি। পাঠদানের পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ, প্রতিবেদন তৈরি আর নানা সরকারি দায়িত্বও শিক্ষকের কাঁধে এসে পড়ে। এর ওপর আছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা আর কোচিং-সংস্কৃতির চাপ। সেখানে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাকে অনেক সময় গৌণ করে ফেলা হয়। বিভিন্ন সময়ে বেতন-ভাতা, পদোন্নতি, চাকরির স্থায়িত্ব ও পদমর্যাদার দাবিতে শিক্ষকদের রাস্তায় নামতে দেখা গেছে। প্রতিবারই প্রশ্ন উঠেছে, যাঁদের হাতে আগামী প্রজন্ম গড়ার দায়িত্ব, তাঁদের প্রতি আমাদের আচরণ কতটা ন্যায্য। ষাট বছরের পুরোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আজও আমাদের সামনে সেই প্রশ্নটিই রাখছে।
শহর ও গ্রামের শিক্ষকের বাস্তবতাও এক নয়। রাজধানীর নামী বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা-উপকরণ ও প্রযুক্তির যে সুবিধা পান, প্রত্যন্ত চর, হাওর কিংবা পাহাড়ি এলাকার শিক্ষক অনেক সময় তার কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেন না। অথচ সেখানকার শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকই হয়তো জ্ঞানের একমাত্র জানালা। ষাট বছর পূর্তির এই বছরে তাই সবচেয়ে বঞ্চিত এলাকার শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্নটি আলাদা গুরুত্ব দাবি করে।
মর্যাদার আলোচনায় একটি অস্বস্তিকর সত্য এড়ানো যায় না। শিক্ষককে আমরা বক্তৃতায় "জাতির মেরুদণ্ড" বলি। কিন্তু সেই মেরুদণ্ড সোজা রাখতে যে বিনিয়োগ লাগে, বাজেটে ও নীতিতে তার প্রতিফলন কতটুকু? শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ কতটা সহজলভ্য, বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষকের জন্য? পাঠ্যক্রম বা মূল্যায়নের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যাঁরা প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ান, তাঁদের মতামত কতটা শোনা হয়? মর্যাদা শুধু মুখের কথায় আসে না। আসে নীতিতে, বরাদ্দে আর দৈনন্দিন আচরণে। শিক্ষকের প্রতি অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সমাজের আচরণও এর অংশ। শিক্ষককে প্রতিপক্ষ ভাবার প্রবণতা কিংবা তাঁর সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে। আর তার খেসারত শেষ পর্যন্ত দিতে হয় শিক্ষার্থীকেই।
শিক্ষকের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার প্রশ্নটিও এই আলোচনার বাইরে থাকা উচিত নয়। দিনের পর দিন ভিড়ের শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষার চাপ আর অভিভাবকের প্রত্যাশা সামলাতে হয়। এতে অনেক শিক্ষক ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ক্লান্ত শিক্ষকের কাছ থেকে অনুপ্রেরণাদায়ী পাঠ আশা করা কঠিন। তাই কাজের চাপ কমানো ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ নিশ্চিত করাও শিক্ষার মান বাড়ানোর অংশ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শিক্ষার্থীরা আজ যেকোনো প্রশ্নের উত্তর পেতে মুহূর্তের মধ্যে যন্ত্রের কাছে যেতে পারে। কেউ কেউ ভাবছেন, শিক্ষকের ভূমিকা কি তাহলে কমে যাচ্ছে? বাস্তবতা বরং উল্টো। তথ্য এখন সহজলভ্য। কিন্তু বিচারবুদ্ধি, কৌতূহল, নৈতিকতা আর সহমর্মিতা শেখানোর কাজটি যন্ত্র একা করতে পারে না। কোন তথ্য ভরসাযোগ্য আর কোনটি বিভ্রান্তিকর, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, এসব শেখার জন্য শিক্ষার্থীর এখন আগের চেয়েও বেশি দরকার একজন বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক। তবে নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগাতে হলে শিক্ষকেরও চাই প্রশিক্ষণ, সময় ও সহায়তা। শিক্ষককে প্রযুক্তির বিপরীতে দাঁড় না করিয়ে প্রযুক্তি ব্যবহারে তাঁকে সক্ষম করে তোলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
ষাট বছর আগে বিশ্ব একটি কাগজে লিখে রেখেছিল, শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়। এটি এমন এক পেশা, যার সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সমাজের দায়িত্ব। আজ সেই কাগজের বয়স ষাট। কিন্তু প্রশ্নগুলো পুরোনো হয়নি। ৫ অক্টোবর তাই শুধু অতীতের কোনো শিক্ষককে স্মরণ করার দিন নয়। এটি আত্মজিজ্ঞাসারও দিন। আমরা শিক্ষকের পাশে কতটা দাঁড়াচ্ছি? সেই প্রশ্নের সৎ উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে আগামী প্রজন্মের শ্রেণিকক্ষ কেমন হবে।
লেখক : সহকারী তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর। পিআইডি ফিচার
ডেল্টা টাইমস/মো. খালিদ হাসান/সিআর/এমই