অদৃশ্য শিকল, দৃশ্যমান নারী

সাবিহা তারান্নুম মিম

মতামত

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে নারীরা পেরিয়ে এসেছে চার দেয়ালের গণ্ডি। নারীরা এখন আর ঘরে বসে নেই; শিল্প থেকে

2026-09-13T16:26:27+06:00
2026-09-13T16:34:32+06:00
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩

অদৃশ্য শিকল, দৃশ্যমান নারী
সাবিহা তারান্নুম মিম
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:২৬ পিএম  আপডেট: ১৩.০৯.২০২৬ ৪:৩৪ পিএম  (ভিজিট : ৪)
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে নারীরা পেরিয়ে এসেছে চার দেয়ালের গণ্ডি। নারীরা এখন আর ঘরে বসে নেই; শিল্প থেকে করপোরেট বোর্ড, শ্রেণিকক্ষ থেকে প্রশাসন এবং দেশ পরিচালনায় রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আজ দৃশ্যমান। অথচ ঘরের বাইরে পা রাখতেই রাজপথ, গণপরিবহন, কর্মক্ষেত্র কিংবা ডিজিটাল পরিসরে নারীদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে নানা সমস্যার। প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে অদৃশ্য এক আতঙ্কের বিরুদ্ধে। নিরাপত্তাহীনতা তাই নারীর অগ্রযাত্রার পথে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথমত, প্রতিদিন গণপরিবহনে বা রাস্তায় চলাচলের সময় নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকতে হয় নারীদের, যা নারীশক্তির পূর্ণ উন্মোচনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভিড়ের সুযোগে হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য কিংবা শারীরিক লাঞ্ছনা—এসব প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা, যা নারীর স্বাভাবিক চলাচলকে বাধাগ্রস্ত করে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, পরিবহন, চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাংলাদেশের নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অন্যতম প্রধান বাধা। তাই নারীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরাপদ ও নারীবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

দ্বিতীয়ত, গণপরিবহন বা রাস্তায় নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই চলবে না, বরং এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও সামগ্রিক সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনও প্রয়োজন। নারীর পোশাক বা শারীরিক গঠন নিয়ে বিচার করার প্রবণতা আজও সমাজে লক্ষণীয়। নিজের দৃষ্টি ও আচরণ সংযত রাখার বদলে নারীকেই দায়ী করা—এটিও সেই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতারই একটি রূপ। এই মানসিকতার প্রভাব দেখা যায় পরিবারের ভেতরেও, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত গুরুতর একটি সমস্যা। ২০২৪ সালে পরিচালিত নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা বিষয়ক এক জরিপের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালে। সেই জরিপ অনুযায়ী, জীবদ্দশায় প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। আরও উদ্বেগের বিষয়, শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার প্রায় ৬৪ শতাংশ নারী ঘটনাটি প্রকাশই করেননি। গত এক বছরে বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হয়েছেন প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী। অর্থাৎ নারীর নিরাপত্তাহীনতা কেবল রাজপথের সমস্যা নয়, এটি লক্ষণীয় তাদের ঘরের জীবনেও।

তৃতীয়ত, ভয় ও লজ্জার সংস্কৃতি নারীদের পিছিয়ে দিচ্ছে। প্রতিটি নারীই জীবনে কোনো না কোনো সময় অশালীন মন্তব্যের সম্মুখীন হয়েছেন, অথচ সামাজিক চাপ, অপমানের ভয় কিংবা বিচারহীনতার আশঙ্কায় প্রতিবাদ করা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে ওঠে। এই নীরবতা নারীর নিজস্ব সত্তাকে দুর্বল করে দেয় এবং তাকে আবার আবদ্ধ করে ফেলে চার দেয়ালে। যে পুরুষ নারীর পোশাক বা শারীরিক গঠন নিয়ে বিচার করেন, তিনি নিজের দৃষ্টি সংযত রাখার প্রয়োজনীয়তাই বোঝেন না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সৃষ্টির শুরু থেকেই নারীরা নির্যাতিত ও অবহেলিত; এই নিপীড়িত নারীর আর্তনাদ প্রায়ই থেকে যায় চার দেয়ালে বন্দি, আর তার স্বাধীনতা বাঁধা থাকে নির্দিষ্ট এক গণ্ডিতে। সময় বদলেছে, যুগ বদলেছে—কিন্তু বদলায়নি নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি; বদলেছে শুধু নির্যাতনের ধরন ও অবহেলার রূপ। অথচ নারী কেবল মমতাময়ী নন, প্রয়োজনে কঠোর ও প্রতিবাদীও হয়ে উঠতে পারেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো আজ সময়ের দাবি।

নারীর প্রতি নির্মমতা বা শারীরিক লাঞ্ছনা প্রায়ই শুরু হয় পরিবার থেকেই। যাদের কাছে নারী ও শিশুর নিরাপদ থাকার কথা, বহু ক্ষেত্রে তাদের হাতেই ঘটে নির্যাতন ও নিপীড়ন। নারীবিদ্বেষী মানসিকতা, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ—এসবই এই নিপীড়নের মূল কারণ। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে যুগের পর যুগ অসংখ্য মানুষ প্রতিবাদ ও সংগ্রাম করেছেন, তবু সামগ্রিক পরিস্থিতির বদল ঘটেনি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকট সমাধানযোগ্য। ইতিমধ্যে নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস, মেট্রোরেলে নির্ধারিত কোচ, জরুরি হেল্পলাইন ৯৯৯ এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা কার্যকর হয়েছে। তবে আইনের পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক জাগরণ। এজন্য দরকার একটি সমন্বিত উদ্যোগ—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শ্রদ্ধা ও সম্মতির শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, গণপরিবহনে সিসিটিভি ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, হয়রানির ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং পরিবার থেকে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত নারীর প্রতি সংবেদনশীল আচরণ গড়ে তোলা।

ঢাকায় মেট্রোরেলের নারী-নির্ধারিত কোচের আদলে প্রতিটি গণপরিবহনে আলাদা আসন, পর্যাপ্ত আলো, সিসিটিভি এবং ৯৯৯ হেল্পলাইনের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নারী চালক ও কন্ডাক্টর নিয়োগ বাড়ালে নিরাপত্তাবোধ আরও বাড়বে। শ্রদ্ধা ও সম্মতির শিক্ষা শুরু হতে হবে পরিবার থেকেই, আর স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে যুক্ত করতে হবে জেন্ডার সংবেদনশীলতা ও আত্মরক্ষা বিষয়ক প্রশিক্ষণ। ভুক্তভোগী যেন সহজে অভিযোগ করতে পারেন, সেজন্য প্রতিটি থানা ও কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় থাকা প্রয়োজন নারী সহায়তা ডেস্ক ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কমলে অপরাধীর মনে ভয় তৈরি হবে। কর্পোরেট অফিস ও শিল্পকারখানায় নারীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত, ডে-কেয়ার, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং অভিযোগের গোপনীয়তা রক্ষার ব্যবস্থা থাকলে নারী চার দেয়ালের বাইরে নেতৃত্বে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন।

ভয় ও লজ্জার সংস্কৃতি ভেঙে প্রতিবাদের সাহস গড়ে তুলতে হবে। আত্মবিশ্বাস এবং প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার—যেমন লোকেশন শেয়ারিং, সেইফটি অ্যাপ এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা—নারীকে শুধু নিরাপদই নয়, দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিতও করবে। এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং নারীশক্তির পূর্ণ উন্মোচনে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে।

দেশের নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল নারী অধিকার রক্ষার বিষয় নয়, বরং তা একটি দেশের সামাজিক অগ্রগতি, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও মানবিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। নারীরা শিক্ষা, প্রতিভা ও দক্ষতা বিকাশের পূর্ণ সুযোগ পেলে তারাই নেতৃত্ব দেবেন জাতির অগ্রযাত্রা বিনির্মাণে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই উন্মেষিত হবে নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

                                                                                                     লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ


ডেল্টা টাইমস/সাবিহা তারান্নুম মিম /সিআর/এনজিটি








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ