ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শেষ হলো দুই দিনব্যাপী ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্যের অধীন থাকা অর্থনৈতিক জোটগুলোর বিপরীতে একটি ভারসাম্য সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে ব্রিকস ক্রমশ অবস্থান শক্ত করছে। জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়গুলোই ছিল এবারের শীর্ষ সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্রিকসের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ, ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধ, ইয়েমেনে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের মধ্যকার সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ঘিরে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধ ঘিরে ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য ক্রমেই বাড়ছে। দেখার বিষয়, এবারের সম্মেলনে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো নিজেদের মতপার্থক্য কীভাবে কাটিয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য দেশ ১১টি। এসব দেশ মিলে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এসব দেশের নিয়ন্ত্রণে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা-পাঁচটি দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে নামকরণ করা হয়েছে ব্রিকসের (বিআরআইসিএস)। কাজেই নাম দেখে বোঝা যায়, ব্রিকস হলো এ পাঁচ দেশের জোট।২০০৬ সালে বাণিজ্য জোট হিসেবে ব্রিকসের যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে সদস্য ছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন। ২০১০ সালে যুক্ত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। পরে জোটের সদস্য আরও বেড়েছে। ২০২৩ সালে এসে ব্রিকসে যোগ দেয় মিসর, ইথিওপিয়া, সৌদি আরব, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
ওই সময় আর্জেন্টিনাকে ব্রিকসের সদস্য হতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু জাভিয়ের মিলেই দেশটির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সাফ জানিয়ে দেন, তাঁর দেশ পশ্চিমাঘেঁষা নীতি মেনে চলবে। তাই ব্রিকসে যোগ দেবে না। ইন্দোনেশিয়া ২০২৫ সালে ব্রিকসে যোগ দিয়েছে। বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য দেশ ১১টি। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ব্রিকসের সদস্য রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে আন্তসীমান্ত লেনদেনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়েও নেতারা আলোচনায় স্থান পেয়েছে।এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের সময়টিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ বছর চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিতীয় দফার শীর্ষ সম্মেলনের আগে ব্রিকস নেতারা বৈঠকে বসছেন। নিষেধাজ্ঞার মধ্যে অর্থনীতি শক্তিশালী করায় ব্রিকসের এবারের সম্মেলনে বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তি বিষয়ে জ্ঞান-অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব পেয়েছে। ফরাসি আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নাটিক্সিসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ব্রিকসের সদস্য রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে আন্তসীমান্ত লেনদেনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়েও নেতারা আলোচনা করেছেন। এ বছর এমন এক সময় ব্রিকসের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো, যখন ইরান যুদ্ধের দামামা বাজছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র- ইসরায়েলের হামলা ছয় মাসে গড়িয়েছে। গত মে মাসে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসেছিলেন। ওই বৈঠক থেকে ইরান যুদ্ধের বিষয়ে যৌথ নিন্দা জানানোর একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সেটা সফল হয়নি। এবারের শীর্ষ সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অংশ নিয়েছেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে এটি ভারতে তাঁর প্রথম সফর। সেই সঙ্গে আট বছর পর কোনো ইরানি প্রেসিডেন্টের ভারত সফরও এটি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত ১৭তম ব্রিকস সম্মেলনে দেওয়া যৌথ ঘোষণায় নেতারা ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সমালোচনা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। উল্টো রাশিয়ায় ইউক্রেনের হামলার নিন্দা জানিয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বছর ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ব্রিকসের যৌথ অবস্থান নির্ধারণে বড় সমস্যা হবে বলে মনে হয় না। কারণ, এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধের কৌশল খুঁজতে আলোচনা করছে। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার মস্কোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ সফর করেন তাঁরা।এবারের সম্মেলন এমন বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্বে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। পণ্য সরবরাহে টালমাটাল অবস্থা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের কারণে বাণিজ্য ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে। ‘ব্রিকস নয়াদিল্লি ঘোষণায়’ এই বিষয়গুলো জায়গা করে নিয়েছে। এতে বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে বলা হয়, একতরফাভাবে শুল্ক আরোপ বাণিজ্যকে বিকৃত করে এবং ডব্লিউটিওর নিয়মের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। তাই চলমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় ডব্লিউটিওর সক্ষমতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ঐকমত্য পোষণ করে।পাশাপাশি অমীমাংসিত বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং ভারসাম্যপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে সমর্থন দেওয়া হবে বলেও ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া মার্কিন ডলারের আধিপত্য কমাতে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের প্রস্তাবও করা হয়েছে। এদিকে জাতিসংঘে আরো বৃহৎ পরিসরে ভূমিকা পালনের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়ার প্রতি নিজেদের আকাঙ্ক্ষার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে ভারত ও ব্রাজিল। নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘পরিবর্তনশীল বিশ্বকে পুরনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব নয়; প্রতিনিধিত্ব, কার্যকারিতা ও নিয়ম তৈরির ক্ষেত্রে সংস্কার জরুরি'। সম্মেলনের পার্শ্ববৈঠকে মিলিত হন চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই দুই নেতা সীমান্ত পরিস্থিতি, বাণিজ্য-বিনিয়োগসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করেন, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক যখন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে, তখন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন ভ্লাদিমির পুতিনকে বৈশ্বিক দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক তুলে ধরার সুযোগ দেবে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আসা অনিশ্চিত বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নীতির বিরুদ্ধে ভারসাম্য তৈরির বিষয়ে অনেক দেশের আগ্রহকে কাজে লাগানোর সুযোগ রাশিয়া ও চীন পাবে।বৃহত্তর পরিসরে দেখতে গেলে, চলমান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ বছরের ব্রিকস সম্মেলন বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমরা আশা করি, ব্রিকসের যৌথ ঘোষণার আলোকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। মনে রাখা জরুরি, বৈশ্বিক রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানই কাম্য।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।
ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই