জ্বালানি নীতির প্রতিটি সিদ্ধান্তে নারী কেন উপেক্ষিত থাকেন

মিতা রহমান

মতামত

হঠাৎ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সমাজের নারী সমাজের ওপর বহুমুখী ও গভীর প্রভাব ফেলেছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও

2026-09-22T18:45:53+06:00
2026-09-22T18:45:53+06:00
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

জ্বালানি নীতির প্রতিটি সিদ্ধান্তে নারী কেন উপেক্ষিত থাকেন
মিতা রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৪৫ পিএম   (ভিজিট : ৬)

হঠাৎ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সমাজের নারী সমাজের ওপর বহুমুখী ও গভীর প্রভাব ফেলেছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কষ্টকর করে তুলছে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের সাধারণত গৃহস্থালি পরিচালনা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত সবকিছুই সামলাতে হয়। তাই তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে নারীদের ওপরই।

মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতিমধ্যে জনজীবনে পড়তে শুরু করেছে। চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সোমবার সকাল থেকেই সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, আর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। নতুন মূল্য অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে—এক রাতের ব্যবধানে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি। এর জেরে গণপরিবহন চালকরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন, এবং এর প্রভাব পড়েছে রাস্তার গণপরিবহন থেকে কাঁচাবাজার, এমনকি রং ও হার্ডওয়্যার সরঞ্জামের বাজার পর্যন্ত। যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনেও বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে; পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের ভাষ্যমতে, স্থানভেদে ট্রাকপ্রতি ভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি নারীর সংসার পরিচালনার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। জ্বালানির দাম বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কাঁচাবাজারের পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, ফলে চাল, ডাল, তেল, সবজিসহ প্রায় সব পণ্যের দামই বাড়ে। সীমিত আয়ে সংসার চালাতে গিয়ে নারীরা প্রতিনিয়ত তীব্র মানসিক ও আর্থিক চাপের মুখোমুখি হন। কর্মজীবী নারী ও ছাত্রীদের যাতায়াত খরচ একলাফে এতটাই বেড়ে যায় যে তা সামলাতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়; খরচ বাঁচাতে গিয়ে অনেকেই বাধ্য হন তুলনামূলক কম নিরাপদ বা অতিরিক্ত ভিড়ের গণপরিবহনে যাতায়াত করতে, যা তাদের নিরাপত্তা ও স্বস্তি বিঘ্নিত করে।

জ্বালানি তেলের সঙ্গে সঙ্গে এলপিজি গ্যাস, কেরোসিন ও অন্যান্য জ্বালানির দামও বাড়ে। গ্রামীণ ও শহরতলির যেসব নারী কেরোসিন বা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের রান্নার বাজেট কাটছাঁট করতে হয়। পরিবারের খরচ বেড়ে গেলে অনেক সময় নারীরা নিজেদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের বাজেট কমিয়ে দেন—সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে নিজের খাবার বা চিকিৎসার খরচ কমিয়ে দেওয়ায় তারা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তা, বিশেষ করে যারা অনলাইন ব্যবসা বা বুটিকের সঙ্গে জড়িত, তাদের পণ্যের ডেলিভারি খরচ বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা কমে যায়; কারো কারো ক্ষেত্রে তো ব্যবসা বন্ধেরই উপক্রম হয়।

আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানির দাম কম ছিল, তখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দাম না কমিয়েই লাভবান হয়েছে। এর বিপরীতে কিছুদিন আগে একলাফে ৫০ শতাংশ দাম বাড়িয়ে লিটারে মাত্র পাঁচ টাকা কমানো হয়েছিল—যাদের ওপর এর প্রভাব পড়েছিল তাদের জন্য এই সিদ্ধান্ত ছিল প্রকৃত অর্থেই উপহাসের শামিল। কারণ বাংলাদেশে একবার কোনো কিছুর দাম বাড়লে তা কমার দৃষ্টান্ত খুবই বিরল।

জ্বালানি তেলের বাড়তি মূল্য পরিবহন খরচে পুরোপুরি প্রতিফলিত হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে, এরপর ধীরে ধীরে তা নিত্যপণ্যের বাজারেও প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চাল, ডাল, আটা, ময়দা, চিনি, তেল, সবজি, মাছ ও মাংসের দামে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়, কারণ আজকের বাজারে যে পণ্য বিক্রি হচ্ছে তার বড় অংশ আগেই পরিবহন করে আনা হয়েছিল। কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা বাবর উদ্দিন বলেন, "আগামী দুয়েকদিনে বেশি দামে পণ্য কিনতে হলে খুচরা দামও বাড়াতে হবে। পরিবহন ভাড়া বাড়বে নিশ্চিত, আর বেশি দামে কিনতে হলে বেশি দামেই বিক্রি করতে হবে। সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে, সেখানে বলার কিছু নেই। কিন্তু এভাবে চলবে কীভাবে? সরকার কি সাধারণ মানুষের কথা একবারও ভাববে না?"

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়—এটি নারী সমাজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মানসিক শান্তি এবং জীবনযাত্রার মান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে সাধারণত নারীরাই সীমিত আয়ের মধ্যে সংসার পরিচালনার মূল দায়িত্ব পালন করেন। তেলের দাম বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও যাতায়াত খরচ বেড়ে যায়, যা নারীদের নিজস্ব সঞ্চয় বা জরুরি তহবিলের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

কয়েক বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী থাকায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চাপের মুখে। বাসভাড়া, চাল-সবজির মূল্য কিংবা রান্নার খরচ বাড়লে তা নিম্ন আয়ের পরিবারের মাসিক বাজেটে বড় ধাক্কা দেয়। শহরের নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ, ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল কৃষক পরিবার এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরাই এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

এমনিতেই গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত; তার ওপর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। সরকার এসব সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান দিতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি একলাফে ২০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হলো, যা মুক্তবাজারের চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষের ওপর আরেকটি বড় বোঝা। কৃষি ও গণপরিবহনের চালিকাশক্তি ডিজেলের দাম ১৭.৪ শতাংশ বেড়ে ১৩৫ টাকায় দাঁড়ানোয় সেচ ও উৎপাদন খরচ বেড়ে প্রান্তিক কৃষক আরও কঠিন সংকটে পড়বেন। অন্যদিকে পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং গ্রামীণ মেহনতি মানুষের আলোর প্রধান উৎস কেরোসিনের দাম ১৪.৮ শতাংশ বেড়ে ১৫৫ টাকা হওয়ায় তাদের জীবনেও তীব্র সংকট তৈরি হবে।

যাতায়াত খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় অনেক চাকরিজীবী নারীর যাতায়াত ভাতা বেতনের বড় অংশ খেয়ে ফেলছে, ফলে কম বা মাঝারি বেতনের নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে যাতায়াত করাই আর্থিকভাবে অলাভজনক হয়ে উঠছে। নিত্যদিনের পারিবারিক ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেয়ে নারীদের ওপর তৈরি হচ্ছে তীব্র মানসিক চাপ, যা পরিবারে অশান্তি ও মানসিক অবসাদের জন্ম দিচ্ছে। খরচ বাঁচাতে অনেক নারী নিরাপদ গণপরিবহন ছেড়ে অতিরিক্ত ভিড়যুক্ত বা অনিরাপদ পরিবহনে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের দৈনন্দিন উৎকণ্ঠা ও শারীরিক ক্লান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সমাজে যে মূল্যস্ফীতির শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, তার সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও চূড়ান্ত প্রভাবটি গিয়ে পড়ে নারীর ক্ষমতায়ন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপরই।

              লেখক: কবি ও রাজনীতিক, যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাপ; আহ্বায়ক, জাতীয় নারী আন্দোলন

ডেল্টা টাইমস/ মিতা রহমান / সিআর/এফএএইচ









  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ