সন্ধ্যার একটু আগে বাজারে মানুষের ভিড় বাড়ে। সারাদিনের কাজ শেষে কেউ ফিরছেন এক কেজি চাল হাতে, কেউ সবজির দাম শুনে সাধ আর সাধ্যের হিসাব মেলাচ্ছেন, কেউ মাছের দাম শুনে একটু থেমে অন্যদিকে চলে যাচ্ছেন। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক মা বারবার হিসাব মিলিয়ে দেখছেন—চাল, ডাল, তেল, সবজি; তালিকায় আর কিছু যোগ করার সুযোগ আছে কি না। এই চেনা দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি পরিবারের প্রতিদিনের হিসাব—কীভাবে সামর্থ্যের মধ্যে প্রয়োজন মেটানো যায়, কীভাবে আজকের বাজারটুকু সামলে নেওয়া যায়।
এই ছোট্ট হিসাবের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার গল্প। একসময় খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রধান উদ্বেগ ছিল খাদ্যের ঘাটতি। জনসংখ্যা বাড়ছে, আবাদি জমি কমছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার আঘাত হানছে—তারপরও খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর কঠিন পথ পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ। কৃষকের শ্রম, কৃষি প্রযুক্তির বিস্তার, উন্নত জাত, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং সরকারি উদ্যোগের ফলে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে। ধানের পাশাপাশি মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাকসবজি ও ফলের উৎপাদন খাদ্যব্যবস্থাকে আরও বৈচিত্র্যময় করেছে। অর্থাৎ খাদ্যের জোগান বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ নিজস্ব কৃষি উৎপাদনের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।
কিন্তু খাদ্যের গল্প এখানেই শেষ নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হয় আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—খাদ্য আছে, কিন্তু সবার নাগালের মধ্যে আছে তো? সর্বশেষ IPC বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মে–আগস্ট ২০২৬ সময়ে বাংলাদেশে বিশ্লেষিত জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ, অর্থাৎ ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ, উচ্চমাত্রার তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে ছিল। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ে এই সংখ্যা ১ কোটি ৮১ লাখে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। পার্বত্য এলাকা, হাওর, উপকূল এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে।
পরিসংখ্যানের ভাষা কঠিন। কিন্তু তার ভেতরের গল্পগুলো পরিচিত—বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, নদীভাঙনে ঘর হারানো পরিবার, লবণাক্ততার কারণে ফলন কমে যাওয়া উপকূলের মানুষ কিংবা সীমিত আয়ের একটি পরিবার। খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে তাই সরাসরি যুক্ত মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা। বাজারে খাবার থাকলেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; মানুষ সেই খাবার কিনতে পারছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও আগের সময়ের তুলনায় কমেছে। এটি স্বস্তির একটি প্রবণতা হলেও পরিবারের খাদ্যতালিকায় পুষ্টির বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে ক্রয়ক্ষমতা ও বাজারব্যবস্থার স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ পরিবারের বাজেট সীমিত হলে ভাত থাকে, কিন্তু মাছ কমে যায়। ডাল থাকে, কিন্তু ডিম প্রতিদিন থাকে না। ফল কিংবা দুধ হয়ে ওঠে বিশেষ দিনের খাবার। অথচ পুষ্টির জন্য শুধু পেট ভরা যথেষ্ট নয়। শিশুর বেড়ে ওঠা, মেধার বিকাশ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে খাবারের গুণগত মান ও বৈচিত্র্য।
অপুষ্টি অনেক সময় ক্ষুধার মতো দৃশ্যমান হয় না। একটি শিশু হয়তো নিয়মিত স্কুলে যায়, খেলাধুলা করে, হাসে। কিন্তু প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি তার শরীর ও মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই খাদ্য নিরাপত্তার লক্ষ্য এখন শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতা নয়; পুষ্টিসম্মত খাদ্যে মানুষের প্রবেশাধিকারও। সর্বশেষ IPC পুষ্টি বিশ্লেষণে ২০২৬ সালে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৩৭ লাখ acute malnutrition-এর কেস প্রত্যাশিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে; এর মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ১১ হাজার severe acute malnutrition-এর কেস। দুর্যোগপ্রবণ ৩৭টি জেলায় এই পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকার খাদ্য নিরাপত্তাকে কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা, সরাসরি সহায়তা এবং পুষ্টির সঙ্গে যুক্ত করে কয়েকটি কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। কৃষক কার্ড তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ১৪ এপ্রিল ২০২৬ প্রি-পাইলট পর্যায়ে ১০ জেলার ১১টি ব্লকের ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের হিসাবে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হয়। এবার ১৭ সেপ্টেম্বর পাইলট পর্যায়ে ১ লাখ ১০ হাজার ৩৬৪ কৃষককে একই পরিমাণ প্রণোদনা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। ফেনীতে ৭ হাজার ৬৪৩ কৃষককে মুদ্রিত কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি অর্থবছরে কর্মসূচিটি পর্যায়ক্রমে আরও বিস্তারের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কৃষক কার্ডের লক্ষ্য শুধু একটি কার্ড হাতে দেওয়া নয়। এর মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকের তথ্যভিত্তিক পরিচয় তৈরি করে সরকারি সহায়তা, বীজ, সার, আর্থিক প্রণোদনা, ঋণ, কৃষি পরামর্শ, বাজার ও জলবায়ু-সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে কৃষককে যুক্ত করার কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ কৃষককে শুধু উৎপাদক হিসেবে নয়, কৃষি অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখার একটি নতুন ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে। কৃষকের আর্থিক চাপ কমাতেও কার্যক্রম এগিয়েছে। শস্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের কর্মসূচি বাস্তবায়নের তথ্য সরকার দিয়েছে। জুলাই পর্যন্ত ১৪ দশমিক ৩৪ লাখ কৃষক এই সুবিধা পেয়েছেন এবং এ বাবদ ব্যাংকগুলোকে ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। নতুন কৃষিঋণের সুযোগ তৈরি করে উৎপাদন অব্যাহত রাখাই এর একটি উদ্দেশ্য।
একই সঙ্গে কৃষি ও পল্লী ঋণের প্রবাহ বাড়াতে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ আয় বাড়ানোর সঙ্গে এই ঋণনীতিকে যুক্ত করা হয়েছে। কৃষির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাম্প্রতিক কৃষি পর্যালোচনায় স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো, উন্নত জাত উদ্ভাবন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে জোর দেওয়া হয়েছে। সৌরশক্তিনির্ভর সেচ সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও আলোচনায় এসেছে। একই সময়ে কৃষি উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ১০ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অক্টোবরের চাহিদার বিপরীতে বিভিন্ন জেলায় সার বরাদ্দও প্রস্তুত করা হয়েছে।
তবে খাদ্য নিরাপত্তা শুধু মাঠের ফসল নয়। বাজারে উৎপাদকের ন্যায্য মূল্য, ভোক্তার সামর্থ্য, সংরক্ষণ ও পরিবহন—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। কৃষকের উৎপাদিত খাদ্য যাতে বাজারে পৌঁছায় এবং অপচয় কমে, সে জন্য আধুনিক সংরক্ষণ, বাজার অবকাঠামো ও কৃষিপণ্যের বিপণনব্যবস্থা উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দুর্যোগের সময় সামাজিক সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি ইতোমধ্যে পাইলট পর্যায়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশব্যাপী বাস্তবায়নের প্রস্তুতিতে রয়েছে; সেপ্টেম্বর মাসে তথ্য সংগ্রহকারী ও তত্ত্বাবধায়কদের প্রশিক্ষণও শুরু হয়েছে। লক্ষ্য হলো প্রয়োজন অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে সামাজিক সহায়তার কাঠামোর সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা। বাংলাদেশের কৃষি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা কিংবা অস্বাভাবিক তাপ—এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় তাই জলবায়ু-সহনশীল জাত, ফসলের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তির ব্যবহার, সেচ ও কৃষি তথ্যসেবা আরও বিস্তৃত করতে হবে। কারণ একটি ফসলের ক্ষতি শুধু একটি মৌসুমের আয় কমায় না; অনেক সময় পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টির ওপরও তার প্রভাব পড়ে।
একজন কৃষক যদি ফসল ফলিয়ে ন্যায্য মূল্য পান, একজন মা যদি সন্তানের থালায় ডিম, মাছ, ডাল ও সবজি দিতে পারেন, একটি শিশু যদি প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিয়ে বড়ো হতে পারে, একটি দুর্যোগপীড়িত পরিবার যদি বিপদের পরও খাবারের নিশ্চয়তা হারিয়ে না ফেলে—তবেই খাদ্য নিরাপত্তা তার প্রকৃত অর্থ খুঁজে পায়। খাদ্য নিরাপত্তার সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা কোনো গুদামে নয়, কোনো প্রতিবেদনের পাতাতেও নয়। তার পরীক্ষা হয় রান্নাঘরে। হয় সেই মায়ের হাতে, যিনি সন্তানের খাবারের তালিকায় পুষ্টিকর খাবার রাখতে চান। হয় সেই কৃষকের মাঠে, যিনি দেশের খাদ্য জোগান দেন। আর সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা হয় সেই শিশুর চোখে, যে নিশ্চিন্তে মাকে জিজ্ঞেস করে—‘আজ কী খাব?’
একটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সবচেয়ে সুন্দর সাফল্য হবে সেই দিন, যেদিন সন্তানের খাবারের হিসাব কষতে গিয়ে কোনো মাকে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে না। সেদিন শুধু মানুষের পেটই ভরবে না—নিরাপদ, সুস্থ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের পথও তৈরি হবে।
লেখক: সহকারী পরিচালক, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর
ডেল্টা টাইমস/মোহাম্মদ মোকাম্মেল হোসেন/সিআর/এফএএইচ