টেলিযোগাযোগের প্রসারে সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশ

মুহম্মদ জসীম উদ্দিন

মতামত

একটা দিন ইন্টারনেট ছাড়া কল্পনা করুন তো। আবহাওয়ার খবর জানা, প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ, অফিসের কাজ, অনলাইন লেনদেন, শিক্ষার্থীর

2026-09-23T17:34:54+06:00
2026-09-23T17:38:56+06:00
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

টেলিযোগাযোগের প্রসারে সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশ
মুহম্মদ জসীম উদ্দিন
প্রকাশ: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৩৪ পিএম  আপডেট: ২৩.০৯.২০২৬ ৫:৩৮ পিএম  (ভিজিট : ৩)

একটা দিন ইন্টারনেট ছাড়া কল্পনা করুন তো। আবহাওয়ার খবর জানা, প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ, অফিসের কাজ, অনলাইন লেনদেন, শিক্ষার্থীর ক্লাস কিংবা চিকিৎসাসেবা, কত কিছুই না থেমে যাবে! হঠাৎ মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট বন্ধ হলে দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরকারি সেবায় কী প্রভাব পড়বে? দুর্যোগের সময়ে মানুষের কাছে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছানোই বা কতটা কঠিন হয়ে পড়বে?

প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে টেলিযোগাযোগ এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনসেবার অন্যতম ভিত্তি। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশও দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল সংযোগ নিশ্চিত করতে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণে এগিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তারের মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা।

বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল প্রযুক্তি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং জনসেবাসহ রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বৈশ্বিক সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি কিংবা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো দেশের স্থিতিশীলতা, সহনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

প্রযুক্তিনির্ভর এই সংযুক্ত বিশ্বে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সরকারি সেবাকে নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশও ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সম্প্রসারণ, স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ব্যবহার, স্মার্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং আধুনিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এসব উদ্যোগ দেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে আরও গতিশীল ও টেকসই করে তুলছে।

সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার “সবার জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট”, “ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব”, “এআই-চালিত ডাটা সেন্টার” এবং “বিনিয়োগবান্ধব ডিজিটাল অবকাঠামো” বাস্তবায়নে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের এই অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল), টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড, টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বিটিসিএল ইতোমধ্যে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় বিমানবন্দর ও রেলস্টেশনে ফ্রি ওয়াইফাই জোন স্থাপন, হাওর-বাঁওড় ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ৩,০০০ ওয়াইফাই হটস্পট স্থাপন, ১,০০০ কিলোমিটার মোবাইল ফাইবারাইজেশন এবং ১২,০০০ GPON সংযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের ৮টি বিমানবন্দর ও ৬টি রেলওয়ে স্টেশনে ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা চালু করা হয়েছে। বিমানবন্দরগুলো হলো— হযরত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম; কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর; শাহ মখদুম বিমানবন্দর, রাজশাহী; সৈয়দপুর বিমানবন্দর, সৈয়দপুর; ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট এবং যশোর বিমানবন্দর। এছাড়া কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, ঢাকা; সিলেট রেলওয়ে স্টেশন; চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন এবং ঢাকা এয়ারপোর্ট রেলওয়ে স্টেশনে ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা চালু হয়েছে।

দ্রুততম সময়ের মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন চালু করা হবে।   পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে MVNO ও কোয়াড-প্লে সেবা চালুর উদ্যোগ দেশের ডিজিটাল সেবাকে আরও বহুমাত্রিক ও আধুনিক করবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিটিসিএল 5G-রেডি অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক, উচ্চগতির IP ব্যাকবোন, আধুনিক ডাটা সেন্টার এবং ইকোনমিক জোনভিত্তিক টেলিকম অবকাঠামো নির্মাণে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে co-location ও shared telecom infrastructure গড়ে তোলার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ, স্থানীয় ISP এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

দীর্ঘমেয়াদে স্মার্ট সিটি নেটওয়ার্ক, গ্রিন ডাটা সেন্টার, ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম, IoT/M2M ইকোসিস্টেম এবং FTTx প্রযুক্তির মাধ্যমে ১০ লাখ পরিবারের ব্রডব্যান্ড সংযোগ নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ দেশের ডিজিটাল সক্ষমতাকে আরও সুসংহত করবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড দেশের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সেবা সম্প্রসারণে একটি কৌশলগত রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৯-৩০ সালের মধ্যে ১২ হাজার সাইট স্থাপন এবং দেশের ৯০ শতাংশ ভৌগোলিক কভারেজ নিশ্চিত করা হবে।

৭০০ মেগাহার্টজ ও ২৩০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ৪জি সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ইন্টারনেটের গতি ও গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিভাগীয় শহর, শিল্পাঞ্চল, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে ধাপে ধাপে ৫জি সেবা চালুর পরিকল্পনা দেশের ডিজিটাল সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

আগামী পাঁচ বছরে ২ কোটি গ্রাহক অর্জনের লক্ষ্যে টেলিটক নতুন সিম ক্যাম্পেইন, উদ্ভাবনী ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণে কাজ করছে। টেলি-পে মোবাইল অ্যাপ আধুনিকায়নের মাধ্যমে সরকারি ফি, ইউটিলিটি বিল এবং অন্যান্য ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজ ও দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা নগদবিহীন ডিজিটাল অর্থনীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের নীতি বাস্তবায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, নীতি ও বিধিমালা প্রণয়নে সহায়তা, অবকাঠামো পরিকল্পনা, নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং AI ও উদীয়মান প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটি নিরলসভাবে কাজ করছে।

একই সঙ্গে গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় প্রযুক্তি উৎপাদন সহায়তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণের মাধ্যমে একটি আধুনিক, নিরাপদ ও টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রেও এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের টেলিভিশন সম্প্রচার, স্যাটেলাইট ইন্টারনেট, ডি-টিএইচ সেবা, ভিস্যাট কানেক্টিভিটি এবং মোবাইল ও ডেটা সংযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ব্যবহার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে স্যাটেলাইট সেবা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

বিএসসিএল ভবিষ্যতে নতুন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, লো-অরবিট স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা সম্প্রসারণ, AIS প্রযুক্তি ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল সম্প্রচার সেবা উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর ফলে দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব আরও শক্তিশালী হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি আরও সম্প্রসারিত হবে।

বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল সংযোগ শুধু উন্নয়নের পূর্বশর্ত নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সহনশীলতারও অন্যতম ভিত্তি। দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, জরুরি যোগাযোগ, অনলাইন শিক্ষা, টেলিমেডিসিন ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারে নির্ভরযোগ্য টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

তবে প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে হলে ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতে হবে। গ্রাম-শহর নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের কাছে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, IoT এবং ডাটা-নির্ভর অর্থনীতির যুগে টেকসই উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো অপরিহার্য।

প্রযুক্তিই হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সহনশীলতা, উদ্ভাবন ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই ডিজিটাল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে আরও দৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

                                          লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযু্ক্তি মন্ত্রণালয়

ডেল্টা টাইমস/ মুহম্মদ জসীম উদ্দিন/ সিআর/এফএএইচ








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ