পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি দুর্নীতি রয়েছে। লোভ ও অতিরিক্ত ভোগের আকাক্সক্ষা থেকেই দুর্নীতির উৎপত্তি হয়। সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকারি দায়িত্ব পালনের বিধিবিধান ও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে কাউকে কোনো সুবিধা দেওয়া হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি শুধু সরকারি অফিসে সীমাবদ্ধ নেই। সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে। শুধু অভাবের তাড়নায় মানুষ দুর্নীতি করে এটি সত্য নয়। বিত্তশালী কর্মকর্তা বা ব্যক্তি আরো অর্থ-সম্পদের জন্য দুর্নীতি করে। মানুষের মধ্যে নীতিনৈতিকতার ঘাটতি হলেই দুর্নীতি জেঁকে বসে।একই সঙ্গে রয়েছে মিথ্যাচার, প্রতারণা, পরনিন্দা, স্বার্থপরতা, পরশ্রীকাতরতা ও অসততার দুর্নাম। এ ছাড়া লোকমুখে যেসব অভিযোগ সচরাচর শোনা যায় সেগুলো হলো সরকারি অফিসে তদবির না করলে কাজ হয় না। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা অতিমুনাফাখোর, বিশেষ বিশেষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় কোনো কার্যোপলক্ষে টাকা না দিলে ন্যায্য কাজ তো হবেই না, বরং অহেতুক হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়। দেশে দুর্নীতির ব্যাপ্তি দেখে স্বাভাবিকভাবেই ধারণা হতে পারে, আমাদের গোড়ায় গলদ রয়েছে। আমরা বিদেশি ঔপনিবেশিক শাসন, স্বৈরাচার, একনায়ক কর্তৃক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শাসিত হয়েছি। নীতিনৈতিকতার শিক্ষায় আমাদের রয়েছে বিরাট ঘাটতি। কী পরিবার, কী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কী সমাজ-কোথাও সততা ও নীতিনৈতিকতাকে এক নম্বর অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। এমনকি ব্যবসা-বাণিজ্যে ওজনে কম দেওয়া, খাদ্য ও ব্যবহৃত দ্রব্যাদিতে ভেজাল দেওয়া, কর ও ভ্যাট ফাঁকি তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সঠিকভাবে পাঠদান না করানো, হাসপাতালে অতিরিক্ত ফি আদায় বা অপ্রয়োজনীয় ও ভুল চিকিৎসা, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ব্যাংকঋণ গ্রহণ, মানি লন্ডারিং করে বিদেশে অর্থ প্রেরণ প্রভৃতি অন্যায়-অপরাধের কথা হরহামেশাই শোনা যায়।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাউকে লাভবান এবং কারো ক্ষতি করা, কোর্ট বা যেকোনো তদন্তে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রভৃতি আরো উচ্চমানের দুর্নীতি। আমাদের দেশের দুর্নীতির ধরন অনেকটা ছোঁয়াচে রোগের মতো। একজনের মধ্য থেকে অন্যজনের মধ্যেও সংক্রমিত হচ্ছে। বিশেষ করে সামর্থ্যবান, ধনী, শিক্ষিত, ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনুসরণে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষমতাবান, কম শিক্ষিত লোকরাও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে ওঠে। আবার কোথাও দুর্নীতি হয় সময় ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। কোনো ব্যক্তি বা চাকরিজীবী স্বাভাবিক অবস্থায় দুর্নীতি না করলেও সুযোগ পেলে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে, অর্থাৎ পারিপার্শ্বিক ও পরিবেশের কারণেও মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়। প্রভাবশালীরা দুর্নীতি করে যদি পার পেয়ে যায় তবে অন্যরাও দুর্নীতি করবে।আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশন তেমন কার্যকর নয়। কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। তবে সত্য কথা হলো, দুদকের পক্ষে সারা দেশের সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব নয়। তা ছাড়া সারা দেশের দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণও দুদকের কাছে নেই। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতির অনুসন্ধানের জন্য ১৯৫৩ সালে দুর্নীতি দমন ব্যুরো সৃষ্টি হলেও পরবর্তী সময়ে কমিশনের জন্য প্রণীত আইনে দুদকের অধিক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় জনবল ও অফিস বিস্তৃতি হয়নি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকলেই কেবল দুদক কাজ করতে পারে। দুর্নীতির কারণে মানুষের নীতিনৈতিকতা নষ্ট হয়।শুধু তাই নয়, দুর্নীতি দেশের সামাজিক পরিবেশ, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি নষ্ট করে। দেশে বৈষম্য বাড়ে। সব ক্ষেত্রে ক্ষমতাশালীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে আমজনতা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি সরকারি চাকুরেদের উচ্চপদে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি প্রভৃতিতে অন্য কোনো বিষয়ে প্রাধান্য বাদ দিয়ে সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠার মূল্যায়ন করতে হবে।
সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। তাদের জনগণ ও স্টেকহোল্ডারদের অভাব-অভিযোগ শুনে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর হতে হবে। চাকরির প্রথম দিকের প্রশিক্ষণগুলোতে সততা, নৈতিকতা, দেশপ্রেমের ওপর প্রাধান্য দিয়ে সিলেবাস প্রণয়ন করতে হবে। দেশের রাজনীতির ক্ষেত্রেও সন্ত্রাসী, লোভী ও অসৎ ব্যক্তিদের বয়কট করতে হবে। দেশে লাগামহীন দুর্নীতি যেমন হয়, তার বিপরীতে সৎ, দেশপ্রেমিক ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিরাও রয়েছেন। সমাজের ও দেশের জন্য তারা উদাহরণস্বরূপ ও অনুসরণযোগ্য। দেশ এগিয়ে যাওয়ার পেছনে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। গত ৫৫ বছরে আমাদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো, আমরা দুর্নীতি রোধ করতে পারিনি। দুর্নীতির পরিসর বেড়েছে। আগামীতে সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর করে তুলতে যোগ্যদের যথাস্থানে পদায়নের বিকল্প নেই। যেকোনো মূল্যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিহত করতে হবে। এর সঙ্গে সমাজের সর্বস্তরে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সৎ ও যোগ্যদের যথাস্থানে বসিয়ে তাদের সঙ্গে নিয়ে সরকারকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান নিতে হবে। জনগণকেও এ ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। আইন আছে কিন্ত আইনের বাস্তবায়ন নেই বলে মানুষ দুর্নীতি করার সুযোগ পায় এবং জনগণ তার আয়ের হিসাব বা করের তথ্য ঠিকভাবে দেয় না এবং এটা আদায়ে তেমন জোরদার ব্যবস্থা নেই। দুর্নীতি দমন করার মূল উপায়গুলো খতিয়ে দেখতে হবে। আইন সবার জন্য সমান হবে। কোনো রকম প্রভাব বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই অপরাধীদের বিচার করতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য থাকতে হবে-দুর্নীতি দমনে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে সেসব প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা থাকতে হবে। যেমন জাতীয় সংসদ, নির্বাচন কমিশন এবং দুদক যাদের ওপর দুর্নীতি দমনের দায়িত্ব রয়েছে, তাদের সব ধরনের প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে কাজ করতে হবে এবং সক্রিয় থাকতে হবে। তারা নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে থাকবে এবং কেউ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। জাতীয় সংসদের যে কমিটিগুলো রয়েছে সেগুলো নিজ নিজ ক্ষেত্রে সক্রিয় থাকবে এবং তাদের জবাবদিহি থাকতে হবে। সাধারণ মানুষকে রুখে দাঁড়াতে হবে-শুধু আইন প্রয়োগ করে বিচার করলে হবে না, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং এর প্রতিবাদ করতে হবে। তাদের এ বিষয়ে কথা বলতে হবে এবং সচেতন থাকতে হবে। দুর্নীতির যেকোনো তথ্য বা খবর প্রকাশ করার জন্য সোচ্চার এবং আন্তরিক হতে হবে। এগুলো মানলে দুর্নীতি দমন বা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এক্ষেত্রে আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে দুর্নীতি প্রতিহত করা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা উচিত। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানো যাবে না, বরং প্রতিহত করতে হবে এবং বাস্তবায়নে প্রত্যেক সেক্টরে জবাবদিহি বাধ্যতামূলক করতে হবে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। দুর্নীতি রোধ ও সুশাসনের জন্য যত রকম পন্থা আছে সেটা প্রয়োগ করতে হবে। এক কথায়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে শুদ্ধতা, নৈতিকতা, সত্যবাদিতা এবং স্বাভাবিক সততা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরী হয়ে পড়েছে।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।
ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই