রাজধানীর বাসিন্দা রুম্পা (ছদ্মনাম), ৩৯ বছর বয়সি একজন বিবাহিত নারী। বিয়ের পর স্বামীর মাধ্যমে তার সিগারেট ও গাঁজা সেবনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে বন্ধুদের সংস্পর্শে এসে তিনি ইয়াবা গ্রহণ শুরু করেন। ক্রমশ তার আচরণ ও জীবনযাপনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিতে থাকে। তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব ও যত্ন কমে যায়, দাম্পত্য সম্পর্কে অবনতি ঘটে এবং পরকীয়াসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে জড়িয়ে পড়েন।
পরিস্থিতির অবনতি হলে পরিবারের উদ্যোগে তাকে একটি প্রাইভেট মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। নিয়মিত চিকিৎসায় ধীরে ধীরে তার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বর্তমানে রুম্পা প্রায় পাঁচ মাস ধরে মাদকমুক্ত রয়েছেন। তিনি অনলাইনে একটি খাদ্যভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে তার সম্পর্ক আগের তুলনায় অনেক বেশি আন্তরিক ও ইতিবাচক হয়েছে। উপরোক্ত ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। মাদকের কারবার ও মাদকদ্রব্যজনিত নেশার কারণে মারাত্নক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, এর ফলে জাতীয় উন্নয়ন ও জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব এত বেশি যে, জাতিসংঘ ১৯৯১ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত পুরো একটি দশককে মাদক বিরোধী দশক হিসেবে ঘোষণা করে। ২৬ জুনকে ঘোষণা করে মাদক বিরোধী দিবস হিসেবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমীক্ষা অনুসারে, বর্তমানে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৮২ থেকে ৮৩ লাখ। যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশই হচ্ছে শিশুকিশোর ও তরুণ-তরুণী। আমাদের দেশে প্রচলিত মাদকদ্রব্যের মধ্যে ইয়াবা, গাজা, ফেনসিডিল, মদ, আফিম, হেরোইন, কোকেন, প্যাথেডিন, বিভিন্ন ধরনের ঘুমের ওষুধ, এমনকি জুতার আঠাও রয়েছে। এসব মাদকের বেশির ভাগই আসে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার হতে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এর তথ্য মতে, ২০২৫ সালে মাদকের মধ্যে ক্যানাবি, হেরোইন, কোডেনভিত্তিক সিরাপ, ইনজেকটেবল ড্রাগস, উদীয়মান সিনথেটিক দ্রব্যাদি উল্লেখযোগ্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা প্রায় ৪৩ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ইয়াবা ট্যাবলেট আটক করে। এশিয়ার গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট ও গোল্ডেন ওয়েজ নামে পরিচিত মাদক চোরাচালানের তিনটি প্রধান অঞ্চলের কেন্দ্রে বাংলাদেশের অবস্থান। তাই আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিরাও বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে সহজে ব্যবহার করতে পারছেন। ডিজিটাল যোগাযোগ প্লাটফর্ম ও অনলাইন মার্কেটসমূহ মাদকদ্রব্য বিতরণ ও পাচারের ক্ষেত্রে নতুন চ্যানেল হিসাবে আবিভূর্ত হয়েছে। মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সহপাঠী আর আশেপাশের মানুষ দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। মাদকের ব্যবহার বেশ স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকের বিস্তারের ফলে তরুণদের জীবন নষ্ট হয়ে যায়। পরিবারে অশান্তি বাড়ে, মাদকাসক্তরা নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। তাঁরা নানা রোগে আক্রান্ত হন। মাদকাসক্তি ও রোগের চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। মাদক চোরাচালানে দেশ থেকে বিপুল অর্থ পাচার হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে মাদকের কারণে প্রতিবছর পাচার হয়ে যায় ৪৮১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ছয় হাজার ৮৪১ কোটি টাকারও বেশি)। আর মাদক কেনাবেচা করে অর্থ পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম।
মাদকাসক্তির মূল কারণগুলো হলো, বেকারত্ব, মাদকের সহজলভ্যতা, সঙ্গদোষ, পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অবক্ষয়, হতাশা ও মানসিক চাপ, এবং নিছক আনন্দ ও মাদক নিয়ে কৌতুহল। এটা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রয়োজন। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মন্দিরসহ অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে মাদকবিরোধী প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে। যার মাধ্যমে জনসাধারণকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অবগত করা সম্ভব। প্রয়োজনে টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র, এবং অন্যান্য মিডিয়ার মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম প্রচার করতে হবে। এর পাশাপাশি অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। তারা আসলে কেমন বন্ধু বান্ধব এর সাথে মেলামেশা করে সেগুলোর খোঁজ খবর নিতে হবে।
সন্তানদের সাথে মাদকের বিপদ সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। তাহলে আপনার সন্তানরা মাদক এর ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে জানতে পারবে। তাই ছোটোবেলা থেকেই তাদের মাদকের বিপদ সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করার চেষ্টা করতে হবে। মনে রাখবেন, মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে নিজের পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম। কারণ, সহানুভূতি, সমর্থন এবং উৎসাহের মাধ্যমে একটি পরিবার কোনো মাদকাসক্তদের নতুন জীবন গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা যোগাতে পারবে।
মাদকাসক্তির পেছনে অনেক সময়ই মানসিক কারণ কাজ করে। হতাশা, উদ্বেগ, ট্রমা, – এসবের প্রভাব মাদকের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি করে। তাই মাদকাসক্তদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনোবিজ্ঞানী, মনোচিকিৎসক এবং সামাজিক কর্মীদের সহায়তায় মাদকাসক্তদের মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।
মাদকমুক্ত জীবনে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন আর্থিক স্বাবলম্বন। তাই মাদকাসক্তদের জন্য জীবিকা নির্বাহের প্রশিক্ষণ প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তারা নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবে। প্রতিরোধের অংশ হিসেবে, স্কুল, কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য বইয়ে মাদকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা; সভা, সমিতি, সেমিনার ও আলোচনার মাধ্যমে মাদক প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা; সুস্থ বিনোদনমুলক কার্যক্রমের সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ত করে নেশার হাতছানি থেকে তাদের দূরে রাখা; মানবিক মূল্যবোধ গঠন ও পরিবেশন; পিতা-মাতা কর্তৃক শিক্ষামূলক কর্মসূচি গ্রহণ; এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা দরকার।
বাংলাদেশের প্রধান মাদকবিরোধী আইন হলো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮, যা পরবর্তীতে প্রযুক্তিভিত্তিক অপরাধ মোকাবিলায় ২০২৬ সালে সংশোধন করা হয়েছে। এই আইনে মাদকের পরিমাণভেদে সর্বনিম্ন ১ বছরের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সাইবার জগৎ ব্যবহার করে অনলাইন মাদক ব্যবসা চালালে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মাদকমুক্ত দেশ গড়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার এই আইন বাস্তবায়নে কাজ করছে। সুষম, প্রযুক্তি নির্ভর ও আধুনিক মাদক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরির বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতবদ্ধ। দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর হলো প্রধান আইন প্রয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি মোকাবিলার লক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, কাস্টমস, কোস্ট গার্ড, র্যাব এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের সাথে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে সারা দেশে গোয়েন্দাভিত্তিক কার্যক্রম ও অবৈধ কার্যক্রম বন্ধের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়। এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধের লক্ষ্যে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহের সাথেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখে।
মাদকদ্রব্যের চাহিদা হ্রাসের জন্য মনোযোগ প্রদান করা হয়। সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে যোগাযোগ, গণমাধ্যমের ব্যাবহার, মাদক-বিরোধী কমিটি গঠন, র্যালি, সেমিনার এবং ডিজিটিাল মনিটরিং উদ্যোগসমূহ এই কার্যক্রমের অর্ন্তভুক্ত ছিলো। চিকিৎসা ও পুনর্বাসন বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সেন্ট্রাল ড্রাগ এডিকশন ট্রিটমেন্ট সেন্টার, বিভাগীয় চিকিৎসা কেন্দ্র, লাইসেন্সকৃত প্রাইভেট ও এনজিও-পরিচালিত কেন্দ্রের মাধ্যমে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা প্রদান করে আসছে। পারিবারিক কাউন্সিলিং, মানসিক শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, সেবা বিকেন্দ্রীকরন উদ্যোগ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
মাদক উন্নয়নকে ধ্বংস করে, অপরাধ ও দুর্নীতিকে উসকে দেয় এবং মানুষের জীবনে সর্বনাশ করে। মাদকাসক্তি মোকাবিলায় প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন-এই তিনটির সমন্বয়ে পদক্ষপ নিতে হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ যেমন সরকারের বিভিন্ন সংস্থাসমূহ, এনজিও, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ, একাডেমিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, প্রাইভেট সেক্টর এর মধ্যে সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নারকোটিক্স অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেশ এই সমস্যা থেকে মুক্ত হবে, এই প্রত্যাশা সকলের ।
আসুন দেশকে মাদকের হাত থেকে রক্ষার লক্ষ্যে জনসচেতনতা গড়ে তুলি এবং এই লক্ষ্যে সকলে সম্মিলিতভাবে কাজ করি ।
লেখক: সাংবাদিক। পিআইডি ফিচার
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই