দশ বছরেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ওয়াশিংটনের কাছে বিমান ঘাঁটিতে তার বিমান অবতরণের পর বিমানবন্দরে নিজে উপস্থিত থেকে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাধারণত হোয়াইট হাউসে অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের স্বাগত জানানো হলেও, ট্রাম্পের এই রাজকীয় অভ্যর্থনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।এই সফরে দুই নেতার একান্ত বৈঠক ছাড়াও হোয়াইট হাউসে সামরিক সংবর্ধনা, সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ প্রযুক্তি ব্যক্তিত্বদের নিয়ে একটি রাজকীয় ভোজসভা এবং ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শনের কথা রয়েছে। গত মে মাসে বেইজিংয়ে ট্রাম্পের সফরের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সে সময় ট্রাম্পকে অভ্যর্থনা জানাতে শি জিনপিং বিমানবন্দরে তো যানইনি, এমনকি কোনো চুক্তি বা যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই সেবার চীন ছাড়তে হয়েছিল ট্রাম্পকে। বর্তমান পরিস্থিতিও ট্রাম্পের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের জেরে দেশের ভেতরে জনগণের অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। সামনেই মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন। এমন সময়ে চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মনে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে কিছু ইতিবাচক কূটনৈতিক চিত্র দেখাতে চান ট্রাম্প। অন্যদিকে, কিছু অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ থাকলেও বেশ শক্ত অবস্থানে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সফরে এসেছেন শি জিনপিং। ওয়াশিংটনের থিংক ট্যাংক ‘স্টিমসন সেন্টার’-এর বিশেষজ্ঞ সান ইউন জানান, গত এক দশকে চীন শুধু অর্থনৈতিকভাবেই শক্তিশালী হয়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সক্ষমতা ও ইচ্ছাও তারা অর্জন করেছে।এর প্রমাণ মিলেছে গত বছর, যখন যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শুল্ক চাপালে চীনও পালটা কঠোর পদক্ষেপ নেয়। বিশেষ করে প্রযুক্তি ও যুদ্ধবিমান তৈরির গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্যের মুখে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই বৈঠকে তাইওয়ানের ওপর নিজেদের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারেন শি জিনপিং, যা ওয়াশিংটন সাধারণত এড়িয়ে চলতে চায়।
অন্যদিকে, চীনের আপত্তি সত্ত্বেও মার্কিন প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারেন ট্রাম্প। স্বস্তির খবর হলো, আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বাড়াতে রাজি হয়েছে চীন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় সফরের সময় দুই দেশ আটটি সুনির্দিষ্ট ফলাফল ও সমঝোতায় পৌঁছেছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রেখে গঠনমূলক চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে তারা একমত হয়েছেন। আলোচনার ফলাফলের মধ্যে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য বিষয়ক প্রতিনিধিদের আলোচনাকে অনুমোদন এবং পারস্পরিকভাবে ৩০ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক হ্রাসের সমঝোতা রয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও গড়ে তোলার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে চলমান শুল্ক সংঘাতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক হ্রাসের সমঝোতা এবং বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের আলোচনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চীন তার দেশে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিসহ বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শাখা খোলার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি ও সম্ভাবনা নিয়ে নিয়মিত সংলাপ এবং দ্রুত যোগাযোগের জন্য পৃথক চ্যানেল চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ট্রাম্প এই প্রযুক্তিকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ নামকরণের প্রস্তাব করেন।বিরল খনিজ ও কাঁচামালের সরবরাহ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সরাসরি বিমান চলাচল বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্বাধীনতার বিরোধিতার কথা পুনর্ব্যক্ত করলেও যুক্তরাষ্ট্র সুনির্দিষ্ট কোনো নতুন অবস্থান জানায়নি। এছাড়া উন্নত প্রযুক্তি ও বিরল খনিজের সরবরাহ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি বা সমঝোতা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, দৃশ্যত বড় কোনো রূপান্তর বা কৌশলগত ছাড় না মিললেও দুই নেতা নভেম্বর মাসে চীন এবং ডিসেম্বরে ফ্লোরিডায় জি২০ সম্মেলনে আবারও বৈঠকে বসার ঘোষণা দিয়েছেন।এবারের বৈঠকে নির্দিষ্ট খাতের শুল্ক কমানো, মাদক পাচার রোধ এবং সামরিক আলোচনা বাড়ানোর বিষয়ে চুক্তি হতে পারে। পাশাপাশি, চীন ও অন্যান্য দেশে আটক মার্কিন নাগরিকদের মুক্তির বিষয়টি তুলতে পারেন ট্রাম্প। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চললেও এই বিষয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখতে পারে উভয় পক্ষ। সব মিলিয়ে, গভীর মতপার্থক্য সত্ত্বেও বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতি একে অপরের মুখোমুখি হয়ে স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়ারই চেষ্টা করছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দেশের নেতা হিসেবে তাঁদের বৈঠকের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত পড়বে। তবে ট্রাম্প যদি মনে করেন, চীনের পররাষ্ট্রনীতি মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়, তাহলে তিনি ভুল করবেন। শি জিনপিং একই সঙ্গে কঠোর শাসক ও আদর্শবাদী নেতা। তাঁর পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি শি জিনপিং চিন্তাধারা। এর কেন্দ্রে রয়েছে তাঁর নিজের নেতৃত্ব ও কমিউনিস্ট পার্টির শাসন টিকিয়ে রাখা। এরপরই রয়েছে বিশ্বে চীনের মর্যাদা ও প্রভাব বাড়ানো। ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের বিরুদ্ধে চীনের কঠোর অবস্থানও এই অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে চীনের নতিস্বীকার করা কঠিন। শি জিনপিংয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো তাঁর কথিত ‘জাতীয় পুনর্জাগরণের চীনা স্বপ্ন’ ২০৫০ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করা। এ লক্ষ্য অর্জনে চীন দুটি বড় পথে এগোচ্ছে। আর তা হচ্ছে-বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর কাছ থেকে চীনের পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে ব্যাপক সমর্থন আদায় করা। এবং তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে যুক্ত করা।
প্রশান্ত মহাসাগরের প্রথম দ্বীপশ্রেণিতে তাইওয়ানের কৌশলগত অবস্থান এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের কারণে তাইওয়ান দখল করতে পারলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চীনের শ্রেষ্ঠত্বের বড় প্রমাণ হবে। তবে এমন অভিযান শুরুর আগে চীনকে সফলতার বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। ২০৫০ সালের সময়সীমা থেকে বোঝা যায়, এ বিষয়ে শি জিনপিং এখনই তাড়াহুড়ো করছেন না। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে কাছে টেনে চীন তার নেতৃত্বে ‘মানবজাতির অভিন্ন নিয়তি’ গড়ে তুলতে চায়। শি জিনপিং একে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গণতন্ত্রীকরণ’ হিসেবে তুলে ধরেন। এর লক্ষ্য বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে চীনকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। শি জিনপিংয়ের দৃষ্টিতে বর্তমান উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা পশ্চিমা দেশগুলোর তৈরি ও নিয়ন্ত্রিত। জাতিসংঘের সদস্যদেশ ও বিশ্বের জনসংখ্যার তুলনায় পশ্চিমা দেশগুলো সংখ্যালঘু। বিপরীতে বৈশ্বিক দক্ষিণে অধিকাংশ দেশ ও মানুষ রয়েছে। চীন নিজেকেও এই বৈশ্বিক দক্ষিণের অংশ মনে করে। জাতিসংঘসহ বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক দক্ষিণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনা গেলে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গঠনে চীন বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। বৈশ্বিক দক্ষিণের অনেক দেশেই গণতন্ত্রের চেয়ে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন বেশি। এসব দেশের নেতাদের কাছে চীনের মডেল আকর্ষণীয় হতে পারে। কারণ, বেইজিং তাদের নিজেদের মতো করে দেশ পরিচালনার অধিকারকে সমর্থন করে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভও তাদের জন্য প্রণোদনা। এর মাধ্যমে পশ্চিমা উন্নয়ন সংস্থাগুলোর তুলনায় কম জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার শর্তে উন্নয়ন ঋণ পাওয়া যায়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক পরিচালনার জন্য বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতি শি জিনপিংয়ের আগ্রহ ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা বোঝা জরুরি।
চীনের লক্ষ্য শুধু আমেরিকান আধিপত্যের অবসান নয়; উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য গণতন্ত্রই সবচেয়ে ভালো পথ-এই ধারণাকেও দুর্বল করা। ইরান যুদ্ধ এর একটি উদাহরণ। চীন চায়নি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাক। কিন্তু সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও যুক্তরাষ্ট্র নিজের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় চীন এখন লাভবান হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি মিত্রদের বিচ্ছিন্ন করবে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করবে এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের ক্ষতি করবে, চীনের পক্ষে সমর্থন আদায় তত সহজ হবে। ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে শি জিনপিংয়ের প্রধান অগ্রাধিকার হবে বৈঠকটিকে বড় সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা। এরপর থাকবে একটি বাণিজ্যচুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে তার নিজের তৈরি সংকট থেকে বের হতে সাহায্য করা তাঁর আলোচ্যসূচিতে থাকার সম্ভাবনা কম। বরং ট্রাম্পের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা, বৈঠকের ভালো চিত্র তৈরি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত থেকে সুবিধা নেওয়াই শি জিনপিংয়ের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।
ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই