শিক্ষককে হতে হয় জ্ঞানের বাহক, বিবেক জাগ্রত করার সহযাত্রী এবং মানুষ গড়ার কারিগর; কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচারক নয়। প্রকৃতপক্ষে একজন শিক্ষক কেবল একজন পেশাজীবী নন; তিনি একটি সভ্যতার ধারক ও বাহক। একটি প্রজন্ম তার শিক্ষকদের কাছ থেকে শুধু পাঠ্যবিষয়ের জ্ঞানই অর্জন করে না; তাদের কাছ থেকেই শেখে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে ভিন্নমতকে সম্মান করতে হয়, কীভাবে যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয় এবং কীভাবে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়াতে হয়। তাই একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত আচার-আচরণ, মূল্যবোধ, বৌদ্ধিক সততা ও পেশাগত নৈতিকতা শিক্ষার্থীদের ওপর পাঠ্যপুস্তকের চেয়েও অনেক গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষকের কাজ শিক্ষার্থীদের নিজের মতো করে গড়ে তোলা নয়; বরং তাদের নিজেদের মতো করে ভাবতে, বিচার করতে এবং নিজেদের বোধ ও বিবেকের আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে শেখানো। এই কারণেই শিক্ষকতার সঙ্গে সরাসরি রাজনীতি ও ক্ষমতার সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। শিক্ষক যখন নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানকে শিক্ষার্থীর স্বাধীন চিন্তার বিকাশে ব্যবহার করেন, তখন তিনি প্রকৃত অর্থে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু যখন সেই অবস্থান কোনো নির্দিষ্ট দল, মতাদর্শ বা গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত হয়, তখন শিক্ষকতার নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। শ্রেণিকক্ষ তখন আর মুক্ত সংলাপ ও অনুসন্ধানের জায়গা থাকে না; তা হয়ে উঠতে পারে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব ও প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র। অথচ শিক্ষার্থীর মনে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়। বরং তাকে এমন বৌদ্ধিক সক্ষমতা দেওয়া শিক্ষার উদ্দেশ্য, যার মাধ্যমে সে বিভিন্ন মত ও তথ্য-উপাত্ত বিচার-বিশ্লেষণ করে নিজের অবস্থান নিজেই নির্ধারণ করতে পারে।
মার্কিন দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ জন ডিউই (১৮৫৯–১৯৫২) শিক্ষা ও গণতন্ত্রের সম্পর্ককে অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর চিন্তায় শিক্ষা ছিল গণতান্ত্রিক জীবনচর্চার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কারণ গণতন্ত্র কেবল ভোট দেওয়ার একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়। এটি এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে মানুষ ভিন্নমত প্রকাশ করে, অন্যের মত শোনে, যুক্তি ও অভিজ্ঞতার আলোকে নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে এবং সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়। এই সংস্কৃতি গড়ে ওঠার প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য প্রয়োজন এমন শিক্ষক, যিনি চিন্তার স্বাধীনতাকে উৎসাহিত করবেন, মতের বৈচিত্র্যকে সম্মান করবেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তিবোধ, অনুসন্ধিৎসা ও সমালোচনামূলক চিন্তার সক্ষমতা বিকশিত করতে সহায়তা করবেন। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে সব বিষয়ে একমত হবেন এমন কোনো প্রয়োজন নেই। বরং শিক্ষার্থীর সঙ্গে মতভেদ থাকার মধ্য দিয়েও কীভাবে সম্মানজনক ও যুক্তিনির্ভর সংলাপ করা যায়, সেটিই তিনি শেখাবেন। তিনি শিক্ষার্থীকে বলবেন না কোন মতটি গ্রহণ করতে হবে; বরং শেখাবেন কীভাবে কোনো মতের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ খুঁজতে হয়, কীভাবে যুক্তির শক্তি ও দুর্বলতা শনাক্ত করতে হয় এবং কীভাবে নিজের পূর্বধারণাকেও প্রশ্ন করতে হয়। এই বৌদ্ধিক স্বাধীনতাই একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতে কেবল দক্ষ পেশাজীবী নয়, একজন বিবেকবান ও দায়িত্বশীল নাগরিকে পরিণত করে।
কিন্তু শিক্ষক যখন নিজেই দলীয় বিভাজনের সক্রিয় অংশ হয়ে ওঠেন এবং নিজের রাজনৈতিক পরিচয়কে পেশাগত পরিচয়ের ওপর প্রাধান্য দেন, তখন তিনি সচেতন বা অচেতনভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সেই বিভাজনের বীজ বপন করেন। বিশেষত শিক্ষক যদি মূল্যায়ন, আচরণ, সুযোগ প্রদান কিংবা দৈনন্দিন একাডেমিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত পরিচয়কে বিবেচনার মধ্যে আনেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের কাছে একটি বিপজ্জনক বার্তা পৌঁছে যায়। আর সেটা হলো যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, যুক্তির চেয়ে আনুগত্য শক্তিশালী এবং সত্যের চেয়ে ক্ষমতার নৈকট্য অধিক মূল্যবান। এমন অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক বিকাশকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফল হলো শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে পরিচয়ভিত্তিক অবস্থান গ্রহণে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। কোনো বিষয়ে তথ্য ও যুক্তি যাচাই করার আগে তারা জানতে চায় কে বলেছে, কোন পক্ষ বলেছে বা কোন পরিচয়ের মানুষ বলেছে। অথচ জ্ঞানের জগতে কোনো বক্তব্যের সত্যতা বক্তার রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে নির্ধারিত হয় না; তা নির্ধারিত হয় তার প্রমাণ, যুক্তি, পদ্ধতি ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে। এই মৌলিক বোধটি হারিয়ে গেলে শিক্ষার্থী স্বাধীন চিন্তার অধিকারী না হয়ে গোষ্ঠীগত পরিচয়ের বাহকে পরিণত হয়। সুতরাং শিক্ষককে রাজনীতিবিমুখ হতে হবে এ কথা বলা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি প্রয়োজনীয়ও নয়। কারণ একজন শিক্ষকও সমাজের একজন সচেতন নাগরিক এবং তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মত থাকতেই পারে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষ, একাডেমিক মূল্যায়ন ও শিক্ষাদানকে দলীয় আনুগত্যের প্রভাবমুক্ত রাখা তাঁর পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্ব। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাসের স্বাধীনতা যেমন একজন শিক্ষকের অধিকার, তেমনি শিক্ষার্থীর স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষক যদি এই সীমারেখাটি সচেতনভাবে রক্ষা করতে পারেন, তাহলেই শিক্ষাঙ্গন রাজনৈতিক বিভাজনের ক্ষেত্র না হয়ে গণতান্ত্রিক নাগরিকত্ব, মুক্তবুদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চার প্রকৃত বিদ্যালয়ে পরিণত হতে পারে।
গণতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা অপরিহার্য। কারণ তারাই ভবিষ্যতের নাগরিক, পেশাজীবী, নীতিনির্ধারক এবং নেতৃত্বের সম্ভাব্য ধারক। একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে কতটা সচেতন, যুক্তিনির্ভর, বাস্তববাদী এবং দায়িত্বশীল হয়ে উঠছে তার ওপর। তাই শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রের কাঠামো, সংবিধান, নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশ, অর্থনীতি, বৈষম্য, জননীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে জানার ও মতামত গঠনের সুযোগ থাকা জরুরি। শিক্ষার্থীরা যদি সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো নিয়ে চিন্তা না করে, তাহলে ভবিষ্যতের নাগরিক সমাজও দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে রাজনৈতিক সচেতনতা আর দলীয় সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক সচেতনতা মানুষকে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে জানতে, বিভিন্ন মত ও অবস্থানকে বুঝতে এবং নিজের বিবেক ও যুক্তির আলোকে মতামত গঠন করতে সাহায্য করে। পক্ষান্তরে দলীয় আনুগত্য অনেক সময় ব্যক্তির স্বাধীন বিচারবোধকে একটি নির্দিষ্ট সাংগঠনিক অবস্থানের অধীন করে ফেলে। একজন সচেতন শিক্ষার্থী একই সঙ্গে সরকারের কোনো নীতিকে সমর্থন করতে পারেন, আবার অন্য কোনো নীতির সমালোচনা করতে পারেন; কোনো রাজনৈতিক দলের একটি অবস্থানের সঙ্গে একমত হতে পারেন, আবার একই দলের অন্য কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও করতে পারেন। এই স্বাধীনতাই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সচেতনতার লক্ষণ। কারণ গণতন্ত্রে নাগরিকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর প্রতি নয়; মূল আনুগত্য হওয়া উচিত সংবিধান, আইন, ন্যায়, মানবিক মর্যাদা এবং জনকল্যাণের প্রতি।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই পার্থক্যটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রচলিত ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করা, নতুন ধারণা পরীক্ষা করা এবং বিকল্প ভবিষ্যৎ কল্পনা করার সুযোগ থাকার কথা। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান কিংবা ইতিহাসের শিক্ষার্থী যদি বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন করতে না পারে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্য কেবল কতজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করল তার মধ্যে নিহিত নয়। বরং কতজন শিক্ষার্থী সেখানে এসে নিজের চিন্তার সীমা অতিক্রম করতে শিখল, প্রচলিত ধারণাকে যুক্তির আলোকে পরীক্ষা করল এবং নতুন প্রশ্ন উত্থাপনের সাহস অর্জিত করল তার মধ্যেই এর প্রকৃত সাফল্য নিহিত। কিন্তু যখন শিক্ষাজীবনের প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে দলীয় আনুগত্য, তখন শিক্ষার মূল লক্ষ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন শিক্ষার্থীর মেধা, কৌতূহল, গবেষণার আগ্রহ কিংবা একাডেমিক পরিচয়ের চেয়ে তার রাজনৈতিক পরিচয় অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিবেশে মতভিন্নতা আর স্বাভাবিক বৌদ্ধিক বৈচিত্র্য হিসেবে বিবেচিত হয় না; বরং তা অনেক সময় শত্রুতা বা বিশ্বাসঘাতকতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজের প্রকৃত মত প্রকাশের পরিবর্তে নিরাপদ অবস্থান গ্রহণ করতে শেখে; আচরণে সততা প্রদর্শণের পরিবর্তে দ্বিচারিতার আশ্রয় নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে তারা যুক্তির চেয়ে গোষ্ঠীর অবস্থান অনুসরণ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সংস্কৃতি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ক্ষতি করে না; সামাজিক জীবনসহ ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ও নাগরিক জীবনেও এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় তাই কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় হবে প্রশ্ন করার জায়গা, বিতর্ক করার জায়গা, গবেষণা করার জায়গা এবং ভিন্নমতের সঙ্গে যুক্তিনির্ভর সংলাপে মেতে ওঠার জায়গা। সেখানে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নেই; বরং সব মতকে জ্ঞানতাত্ত্বিক ও নৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি করার মতো পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একজন শিক্ষার্থী চাইলে রাজনীতি করবেন, রাজনৈতিক সংগঠনে যুক্ত হবেন, কোনো দলের সমর্থক হবেন এটি তাঁর নাগরিক স্বাধীনতার অংশ। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী যেন দলীয় পরিচয়ের কারণে একাডেমিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, আবার দলীয় পরিচয়ের কারণে অন্যায্য সুবিধাও না পান এই নীতিগত ভারসাম্য নিশ্চিত করাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, ছাত্রসংগঠন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং একাডেমিক প্রশাসনের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব যখন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিকল্প কাঠামো তৈরি করে, তখন শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষার্থী তখন স্বাধীন নাগরিক হওয়ার পরিবর্তে কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রের অনুসারী হয়ে ওঠার প্রলোভনে পড়ে। এর বিপরীতে আমাদের প্রয়োজন এমন এক উচ্চশিক্ষার সংস্কৃতি, যেখানে রাজনৈতিক মত থাকবে, কিন্তু দলীয় দাসত্ব থাকবে না; বিতর্ক থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না; মতাদর্শ থাকবে, কিন্তু মতের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে না; এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থাকবে, কিন্তু একাডেমিক উৎকর্ষ ও নাগরিক মর্যাদার বিনিময়ে নয়। অতএব, শিক্ষার্থীদের রাজনীতিমুক্ত করা নয়, বরং তাদের দলীয় আনুগত্যের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত রেখে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। কারণ গণতন্ত্রের জন্য আমাদের প্রয়োজন শুধু ভোটার নয়, বিবেকবান নাগরিক; শুধু কর্মী নয়, স্বাধীনচিন্তার মানুষ; শুধু অনুসারী নয়, প্রশ্ন করতে সক্ষম নেতৃত্ব। আর সেই নাগরিক ও নেতৃত্ব গড়ে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো আমাদের শিক্ষাঙ্গন।
ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষ কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান অর্জন করবে না; বরং প্রকৃতির সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে এবং সর্বোপরি মানবতার সঙ্গে তার একটি গভীর ও সৃজনশীল সম্পর্ক গড়ে উঠবে। তাঁর শিক্ষাভাবনার কেন্দ্রে ছিল মানুষের সামগ্রিক বিকাশ তথা শরীর, মন, বুদ্ধি, নন্দনবোধ, সৃজনশীলতা ও নৈতিক চেতনার সমন্বিত বিকাশ। এই আদর্শকে বাস্তবে পরীক্ষা ও প্রয়োগ করার উদ্দেশ্যেই তিনি শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে তিনি এমন একটি শিক্ষাপরিবেশ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যেখানে প্রকৃতি হবে শিক্ষার সহচর, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হবে মানবিক ও সংলাপভিত্তিক এবং জ্ঞান হবে জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কোনো যান্ত্রিক কারখানায় পরিণত করতে চাননি, যেখানে একই ছাঁচে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে তৈরি করা হবে। তাঁর কাছে প্রত্যেক মানুষ ছিল স্বতন্ত্র সম্ভাবনার অধিকারী। তাই শিক্ষার কাজ হলো সেই সম্ভাবনাকে আবিষ্কার ও বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টি করা; একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে মানুষকে ঢেলে দেওয়া নয়। তিনি শিক্ষার মধ্যে আনন্দ, সৌন্দর্য, কৌতূহল, সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতার অবকাশ রাখতে চেয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষাদর্শের এই মানবিক দিকটি আজও আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক; বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন পরীক্ষার ফল, সনদ, চাকরির প্রতিযোগিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের চাপ শিক্ষার বৃহত্তর মানবিক উদ্দেশ্যকে অনেক সময় আড়াল করে ফেলে।
রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষা মানে ছিল মুক্তি। সেই মুক্তি শুধু অজ্ঞতা থেকে মুক্তি নয়, সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি; শুধু অশিক্ষা থেকে মুক্তি নয়, ভয় থেকে মুক্তি; শুধু কুসংস্কার থেকে মুক্তি নয়, অন্ধ আনুগত্য থেকেও মুক্তি। তাঁর শিক্ষাভাবনার গভীরে ছিল মানুষের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন সত্তার বিকাশ। তিনি এমন মানুষ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যে নিজের চোখে পৃথিবীকে দেখতে পারে, নিজের বুদ্ধিতে বিচার করতে পারে এবং নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে পারে। তাই তাঁর শিক্ষাদর্শের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল একটি বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাঠামোয় নয়; বরং মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার প্রতি তাঁর গভীর আস্থায় নিহিত। আজকের বাংলাদেশের শিক্ষা-আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের এই মুক্তির দর্শনকে নতুন করে স্মরণ করা প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমন হতে হবে, যা শিক্ষার্থীকে কেবল পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য প্রস্তুত করবে না; বরং তাকে জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বোঝার এবং প্রয়োজন হলে প্রচলিত বাস্তবতাকে প্রশ্ন করার সক্ষমতা দেবে। তাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে ভিন্নমতকে ভয় না পায়, যুক্তিকে অবজ্ঞা না করে, ক্ষমতার সামনে অন্ধভাবে নত না হয় এবং নিজের বিবেককে কোনো দলীয় বা গোষ্ঠীগত আনুগত্যের কাছে সমর্পণ না করে। একই সঙ্গে তাকে নিজের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করবে, আবার সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা গোষ্ঠীগত বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর মানবিকতার বোধও জাগ্রত করবে।
কাজী নজরুল ইসলামও (১৮৯৯–১৯৭৬) শিক্ষাকে কেবল জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেননি। তিনি শিক্ষাকে মানুষের মুক্তি, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর সাহিত্য, প্রবন্ধ, বক্তৃতা ও সামগ্রিক জীবনদর্শনের গভীরে ছিল মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তিনি এমন এক শিক্ষার পক্ষে ছিলেন, যা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখাবে, বৈষম্যের শৃঙ্খল ভাঙতে সাহস দেবে এবং নিজস্ব চিন্তা ও বিবেকের আলোয় সত্যকে অনুসন্ধান করার শক্তি জোগাবে। নজরুলের কাছে মানুষই ছিল সর্বোচ্চ মূল্যবোধ। ধর্ম, বর্ণ, জাতি কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভাজন তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই তাঁর শিক্ষাভাবনার কেন্দ্রে ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুক্তচিন্তার বিকাশ। তিনি এমন শিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ নয়, সহমর্মিতা সৃষ্টি করবে; বিভাজন নয়, সংহতি গড়ে তুলবে; অন্ধ আনুগত্য নয়, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করবে। নজরুল বারবার মানুষকে শৃঙ্খলমুক্ত হওয়ার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বিদ্রোহ ছিল কেবল রাজনৈতিক শাসনের বিরুদ্ধে নয়; অজ্ঞতা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, সামাজিক অবিচার এবং চিন্তার দাসত্বের বিরুদ্ধেও। এই অর্থে তাঁর শিক্ষাদর্শ ছিল গভীরভাবে মুক্তিকামী। তিনি এমন মানুষ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যে অন্যায়ের সামনে নীরব থাকবে না, ক্ষমতার ভয়কে সত্যের উপরে স্থান দেবে না এবং মানুষের মর্যাদাকে সব ধরনের সংকীর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মূল্যায়ন করবে।
আজকের বাংলাদেশে, যেখানে কখনো কখনো মতভেদকে বিরোধিতা হিসেবে এবং প্রশ্ন করাকে অবাধ্যতা হিসেবে দেখা হয়, সেখানে নজরুলের এই মুক্তচেতা মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষা যদি সত্যিই মানুষের ভেতরে সাহস, সহনশীলতা, ন্যায়বোধ ও মানবিক সংবেদনশীলতা জাগিয়ে তুলতে না পারে, তবে তা কেবল তথ্য ও দক্ষতা অর্জনের একটি সীমিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়; মানুষের প্রকৃত বিকাশের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে না। এই কারণেই আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য কেবল ‘শিক্ষিত’ মানুষ তৈরি করা নয়; বরং আলোকিত, মানবিক, যুক্তিবাদী, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। জাতীয় উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য দক্ষ জনশক্তি অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে যদি নৈতিকতা, মানবিকতা, মুক্তবুদ্ধি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় না ঘটে, তাহলে সেই দক্ষতা কখনোই একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। শিক্ষা তখন কেবল কর্মসংস্থানের উপকরণ হয়ে ওঠে; মানুষ গড়ার শক্তি হয়ে উঠতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের অন্তর্গত সম্ভাবনার বিকাশের কথা; নজরুল আমাদের শিখিয়েছেন সেই মানুষকে অন্যায় ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে দাঁড়াতে হবে। একজন শিক্ষা দিয়েছেন স্বাধীন চিন্তার সৌন্দর্য, অন্যজন শিখিয়েছেন স্বাধীন চিন্তার সাহস। একজন দেখিয়েছেন মানবিক বিকাশের পথ, অন্যজন দেখিয়েছেন মানবিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা যদি এই দুই মহান মনীষীর মানবিক ও মুক্তিকামী দর্শন থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তাহলে শিক্ষা সত্যিকার অর্থেই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক রূপান্তরের শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা হয়ে উঠুক মানুষের মানবিক উৎকর্ষ, মুক্তবুদ্ধির বিকাশ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সেই জীয়নকাঠি, যে শিক্ষা মানুষকে কেবল জীবিকা অর্জনের যোগ্য করে তুলবে না; তাকে নিজের বিবেকের কাছে স্বাধীন, সত্যের কাছে সৎ, সমাজের কাছে দায়িত্বশীল এবং মানবতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলবে। যে শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাবে, আবার শুনতেও শেখাবে; নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবে, আবার অন্যের অধিকারকে সম্মান করতেও উদ্বুদ্ধ করবে; নিজের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি গর্ববোধ জাগাবে, আবার বিশ্বমানবতার বৃহত্তর পরিসরের সঙ্গেও তাকে যুক্ত করবে। এমন শিক্ষাই পারে মুক্তচিন্তার শিক্ষাঙ্গন নির্মাণ করতে; এমন শিক্ষাই পারে একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করতে। আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য তাই কেবল ‘শিক্ষিত’ মানুষ তৈরি করা নয়; বরং আলোকিত, মানবিক, যুক্তিবাদী, সৃজনশীল, প্রতিবাদী ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য দক্ষ জনশক্তি অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে যদি নৈতিকতা, মানবিকতা, মুক্তবুদ্ধি, সৎসাহস ও নাগরিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় না ঘটে, তাহলে সেই দক্ষতা কখনোই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তাই আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা হয়ে উঠুক মানুষের মানবিক উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে মুক্তির সেই জীয়নকাঠি যে শিক্ষা মানুষকে কেবল জীবিকা অর্জনের যোগ্য করে তুলবে না, তাকে নিজের বিবেকের কাছে স্বাধীন, সমাজের কাছে দায়িত্বশীল এবং সত্যের কাছে সৎ মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলবে।
লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
ডেল্টা টাইমস/ড. মাহরুফ চৌধুরী /সিআর/এনজিটি