একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করে শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে সরকারের ব্যয়ের বড় উৎস হলো রাজস্ব। তাই রাজস্ব আদায় কমে গেলে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চাপ তৈরি হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানো নতুন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ করা, করদাতাবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর এখন বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের চিত্রই এই চ্যালেঞ্জের বাস্তবতা তুলে ধরে। ওই অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছে এবং ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা।
আয়কর থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮৬ হাজার ১১০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ভ্যাট থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। এসব খাতেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। ফলে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়নে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনা হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন। রাজস্ব কম হলে সরকারকে ঋণনির্ভর হতে হয়। তাই বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার পাশাপাশি তা পূরণের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাও প্রয়োজন।রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআরকে কর ব্যবস্থার পুরোনো দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো সীমিত করভিত্তি। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ ও প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হলেও তাদের একটি বড় অংশ কর ব্যবস্থার বাইরে। আবার করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও অনেকে কর দেন না। আয় গোপন, কর ফাঁকি, ভুয়া চালান, অনিয়ম এবং কর প্রশাসনের জটিলতা রাজস্ব আদায়ের পথে বাধা সৃষ্টি করে। তাই রাজস্ব আদায় বাড়াতে যা করতে হবে, তার প্রথম কাজ হলো করের আওতা সম্প্রসারণ। নতুন করদাতা শনাক্ত করতে ব্যবসা, সম্পত্তি, ব্যাংকিং, গাড়ি, আমদানি-রপ্তানি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে করদাতার ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত করদাতাদের জন্য সহজ সেবা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা দরকার।
কর কাঠামো আধুনিকায়নে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনলাইনে রিটার্ন দাখিল, কর পরিশোধ ও কর সনদ সংগ্রহের ব্যবস্থা সহজ হলে করদাতার সময় ও খরচ কমবে। ২০২৫-২৬ করবর্ষে অধিকাংশ ব্যক্তি করদাতার জন্য অনলাইন রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৩০ লাখের বেশি ই-রিটার্ন জমা পড়েছিল। এটি কর ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ডিজিটাল ব্যবস্থা শুধু করদাতার সুবিধাই বাড়ায় না, কর প্রশাসনেও স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে। অফিসে সরাসরি যোগাযোগ কমলে হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগ কমে। কর কর্মকর্তারা ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোথায় অনিয়ম হচ্ছে তা সহজে শনাক্ত করতে পারেন। ফলে সেবা ও নজরদারি—দুই ক্ষেত্রেই দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। ভ্যাট ব্যবস্থাপনাতেও আধুনিকায়ন প্রয়োজন। ম্যানুয়াল পদ্ধতির পরিবর্তে ই-ফাইলিং, ই-ইনভয়েস ও স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিশ্লেষণের ব্যবস্থা চালু করা গেলে ভুয়া চালান ও কর ফাঁকি কমানো সম্ভব। অনলাইন ব্যবসা ও ই-কমার্সের দ্রুত বিস্তারের কারণে ডিজিটাল অর্থনীতিকেও কার্যকরভাবে কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। অনলাইন পণ্য ও সেবা বিক্রির ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায়ের জন্য এনবিআরের নতুন নির্দেশনাও রয়েছে। ফলে অর্থনীতির নতুন খাতগুলোকে বাদ দিয়ে আধুনিক রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। রাজস্ব আদায় বাড়াতে এনবিআরের সম্মেলন, প্রশিক্ষণ ও নতুন কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ।
কর কর্মকর্তাদের প্রযুক্তি, ডেটা বিশ্লেষণ এবং আধুনিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্পর্কে দক্ষ করতে হবে। শুধু অভিযান বা জরিমানার মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব নয়। করদাতাদের কর প্রদানে উৎসাহিত করার পাশাপাশি কর ফাঁকি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের হয়রানি নয়, আনন্দদায়ক পরিবেশে রাজস্ব আদায় করতে হবে। ব্যবসা পরিচালনায় অযথা জটিলতা থাকলে করদাতার মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। তাই কর প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সেবা দেওয়া, সহযোগিতা করা এবং নিয়ম মানতে উৎসাহিত করা। সহজ নিয়ম, দ্রুত সেবা ও স্বচ্ছ প্রশাসন থাকলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ করদাতার মধ্যে আস্থা বাড়বে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে করের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের দেওয়া কর থেকেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করা হয়। তাই করকে শুধু সরকারের অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক ও জনবান্ধব করা এখন সময়ের দাবি। করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনবল, স্বচ্ছতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
লক্ষ্যমাত্রা পূরণ শুধু এনবিআরের দায়িত্ব নয়; কার্যকর কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার, ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিক—সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। একটি সহজ, স্বচ্ছ ও আধুনিক কর ব্যবস্থা গড়ে উঠলেই রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
লেখক : সমাজকর্ম বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা
ডেল্টা টাইমস/নাজিয়া তাবাসসুম /সিআর/এনজিটি