বাংলাদেশের ফুটবল কোথায় আটকে, উন্নয়নের পথ কোন দিকে

মোহাম্মদ ইয়ামিন:

মতামত

বাংলাদেশে ফুটবল নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। বিশ্বকাপ এলেই তার প্রমাণ মেলে: পছন্দের দলের পতাকা, জার্সি, রাত জেগে

2026-09-19T12:20:07+06:00
2026-09-19T12:20:07+06:00
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশের ফুটবল কোথায় আটকে, উন্নয়নের পথ কোন দিকে
মোহাম্মদ ইয়ামিন:
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২০ পিএম   (ভিজিট : ০)

বাংলাদেশে ফুটবল নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। বিশ্বকাপ এলেই তার প্রমাণ মেলে: পছন্দের দলের পতাকা, জার্সি, রাত জেগে খেলা দেখা। ফুটবল এ দেশের মানুষের আবেগের বড় একটি জায়গা দখল করে আছে। কিন্তু সেই আবেগের খুব সামান্যই বাংলাদেশের ফুটবলের শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

কেন?

উত্তর খুঁজতে শুধু জাতীয় দলের ফলাফল দেখলে চলবে না। দেখতে হবে স্কুলের মাঠ, স্থানীয় প্রতিযোগিতা, বয়সভিত্তিক দল, কোচ তৈরির ব্যবস্থা, ক্লাব পরিচালনা, খেলোয়াড়দের নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ এবং পুরো ফুটবল অর্থনীতিকে।

প্রতিভার অভাব বাংলাদেশের ফুটবলের মূল সমস্যা নয়। সমস্যা হলো প্রতিভা খুঁজে বের করা, ধরে রাখা এবং ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলার কার্যকর ব্যবস্থা এখনো না থাকা। পরিবর্তন দরকার ঠিক এখানেই।

শুরুটা হোক স্কুল থেকে

একজন ফুটবলার এক দিনে তৈরি হন না। শৈশব থেকেই তাঁকে বলের সঙ্গে থাকতে হয়, নিয়মিত খেলতে হয়, বয়স অনুযায়ী প্রশিক্ষণ পেতে হয়। অথচ দেশের বেশির ভাগ স্কুলে ফুটবল নিয়মিত ক্রীড়া কার্যক্রমের অংশ নয়।

তাই স্কুল ফুটবলকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় স্কুলভিত্তিক লিগ চালু করা যেতে পারে, যেখানে U-12, U-14, U-16 ও U-18 বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা হবে। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে শুধু টুর্নামেন্ট করলে হবে না; পুরো শিক্ষাবর্ষজুড়ে ধারাবাহিক ম্যাচের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এখানে খেলোয়াড়ের তথ্য সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু প্রথমবার উপজেলা পর্যায়ে খেললেই তার নাম, বয়স, অবস্থান, ম্যাচের সংখ্যা ও পারফরম্যান্সের তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে রাখা যেতে পারে। তাতে পরে সে কোথায় খেলছে, কতটা এগোচ্ছে, তা অনুসরণ করা যাবে।

বাফুফের গ্রাসরুট কর্মসূচির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, তরুণ ফুটবলারের বড় ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব। ২০২৪ সালের AFC-এর গ্রাসরুট পর্যালোচনায় বাফুফের একটি বয়সভিত্তিক একাডেমি প্রতিযোগিতায় ১৬৮টি একাডেমি ও প্রায় ৪ হাজার ৮০০ খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণের তথ্য আছে। অর্থাৎ খেলোয়াড়ের ঘাটতি যতটা মনে হয়, বাস্তবে সমস্যা তার চেয়ে বেশি কাঠামোগত।

উপজেলা থেকে জাতীয় দল: চাই একটি পরিষ্কার পথ

বাংলাদেশে একজন তরুণ ফুটবলারের সামনে জাতীয় পর্যায়ে ওঠার পথ কতটা পরিষ্কার? বাস্তবে মোটেই নয়। কাঠামোটা হতে পারে এমন:

স্কুল → উপজেলা → জেলা → বিভাগ → জাতীয় বয়সভিত্তিক দল → পেশাদার ক্লাব → জাতীয় দল

প্রতিটি স্তরে নিয়মিত প্রতিযোগিতা থাকতে হবে। উপজেলার সেরারা জেলা দলে, জেলার সেরারা বিভাগীয় দলে সুযোগ পাবেন। বিভাগীয় পর্যায় থেকে নির্বাচিতদের নিয়ে হবে জাতীয় উন্নয়ন ক্যাম্প।

এ ব্যবস্থার বড় সুবিধা হলো ঢাকার বাইরের প্রতিভাদের সামনে আনা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন, যাঁদের ঢাকায় এসে ট্রায়াল দেওয়ার সুযোগ নেই। স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা বাড়লে তাঁদের খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।

ক্লাবকে দল নয়, প্রতিষ্ঠান হতে হবে

জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা আসেন ক্লাব থেকেই। তাই ঘরোয়া ক্লাব ফুটবল শক্তিশালী না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। ২৫-৩০ জন খেলোয়াড়ের একটি মৌসুমি দল হিসেবে ক্লাব চালালে চলবে না; ক্লাবকে পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়তে হবে।

একটি পেশাদার ক্লাবে থাকা উচিত পূর্ণকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, স্পোর্টিং ডিরেক্টর, কোচিং স্টাফ, ফিটনেস কোচ, ফিজিওথেরাপিস্ট, চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ, ডেটা অ্যানালিস্ট, স্কাউটিং বিভাগ, মিডিয়া ও মার্কেটিং বিভাগ এবং বয়সভিত্তিক একাডেমি।

ইউরোপের ফুটবলের বড় শিক্ষা এখানেই। সেখানে মূল দলের পাশাপাশি U-12 থেকে U-21 পর্যন্ত বয়সভিত্তিক দল থাকে। একজন খেলোয়াড় ছোট বয়স থেকে একই ক্লাবের দর্শন ও প্রশিক্ষণব্যবস্থার মধ্য দিয়ে উঠে আসেন। বাংলাদেশের ক্লাবগুলোও ধীরে ধীরে এমন কাঠামো গড়তে পারে।

ইউরোপের মডেল মানে বিদেশি খেলোয়াড় নয়


আমরা প্রায়ই ইউরোপীয় ফুটবল বলতে বিদেশি কোচ বা বিদেশি খেলোয়াড় বুঝি। কিন্তু এর আসল শক্তি ব্যবস্থাপনা। ক্লাবের অর্থ কোথা থেকে আসবে, কীভাবে খরচ হবে, খেলোয়াড়ের বেতন কীভাবে নিশ্চিত হবে, একাডেমিতে কত বিনিয়োগ হবে, কোন বয়সে খেলোয়াড়কে মূল দলে আনা হবে, সবকিছুর পরিকল্পনা থাকে।

AFC-এর ক্লাব লাইসেন্সিং কাঠামোতেও ক্রীড়া, অবকাঠামো, প্রশাসন, আইন, জনবল ও আর্থিক সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু মাঠে দল নামানো আধুনিক ফুটবলে পেশাদারিত্বের মাপকাঠি নয়। বাংলাদেশেও ক্লাব লাইসেন্সিংকে আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। পেশাদার লিগে খেলতে হলে ক্লাবের নির্দিষ্ট অবকাঠামো, আর্থিক সক্ষমতা, যুব একাডেমি, কোচিং কাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকা উচিত।

শুধু অনুশীলন নয়, খেলতেও হবে

ভালো হতে হলে তরুণ ফুটবলারকে নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলতে হবে। কিন্তু আমাদের মৌসুমে দীর্ঘ বিরতি, ম্যাচের সংখ্যা সীমিত এবং বয়সভিত্তিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা অপর্যাপ্ত।

প্রিমিয়ার লিগের পাশাপাশি দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের লিগকে শক্তিশালী করতে হবে, বয়সভিত্তিক লিগ বাড়াতে হবে, চালু করা যেতে পারে রিজার্ভ বা ডেভেলপমেন্ট দল। ১৭-১৮ বছরের একজন খেলোয়াড়কে সিনিয়র দলের বেঞ্চে বসিয়ে রাখলে তাঁর উন্নয়ন হবে না; তাঁকে নিয়মিত খেলার সুযোগ দিতে হবে।

মাঠের সংকট

অবকাঠামোর সংকটও বড় বাধা। রাজধানীসহ দেশের অনেক এলাকায় খেলার মাঠ কমছে, আর যেগুলো আছে, তার অনেকই ফুটবল অনুশীলনের উপযোগী নয়। এখানে সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।

প্রতিটি জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় অন্তত একটি মানসম্মত ফুটবল মাঠ থাকা দরকার। তবে মাঠ বানানোর চেয়ে বড় কথা তার রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা। সরকারি অর্থে তৈরি মাঠ বছরের বেশির ভাগ সময় খালি পড়ে থাকলে বিনিয়োগের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।

সরকার কীভাবে পাশে দাঁড়াতে পারে

ফুটবল উন্নয়ন শুধু বাফুফের দায়িত্ব নয়। সরকারকে অবকাঠামো ও নীতিগত সহায়তা দিতে হবে:

১. স্কুল ফুটবলের জাতীয় কর্মসূচি: শিক্ষা ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে স্কুল লিগ চালু করা যেতে পারে।
২. নির্দিষ্ট বাজেট: জেলা ও উপজেলা ফুটবল লিগের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।
৩. কর-প্রণোদনা: যুব একাডেমি, নারী ফুটবল বা স্থানীয় ফুটবলে বিনিয়োগ করলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট নীতির আওতায় সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।
৪. আঞ্চলিক একাডেমি: আট বিভাগে ফুটবল একাডেমি গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের থাকা, খাওয়া, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে।

নারী ফুটবল: পুরো কাঠামোর অংশ

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নারী ফুটবলকে আলাদা অংশ হিসেবে নয়, পুরো কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকেই মেয়েদের নিয়মিত প্রতিযোগিতার সুযোগ দিতে হবে এবং উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নারী লিগ চালু করা যেতে পারে। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে নারী ফুটবলে যে সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তাকে আরও শক্তিশালী করতে নিয়মিত ঘরোয়া প্রতিযোগিতা জরুরি।

জবাবদিহি ছাড়া অর্থ ব্যয়ে লাভ নেই


ফুটবল উন্নয়নে অর্থ লাগবে, কিন্তু অর্থ বরাদ্দ মানেই সাফল্য নয়। কোন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হলো, কতজন প্রশিক্ষণ পেল, কতজন পরের ধাপে গেল, কতজন পেশাদার ক্লাবে সুযোগ পেল, এসব তথ্য প্রকাশ করা দরকার।

বাফুফে, ক্লাব ও সরকারি সংস্থার কর্মসূচির জন্য পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। যেমন, পাঁচ বছরে কতজন নতুন কোচ তৈরি হবে, কতটি একাডেমি গড়ে উঠবে, কতটি জেলা লিগ চালু হবে, কতজন বয়সভিত্তিক খেলোয়াড় পেশাদার ফুটবলে আসবে।

দরকার ১০ বছরের জাতীয় পরিকল্পনা

সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধারাবাহিকতা। নেতৃত্ব বদলাবে, সরকার বদলাবে, ক্লাবের মালিকানা বদলাবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বদলালে চলবে না। তাই অন্তত ১০ বছরের একটি জাতীয় ফুটবল উন্নয়ন পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

প্রথম পর্যায়ে জোর পাবে স্কুল, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও গ্রাসরুট ফুটবল। দ্বিতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী করা হবে ক্লাব, একাডেমি, কোচিং, অবকাঠামো, স্পোর্টস সায়েন্স ও পেশাদার লিগ। প্রতি দুই বা তিন বছর পর অগ্রগতি পর্যালোচনা হবে।

বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে হতাশ হওয়ার আগে নিজেদের কাঠামোর দিকে তাকানো দরকার। একটি দেশের ফুটবল শুধু জাতীয় দলের ৯০ মিনিটে তৈরি হয় না। এর পেছনে থাকে হাজারো শিশু, শত শত কোচ, অসংখ্য স্থানীয় ম্যাচ, মাঠ, ক্লাব, একাডেমি আর দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু একটি ভালো জাতীয় দল নয়; এমন একটি ব্যবস্থা, যেখান থেকে প্রতিবছর নতুন খেলোয়াড় উঠে আসবে। একটি শিশু গ্রামের স্কুলের মাঠে ফুটবল শুরু করবে, উপজেলা লিগে খেলবে, জেলা ও বিভাগে নিজেকে প্রমাণ করবে, কোনো পেশাদার ক্লাবের একাডেমিতে জায়গা পাবে, তারপর মূল দলে উঠে আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। এই পথ তৈরি করতে পারলে ফুটবল উন্নয়ন আর বিচ্ছিন্ন প্রকল্প থাকবে না, হয়ে উঠবে ধারাবাহিক জাতীয় ব্যবস্থা।

বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ আজকের জাতীয় দলের ফলাফলে নির্ধারিত হবে না। নির্ধারিত হবে আগামীকাল স্কুলের মাঠে যে শিশুটি প্রথমবার বল পায়ে নেবে, তার জন্য আমরা কী ব্যবস্থা তৈরি করছি, তার ওপর।

লেখক : অনলাইন নিউজ এডিটর,  দৈনিক ডেল্টা টাইমস।

ডেল্টা টাইমস/মোহাম্মদ ইয়ামিন/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ