স্মার্টফোনেকে হ্যাকারদের ফাঁদ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার কৌশল

জাহিদুল ইসলাম

মতামত

আমাদের স্মার্টফোনটি আমরা সারাক্ষণ অফিসিয়াল অথবা ব্যক্তিগত কোনো না কোনো কাজে ব্যবহার করে থাকি। এই স্মার্টফোনে আমাদের ব্যক্তিগত

2026-09-14T16:22:33+06:00
2026-09-15T10:16:05+06:00
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩

স্মার্টফোনেকে হ্যাকারদের ফাঁদ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার কৌশল
জাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:২২ পিএম  আপডেট: ১৫.০৯.২০২৬ ১০:১৬ এএম  (ভিজিট : ২৪)

আমাদের স্মার্টফোনটি আমরা সারাক্ষণ অফিসিয়াল অথবা ব্যক্তিগত কোনো না কোনো কাজে ব্যবহার করে থাকি। এই স্মার্টফোনে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি অনেক অফিসিয়াল তথ্যও সংরক্ষিত থাকে। আমরা আমাদের ব্যাংকের তথ্য, ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও সহ বিভিন্ন ধরনের জরুরী ফাইল আমাদের স্মার্টফোনে এবং  স্মার্টফোনের  জিমেইলের মধ্যে সংরক্ষণ করে রাখি। আর এখানেই ফাঁদ পেতে থাকে হ্যাকাররা। এই হ্যাকাররা আমাদের অসচেতনতা এবং অসাবধানতাকে কাজে লাগিয়ে যে কোনো মুহূর্তে আমাদের স্মার্টফোন থেকে সমস্ত তথ্য হ্যাক করে নিতে পারে। প্রতিনিয়তই হ্যাকাররা নানাভাবে বিভিন্ন ধরনের স্মার্টফোন থেকে তথ্য হ্যাক করছে। হ্যাকাররা নানা পন্থায় বিভিন্ন ধরনের ম্যালওয়্যার, ফিশিং লিঙ্ক ঢুকিয়ে দিচ্ছে আমাদের স্মার্টফোনের ভিতরে। এভাবে তারা আমাদের স্মার্ট ফোন থেকে বিভিন্ন ব্যক্তিগত এবং গুরুত্বপূর্ণ অফিসিয়াল তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। 

এসব তথ্য কখনো ডার্ক ওয়েবে বিক্রি করছে আবার কখনো ব্যবহারকারীকে ব্ল্যাকমেইলের কাজে ব্যবহার করছে। স্মার্টফোনে নতুন কোনো অ্যাপ ডাউনলোড করার সময় আমরা অনেকেই গুগল প্লে স্টোরের বদলে বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে অ্যাপ নামিয়ে নেই। আর এই অভ্যাসই এখন বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্মার্টফোনে অ্যাপ ডাউনলোডের ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতা ডেকে আনতে পারে চরম বিপর্যয়। তাই অ্যাপ ইনস্টলের আগে হ্যাকারদের নতুন ফাঁদ থেকে সাবধানে থাকতে হলে আমাদের আরও অনেক বেশি সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের এই  অসচেতনতাকে কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা ভুয়া মেসেজ, ব্রাউজার বা অচেনা লিংকের মাধ্যমে ক্ষতিকারক এপিকে ফাইল ও ক্লোন অ্যাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে। হ্যাকারদের প্রধান ফাঁদসমূহ হচ্ছে ফিশিং লিংক ও ফেক মেসেজ। ফিশিং লিংক হলো এক ধরণের প্রতারণামূলক ইন্টারনেট ঠিকানা বা ইউআরএল, যা ব্যবহারকারীকে কোনো নকল বা ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়। অপরদিকে লটারি জেতা বা জরুরি অ্যাকাউন্টের তথ্য আপডেটের লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন ফেক মেসেজ বা ইমেইলে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর লিংক পাঠানো হয়। এসব লিংকে ক্লিন করলে অথবা অ্যাপ ইনস্টল করলেই  ফোনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় হ্যাকারদের হাতে, যার ফলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি ও ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হতে পারে। 

হ্যাকাররা প্রথমে হুবহু আসল অ্যাপের মতো দেখতে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে। এরপর বিভিন্ন লোভনীয় অফার দিয়ে অথবা কৌশলে ব্যবহারকারীদের সেখান থেকে গুগল ক্রোম কিংবা টিকটক অ্যাপের ফাইল ডাউনলোড করতে প্রলুব্ধ করে থাকে। সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়তই নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে ব্যবহারকারীদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে। তাই অ্যাপ ডাউনলোডের ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতাও আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংক হিসাব এবং ডিজিটাল সম্পদকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এছাড়াও ফ্রি বা উন্মুক্ত পাবলিক ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হ্যাকাররা ফোনের ডাটা আড়ি পেতে চুরি করতে পারে। এদিকে হ্যাকাররা স্মার্টফোন হ্যাক করার জন্য অপরিচিত অ্যাপ ও ম্যালওয়্যার পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। যার ফলে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোরের বাইরে কোনো থার্ড-পার্টি বা অজানা উৎস থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করলে ফোনে স্পাইওয়্যার ঢুকে যেতে পারে। আবার সিম সোয়াপিংয়ের মাধ্যমে হ্যাকাররা মোবাইল অপারেটরকে ধোঁকা দিয়ে আমাদের নম্বরের আরেকটি ক্লোন সিম তুলে ওটিপি ও ব্যাংকিং পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ খোঁজে। অপরদিকে ব্লুটুথ হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অননুমোদিত বা সবসময় অন থাকা ব্লুটুথ সংযোগ ব্যবহার করে কাছাকাছি থাকা হ্যাকাররা ডিভাইসে প্রবেশ করতে পারে। হ্যাকারদের ফাঁদে পা দিলে ফোনে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। 

যেমন- হঠাৎ করে ফোনের ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া। ফোন অতিরিক্ত গরম হওয়া এবং গতি ধীর হয়ে যাওয়া। স্মার্টফোন ব্যবহার না করলেও মোবাইল ডাটা বা ইন্টারনেট খরচ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া। স্ক্রিনে অনাকাঙ্ক্ষিত পপ-আপ বিজ্ঞাপন বা অচেনা অ্যাপের উপস্থিতি বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। অ্যান্ড্রয়েড ফোনে নতুন অ্যাপ ইনস্টল করার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো শুধু অফিসিয়াল অ্যাপ স্টোর ব্যবহার করা। অর্থাৎ গুগল প্লে স্টোর ছাড়া অন্য কোনো ওয়েবসাইট থেকে অ্যাপ ডাউনলোড না করাই উত্তম। স্মার্টফোনে হ্যাকারদের ফাঁদ থেকে নিজেদেরকে সুরক্ষিত রাখতে সচেতন ভাবে মাঝে মাঝে যাচাই করতে হবে যে,  ফোনে ‘গুগল প্লে প্রোটেক্ট’ চালু আছে কি না। আবার সন্দেহজনক কোনো পপ-আপ বা নিরাপত্তা সতর্কবার্তা দেখলে যাচাই ছাড়া অনুমতি না দেয়াই ভালো। প্রয়োজনে সতর্কতা হিসেবে নির্ভরযোগ্য অ্যান্ড্রয়েড অ্যান্টিভাইরাস অ্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে। আরেকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহার করার সময় অস্বাভাবিক কোনো আচরণ দেখলে দ্রুত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করতে হবে এবং  ব্যাংকিংয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট  প্রযুক্তি ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা প্রদানকারীদের অবগত করতে হবে। স্মার্টফোনকে সুরক্ষিত রাখতে অ্যান্ড্রয়েড বা আইওএস অপারেটিং সিস্টেম এবং ফোনে থাকা সব অ্যাপ সবসময় আপডেট রাখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ব্যাংকিং অ্যাপে সাধারণ পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন সচল থাকে হবে। বাইরে জরুরি প্রয়োজনে পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই একটি ভালো মানের ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে হবে। অ্যাপ পারমিশন চেক করা অর্থাৎ কোনো অ্যাপ ইনস্টল করার পর সেটি গ্যালারি, কন্টাক্ট বা মাইক্রোফোনের অপ্রয়োজনীয় পারমিশন বা অনুমতি চাচ্ছে কি না তা নিয়মিত যাচাই করতে হবে। এছাড়াও ফোন রিস্টার্ট করেও কিন্তু স্মার্টফোন হ্যাকারদের থেকে সুরক্ষিত রাখা যায়। সপ্তাহে অন্তত একবার ফোন রিস্টার্ট করা উচিত। এর ফলে যে ভাইরাস রয়েছে বা ম্যালিসিয়াস সফটওয়্যার চলছে তা বন্ধ হয়ে যাবে। 

এভাবে হ্যাকিং বা ফিশিংয়ের হাত থেকে কিছুটা বাঁচার সম্ভাবনা থাকে। যদিও শুধু রিস্টার্ট করলেই হবে না, তার সঙ্গে আরও কিছু বিষয় মেনে চলতে হবে। এদিকে ফোন রিস্টার্ট করার আরও বেশ কিছু সুবিধাও আছে। 

যেমন- ফোনের গতি বাড়ে। ফোন হ্যাং হওয়ার সমস্যার সমাধান হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস থেকে দূরে রাখা সম্ভব হয় । তাই সপ্তাহে অন্তত ২-৩ বার স্মার্টফোনটিকে রিস্টার্ট দেওয়া উত্তম। স্মার্টফোন হ্যাকারদের ফাঁদ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার সাধারণ নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে। 

লেখক: নেটওয়ার্ক টেকনিশিয়ান (আইসিটি সেল) 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। 


ডেল্টা টাইমস /জাহিদুল ইসলাম /সিআর/এনজিটি








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ