রাতের আটলান্টিক: বিজ্ঞানের বিস্ময়, স্রষ্টার নিদর্শন

রেহানা ফেরদৌসী

মতামত

রাত, মহাসাগর, জেট স্ট্রিম ও সময়ের হিসাব—একটি ট্রান্সআটলান্টিক ফ্লাইটের নেপথ্যে যেমন আছে আধুনিক বিজ্ঞানের বিস্ময়, তেমনি আছে সেই

2026-09-24T17:39:05+06:00
2026-09-24T18:05:39+06:00
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

রাতের আটলান্টিক: বিজ্ঞানের বিস্ময়, স্রষ্টার নিদর্শন
রেহানা ফেরদৌসী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৩৯ পিএম  আপডেট: ২৪.০৯.২০২৬ ৬:০৫ পিএম  (ভিজিট : ৪৪)
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

রাত, মহাসাগর, জেট স্ট্রিম ও সময়ের হিসাব—একটি ট্রান্সআটলান্টিক ফ্লাইটের নেপথ্যে যেমন আছে আধুনিক বিজ্ঞানের বিস্ময়, তেমনি আছে সেই সৃষ্টিকর্তার ইশারা, যিনি মানুষকে প্রকৃতির নিয়ম বুঝে তাকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা দিয়েছেন।


মধ্য আটলান্টিক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫ হাজার ফুট ওপরে একটি যাত্রীবাহী বিমান ছুটে চলছে। জানালার বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিচে যতদূর চোখ যায় শুধু মহাসাগর—নেই কোনো শহরের আলো, নেই রাস্তার চিহ্ন। কেবিনের আলো মৃদু হয়ে এসেছে, শত শত যাত্রী ঘুমিয়ে পড়েছেন। অথচ সেই অন্ধকার চিরে বিমানটি নির্ভুলভাবে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।


এমন দৃশ্য দেখে প্রশ্ন জাগতেই পারে: আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার সময় এত বিমান রাতের আকাশে কেন থাকে? প্রশ্নটি রহস্যময় মনে হলেও উত্তরটি বিজ্ঞানের। আর সেই বিজ্ঞানের গভীরে গেলে আরও বড় একটি বিস্ময় সামনে আসে—মানুষ প্রকৃতিকে পরাস্ত করেনি; প্রকৃতির নিয়ম বুঝে তার সঙ্গে চলতে শিখেছে।


রাতের ফ্লাইটের হিসাব

ট্রান্সআটলান্টিক ফ্লাইট যে কেবল রাতেই চলে, তা নয়; দিনের আলোতেও নিয়মিত বিমান আটলান্টিক পাড়ি দেয়। তবে উত্তর আমেরিকা থেকে ইউরোপগামী অনেক ফ্লাইটের সময়সূচি এমনভাবে ঠিক করা হয় যে যাত্রার বড় একটি অংশ রাতে পড়ে। এর পেছনে রয়েছে সময় অঞ্চলের পার্থক্য, যাত্রীদের সুবিধা, বিমানবন্দরের সময়সূচি এবং সংযোগকারী ফ্লাইটের সমন্বয়।


পূর্বমুখী যাত্রায় ঘড়ির সময় এগিয়ে যায়। তাই সন্ধ্যায় উত্তর আমেরিকা থেকে রওনা দিয়ে যাত্রী পরদিন সকালে ইউরোপে পৌঁছাতে পারেন। যাত্রার বড় অংশ ঘুমিয়ে কাটানোর সুযোগও মেলে। অর্থাৎ রাত এখানে ভয়ের সময় নয়; এটি সময় ব্যবস্থাপনারই অংশ।


আকাশের অদৃশ্য স্রোত

এর সঙ্গে যুক্ত হয় জেট স্ট্রিম—উচ্চ বায়ুমণ্ডলের দ্রুতগতির বায়ুপ্রবাহ। NOAA-র তথ্য অনুযায়ী দীর্ঘপথের বিমান চলাচলে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিম থেকে পূর্বমুখী যাত্রায় অনুকূল জেট স্ট্রিম বিমানের গতি বাড়াতে পারে এবং সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় করতে পারে। উল্টো দিকে যাওয়ার সময় একই বায়ুপ্রবাহ প্রতিকূল হয়ে ওঠে, আর তা ফ্লাইট পরিকল্পনায় হিসাব করতে হয়।


তাই বিমান আকাশে শুধু দূরত্ব মাপে না; বাতাসকেও হিসাব করে। কোন উচ্চতায় বাতাস অনুকূল, কোথায় গতি বেশি, কোথায় আবহাওয়া তুলনামূলক ভালো—সবই ফ্লাইট পরিকল্পনার অংশ। প্রয়োজনে আবহাওয়া ও বাতাসের পরিস্থিতি অনুযায়ী রুটও বদলানো হয়।


গোলাকার পৃথিবীর পথ

পৃথিবী গোলাকার বলে দীর্ঘ দূরত্বের উড্ডয়নে মানচিত্রের সরল রেখা সবসময় সবচেয়ে কার্যকর পথ নয়। পৃথিবীর পৃষ্ঠে দুই স্থানের মধ্যে স্বল্পতম পথ, অর্থাৎ গ্রেট সার্কেল রুট, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাতাস, আবহাওয়া ও আকাশপথের বাস্তব পরিস্থিতি। জানালার বাইরে যাত্রাপথ যতই অদৃশ্য মনে হোক, তার পেছনে কাজ করে অসংখ্য গাণিতিক হিসাব।


আকাশের সংগঠিত পথ

আটলান্টিকের আকাশে আরও একটি বিস্ময়কর ব্যবস্থা আছে—নর্থ আটলান্টিক অর্গানাইজড ট্র্যাক সিস্টেম (NAT OTS)। সমুদ্রের ওপর মাটির রাস্তার মতো দৃশ্যমান কোনো হাইওয়ে নেই। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট উচ্চতা ও রুটে বিমান পরিচালনার জন্য সংগঠিত ট্র্যাক ব্যবহৃত হয়, যা আবহাওয়া, বাতাস ও অন্যান্য পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলাতে পারে। FAA-র উত্তর আটলান্টিক-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতেও NAT OTS-এর রুট ও ট্র্যাক ব্যবহারের নির্দেশনা দেখা যায়। অর্থাৎ রাতের আকাশে আমরা যে অসংখ্য বিমান দেখি, তার পেছনে কাকতালীয় কিছু নেই; আছে বিশাল এক আন্তর্জাতিক সমন্বয়।


একটি ভুল ধারণা

তবে একটি ভুল ধারণা দূর করা দরকার। রাত হলেই আটলান্টিকের আকাশ শান্ত হয়ে যায়, টার্বুলেন্স কমে যায় বা ফ্লাইট আপনাআপনি বেশি নিরাপদ হয়ে ওঠে—এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ঝড়, বজ্রগর্ভ মেঘ, উচ্চস্তরের বায়ুপ্রবাহ ও টার্বুলেন্স রাতেও হতে পারে। তাই আধুনিক বিমান শুধু চোখের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, স্যাটেলাইট তথ্য, অনবোর্ড আবহাওয়া রাডার এবং নিয়ন্ত্রিত ফ্লাইট পরিকল্পনার ওপর।


এখানেই রাতের আটলান্টিকের আসল সৌন্দর্য। যাত্রীর চোখে নিচে শুধু অন্ধকার, কিন্তু ককপিটে সেই অন্ধকার অজানা নয়। সেখানে আছে অবস্থানের তথ্য, নির্ধারিত রুট, উচ্চতা, বাতাসের গতি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, জ্বালানির হিসাব আর সামনের আকাশপথের পরিকল্পনা। অন্ধকার আছে চোখের সামনে, কিন্তু পথের অন্ধকার নেই।


জ্ঞানের উৎস

একসময় এই সমুদ্রই ছিল মানুষের কাছে বিরাট এক অজানা বিস্তার। বিজ্ঞান সেই অজানাকে মুছে দেয়নি; পর্যবেক্ষণ, গণনা ও গবেষণার মাধ্যমে তার নিয়মগুলো বুঝতে শিখেছে, আর মানুষ সেই জ্ঞানকে রূপ দিয়েছে প্রযুক্তিতে। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। এখান থেকেই শুরু হয় আরেকটি প্রশ্ন—এই জ্ঞান মানুষ পেল কোথা থেকে?


বিজ্ঞান নিঃসন্দেহে মানুষের অর্জন। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন, প্রকৌশলীরা বিমান বানিয়েছেন, পাইলটরা দক্ষতা অর্জন করেছেন, আর নেভিগেশন ও যোগাযোগ প্রযুক্তি গড়ে উঠেছে মানুষের দীর্ঘ সাধনায়। এসবই মানবসভ্যতার অসাধারণ কৃতিত্ব। কিন্তু মানুষের বুদ্ধি, পর্যবেক্ষণক্ষমতা, গণনার সামর্থ্য এবং প্রকৃতির নিয়ম আবিষ্কারের ক্ষমতাও তো সৃষ্টিরই অংশ।


চৌদ্দশ বছর আগে নাজিল হওয়া কোরআন মানুষকে বারবার প্রকৃতির নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান করেছে। সূরা আল-জাসিয়াহর ১২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ সমুদ্রকে মানুষের জন্য নিয়োজিত করেছেন, যাতে তাঁর নির্দেশে নৌযান তাতে চলতে পারে এবং মানুষ তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করে কৃতজ্ঞ হতে পারে। পরের আয়াতে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সবকিছু মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করার কথাও এসেছে। সূরা আন-নাহলের ১২ নম্বর আয়াতে রাত, দিন, সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এতে চিন্তাশীল মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।


এই বক্তব্যকে আধুনিক বিমানপ্রযুক্তির সরাসরি ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং এর গভীরতর শিক্ষা হলো, মানুষ পৃথিবী, সমুদ্র, আকাশ ও প্রাকৃতিক নিয়ম নিয়ে গবেষণা করে যে জ্ঞান অর্জন করছে, সেই সৃষ্টিজগতের মূল নিয়ন্তা আল্লাহ। মানুষ তাঁর দেওয়া বুদ্ধি ও সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে প্রকৃতির নিয়ম বুঝতে পারে, কিন্তু সেই নিয়মের স্রষ্টা মানুষ নয়। তাই রাতের আটলান্টিকের ওপর দিয়ে একটি বিমান যখন ছুটে চলে, তখন একসঙ্গে দুটি বিস্ময় চোখে পড়ে—মানুষের জ্ঞানচর্চার বিস্ময় এবং স্রষ্টার সৃষ্ট জগতের বিস্ময়।


বিমানটি মানুষের তৈরি, তার ইঞ্জিনও, নেভিগেশন ব্যবস্থাও মানুষের জ্ঞানের ফসল। কিন্তু বায়ুমণ্ডল, মহাসাগর, মাধ্যাকর্ষণ, পৃথিবীর ঘূর্ণন ও বাতাসের প্রবাহ—এর কোনোটিই মানুষ সৃষ্টি করেনি। মানুষ শুধু এসবের নিয়ম আবিষ্কার করেছে এবং কাজে লাগাতে শিখেছে। তাই বিজ্ঞানকে সম্মান করার অর্থ স্রষ্টাকে ভুলে যাওয়া নয়; সৃষ্টির নিয়ম যত গভীরভাবে বোঝা যায়, স্রষ্টার সৃষ্টিশীলতার বিস্ময়ও তত গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়।


কৃতজ্ঞতার গল্প

আটলান্টিকের রাত তাই শুধু একটি বিমানযাত্রার গল্প নয়। এটি সময় ও প্রযুক্তির গল্প, মানুষের মেধা ও অধ্যবসায়ের গল্প, প্রকৃতির নিয়ম বোঝার গল্প। আর সবশেষে এটি কৃতজ্ঞতার গল্প—কারণ মানুষ যত দূর আকাশেই উড়ুক, তার উড্ডয়নের প্রতিটি মুহূর্ত এমন এক সৃষ্টিজগতের নিয়মের ওপর নির্ভরশীল, যা তার নিজের সৃষ্টি নয়।


জানালার বাইরে হয়তো তখনো শুধু কালো সমুদ্র, দূরে কোনো শহরের আলো নেই। তবু সেই অন্ধকারের ওপর দিয়ে একটি আলোকিত বিমান এগিয়ে চলেছে নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে। মানুষ পথ তৈরি করেছে, কিন্তু পথের নিয়ম বানায়নি। আকাশ পাড়ি দেওয়ার প্রযুক্তি গড়েছে, কিন্তু আকাশ সৃষ্টি করেনি। বাতাসকে বুঝেছে, কিন্তু বাতাস সৃষ্টি করেনি। এই উপলব্ধিতেই বিজ্ঞানের বিস্ময় পূর্ণতা পায়, যখন মানুষের কৃতিত্বের পাশে বিনয়ের সঙ্গে স্মরণ করা হয় সেই মহান স্রষ্টাকে, যিনি মানুষকে জ্ঞান দিয়েছেন, প্রকৃতিকে নিয়মে বেঁধেছেন এবং সেই নিয়ম বুঝে এগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্যও দিয়েছেন।


আকাশের অন্ধকারে তাই শুধু বিমানের আলো জ্বলে না; জ্বলে মানুষের জ্ঞানের আলোও। আর সেই আলোর উৎসের দিকে তাকালে শেষ পর্যন্ত যে সত্তার কথা ফিরে আসে, তিনি একমাত্র সৃষ্টিকর্তা।


                                                                                                                   
                                   লেখক: সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)                                                                       

ডেল্টা টাইমস/রেহানা ফেরদৌসী/সিআর/এফএএইচ










  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ