১৪৫৩ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সি মুসলিম সেনাপতি মুহাম্মদ কর্তৃক কনস্টান্টিনোপল বা ইস্তাম্বুল বিজিত হয়ে তা মুসলমানদের হাতে আসে। বিজয়ী সেনাপতি মুহাম্মদ একটি সাদা ঘোড়া চড়ে নগরীতে প্রবেশ করেন। এর ঠিক ৪৬৬ বছর পরে ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি-তুরস্ক জোট পরাজিত হলে ফরাসি বাহিনীর জেনারেল ফ্রান্সেট ডি এস্পেরে সেই ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে একটি সাদা ঘোড়া চড়ে ইস্তাম্বুল শহরে প্রবেশের মাধ্যমে প্রায় ১৩০০ বছরের ইসলামি খেলাফতের বিদায়ের বিরহী সুর বাজতে শুরু করে। পরবর্তীতে ১৯১৬ সালে কুখ্যাত সাইকস-পিকো চুক্তির বলেই বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটেন আর ফ্রান্স একটি অখণ্ড আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বদলে পুরো আরব ভূখণ্ডকে কয়েক টুকরে বিভক্ত করে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।
জার্মান দার্শনিক হেগেল বলেছিলেন, সমাজ এগিয়ে যায় দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে: এক “থিসিস” এর মুখোমুখি হয় “এন্টিথিসিস” এবং উভয়ের সংঘাতে জন্ম নেয় “সিনথেসিস”। তুরস্কের বর্তমান ধর্ম-রাষ্ট্র-দ্বন্দ্বও যেন এক হেগেলীয় নাটক। একদিকে সেকুলার অবকাঠামো-সামরিক, শিক্ষাব্যবস্থা, কূটনীতি। অন্যদিকে, ইসলামী আবেগ, ঐতিহ্য এবং নেতৃত্বের ভাষা। এই দ্বন্দ্বের সিনথেসিস হলো এমন এক পরিচয়, যেখানে রাষ্ট্র কাঠামো পাশ্চাত্য, কিন্তু নেতৃত্ব ধর্মীয় ভাবসম্পন্ন। তুরস্ক ইসলামি আবেগকে অস্বীকার করছে না, বলা যায় সেটা ব্যবহার করছে। বহু মানুষ একে খেলাফতের পূর্বাভাস ভাবলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। আয়াসোফিয়াকে পুনরায় মসজিদ ঘোষণা করা কিংবা ফিলিস্তিন নিয়ে বলিষ্ঠ ভাষণ দেওয়া এগুলো যেমন আবেগ জাগায়, তেমনি প্রশ্ন তোলে: ন্যাটোর সদস্য হয়ে ইসলামী দেশগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ কী খেলাফতের স্বপ্ন? পশ্চিমা অর্থনৈতিক নীতিতে সম্পৃক্ত থেকে, ইউরোপীয় কূটনীতিক মঞ্চে জায়গা করে নিতে চাওয়া কী ইসলামী আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন?
তুরস্ক এখনো দ্বিধাগ্রস্থ। আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয় নি। ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের পর, নতুন শতকে সেই পরিচয় পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে-তবে তা পরিষ্কার নয়। দ্বান্দ্বিক এবং অনেকটা পশ্চিমা ছাঁচে ঢালাই করা। তুরষ্ক আজ যেন আয়নার সামনে দাঁড়ানো এক চরিত্র, যে নিজের মুখখানা চিনতে পারছে না- না সে খেলাফতের উত্তরসূরী, না একেবারে পাশ্চাত্য! এই দ্বিচারিতা, যেখানে মসজিদেও যায়, আবার ন্যাটোর গুলিও চালায়। মুসলিম বিশ্বে এ কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়: আমরা কাকে অনুসরণ করবো- মুখের ইসলামী ভাষা, না বাস্তব কর্মনীতি? এই দ্বন্দ্বের সমাধান একমাত্র সম্ভব সত্যিকারের আত্মপরিচয় ও অনৈতিক সাহসে- যা কেবল খেলাফতের খালি নামে নয়, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়, মুসলিম উম্মাহর ঐক্যে এবং দাসত্বের সকল শৃংখল ছেড়ে ইসলামের বিজয়ে নিহিত।
১৯২৪ সাল, মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণ। সেই বছর মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক বিলুপ্ত করেন খেলাফত। প্রায় ১৩০০ বছরের দীর্ঘ একটি ধারার পরিসমাপ্তি ঘটে। এককালের ইসলামী সমাজ, সাম্রাজ্য পরিণত হয় ইউরোপীয় রাষ্ট্র কাঠামোয়। সেইসঙ্গে তিনি আরোপ করেন এক নতুন জাতীয় পরিচয়- তুর্কীয় জাতীয়তাবাদ। ইসলামী ঐতিহ্য, শরিয়া এবং আরবি অক্ষর পর্যন্ত বাদ দিয়ে, পাশ্চাত্য জীবনধারা ও ফরাসি ধাঁছের ধর্মনিরপেক্ষতা চাপিয়ে দেন গোটা জাতির উপর। এতদিন যে জাতি ছিল খেলাফতের সেবক, এখন তারা নিজেদের দেখে খ্রিস্টান ইউরোপের প্রতিচ্ছবিতে। ১৯২৬ সালে ওসমানীয় পোশাক হিজাব ও ফেজটুপি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ১৯৩৩ সালের জানুয়ারি মাসে আজান দেওয়ার সময় মুয়াজ্জিনরা আরবিতে আল্লাহু আকবর বলার পরিবর্তে বাক্যটির তুর্কি অনুবাদ “তানরি উলুদূর” বলার আইনজারী করেন। তুর্কির পরিবর্তে আরবিতে আজান দেওয়ার অপরাধে ৬০ জন মুয়াজ্জিনকে কারাগারে আটক রাখেন। মসজিদকে জাদুঘর আর কোরআনেরচর্চা সীমিত হয়ে পড়ে আড়ালে। রাষ্ট্রের উপর ইসলাম শুধু পরিত্যক্তই নয় আইনানুগ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এ সময় তুরস্কের কিছু বুদ্ধিজীবী (বিশেষকরে আবেলিয়া শিবলি ও নামিক কামাল) সমাজের পশ্চাৎপদতার কারণ নিয়ে লেখালেখি করেছেন। তাদেরর সাহিত্য ও লেখালেখির মধ্যে ইউরোপীয় চিন্তাভাবনা ও দর্শনের প্রভাব সুস্পষ্ট। তাদের মধ্যে অনেকেই এমন ছিলেন যারা তুরস্কের পিছিয়ে পড়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, ইউরোপের কাছে নিজেদের রাজ্য হারানো ও বারবার পরাজিত হওয়ার কারণ হিসেবে নিজেদের ইসলামি ধাঁচের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকেই দায়ী করেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিয়োজিত তুর্কি রাষ্ট্রদূতরা নিজ দেশের সরকারের কাছে প্রেরিত চিঠিপত্র, গোপন প্রতিবেদনে যে সুপারিশগুলো করেছেন, সেসবের মধ্যেও সেই একই ধরনের প্রভাব লক্ষণীয়।
২০০০ এর দশকে রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান ও তার একে পার্টির উত্থান যেন আতাতুর্ক নতুন যুগের ঘোষণা দেয়। ইসলামী প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে জনসমর্থন লাভ করে তারা দীর্ঘ সামরিক শাসন ও সেকুলার দমনীতির প্রতিক্রিয়ায় তুর্কিরা ফিরে চায় এক চেনা পরিচয়ে ইসলাম। এরদোয়ানের শুরুর সময়কার কিছু পদক্ষেপ যেমন- হিজাব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, কুরআনের শিক্ষা উন্মুক্তকরণ, আরবী শব্দগুলি ফিরিয়া আনা, মদে অতিরিক্ত শুল্ক- একপ্রকার ইসলামী চেতনার স্ফুলিঙ্গ জ্বালায়। কিন্তু এই চেতনা কী সত্যিই ইসলামী? এরদোয়ানের রাজনৈতিক প্রকল্পের চরিত্র অনেকটাই ভিন্ন। ২০০২ সালে তাঁর নেতৃত্বাধীন AKP ক্ষমতায় আসার পর তুরস্কের রক্ষণশীল ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে অধিক প্রতিনিধিত্ব লাভ করে। বিশেষকরে—হিজাবের ওপর পূর্ববর্তী বিধিনিষেধ শিথিল;ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব বৃদ্ধি;Diyanet-এর প্রভাব বৃদ্ধি;জনপরিসরে ইসলামি প্রতীকের দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি;অটোমান ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পুনর্মূল্যায়ন;রক্ষণশীল পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর অধিক গুরুত্ব। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এরদোয়ান তুরস্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন নি। তুরস্কের সংবিধানে রাষ্ট্র এখনো ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র।তাই এরদোয়ানের মডেলকে সরাসরি ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ বলা রাজনৈতিকভাবে অতিসরলীকরণ হবে।
অন্যদিকে, আতাতুর্ক যে সেকুলার কাঠামো তৈরি করেছিলেন, তা এখনও বহাল। যদিও নেতৃত্বে একজন ধার্মিক নেতা, কিন্তু পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র এখনো ইউরোপীয় ধাঁচের। বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, রাজনীতি এমনকি সেনাবাহিনী পর্যন্ত গভীরভাবে প্রভাবিত পশ্চিমা ধারণায়। তারা আবার হয়েছে ন্যাটোর অংশ। এরদোয়ান যখন ফিলিস্তিন নিয়ে সংহতি জানান, সেই একই সময় তিনি ন্যাটোর সদস্য থেকে সিরিয়ার মুসলিমদের বোমা হামলায় অংশগ্রহণ করেন। আমেরিকান ঘাঁটিগুলো আজও তুরস্কে বহাল। সিরিয়ায় কুর্দি দমনের নামে যে অভিযান পরিচালিত হয়, তাতে বহু নিরীহ মুসলিমের মৃত্যু ঘটে। তুরস্কের ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা দেয়: ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সরিয়ে দিলেই ধর্ম রাজনীতি থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় না। আবার ধর্মীয় মূল্যবোধ সমাজে শক্তিশালী হলেই একটি রাষ্ট্র অনিবার্যভাবে ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয় না। তাই তুরস্ককে বুঝতে হলে শুধু তার বর্তমান রাজনীতি দেখলে হবে না; ফিরে তাকাতে হবে এক শতাব্দী পেছনে। একদিকে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক—যিনি অটোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি আধুনিক, জাতীয়তাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র নির্মাণ করেছিলেন। অন্যদিকে রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান—যিনি নির্বাচনী রাজনীতির মধ্য দিয়ে সেই রাষ্ট্রের সামাজিক ও আদর্শিক চরিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন। একজনের তুরস্কে রাষ্ট্র সমাজকে আধুনিক করার দায়িত্ব নিয়েছিল; অন্যজনের তুরস্কে সমাজের ধর্মীয় ও রক্ষণশীল পরিচয় রাষ্ট্রের চরিত্রকে নতুনভাবে প্রভাবিত করেছে। এই দুই তুরস্কের তুলনা তাই কেবল দুই নেতার তুলনা নয়; এটি আধুনিক তুরস্কের আত্মপরিচয়ের এক শতাব্দীর দ্বন্দ্বের ইতিহাস।
তুরস্কের শতবর্ষের অভিজ্ঞতা মূলত রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ককে পুনর্নির্ধারণের একটি দীর্ঘ সংগ্রাম। আতাতুর্ক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নির্মাণ করেছিলেন; কিন্তু সেই রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল সক্রিয় ও নিয়ন্ত্রণমূলক। পরবর্তী সময়ে সামাজিক পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও ইসলামি পরিচয়ের পুনরুত্থান সেই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে। গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—তুর্কি ধর্মনিরপেক্ষতা বা laiklik এবং ইসলামপন্থী রাজনীতিকে পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত হিসেবে দেখলে বাস্তবতা ধরা পড়ে না; বরং তারা পরস্পরের বিকাশকে প্রভাবিত করেছে।সুতরাং ‘ইসলামি অনুশাসন বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’ আসলে তুরস্কে একটি গভীরতর প্রশ্নের প্রকাশ—আধুনিক রাষ্ট্র কী ধর্মকে নিয়ন্ত্রণ করবে, ধর্ম থেকে নিরপেক্ষ থাকবে, নাকি ধর্মীয় নাগরিকদের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে একটি বহুত্ববাদী রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করবে?তুরস্কের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে এই প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দেওয়া হয় তার ওপর।
লেখক: প্রভাষক, সরকারি ইস্পাহানী ডিগ্রি কলেজ, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।
ডেল্টা টাইমস্/ইলিয়াজ হোসেন রানা/সিআর/এমই