তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের ভবিষ্যৎ আর এই ভবিষ্যৎকে আলোকিত বা অন্ধকারময় করার ক্ষমতা তাদের হাতেই। ইতিহাস সাক্ষী-তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, অধ্যবসায় ও সাহস একটি জাতিকে বিপর্যয় থেকে টেনে এনে সমৃদ্ধির শিখরে তুলতে পারে। ভাষা আন্দোলনের শহিদ তরুণদের রক্তে মাতৃভাষা রক্ষা পেয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে তাদের রণকৌশল ও আত্মত্যাগে স্বাধীনতা এসেছে,আর গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তাদের সংগ্রামে দেশ নতুন দিশা পেয়েছে। আজকের যুগে তরুণদের হাতে আছে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের অসীম সুযোগ। কিন্তু সুযোগের সঙ্গে সঙ্গে আছে দায়িত্ব-নিজেকে প্রস্তুত করা, সময় নষ্ট না করা, মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে থাকা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা।আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আগামী প্রজন্মের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অন্যের নির্ধারিত মাপকাঠিতে নিজেদের বিচার না করে, নিজস্ব সম্ভাবনার আলোয় নিজেদের পথ তৈরি করা। আমাদের জীবনটা একান্তই ব্যক্তিগত এবং এর প্রতিটি পদক্ষেপে আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ও সফলতার দায়িত্ব একান্তই আমাদের নিজেদের। সমাজ, চারপাশের পরিবেশ এবং নেতিবাচকতার ভিড়ে অনেক সময় তরুণ প্রজন্ম তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে এবং অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে নিজেদের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দেয়। অথচ সত্য হলো, নিজের জীবনযুদ্ধে লড়তে হয় নিজেকেই এবং এই লড়াইয়ের ময়দানে অন্য কেউ এসে হাল ধরে নেবে না বিধায় আগামী প্রজন্মকে আত্মনির্ভরশীল ও অদম্য হতে হবে। জীবন কোনো অন্যের স্ক্রিপ্টে অভিনীত নাটক নয়, এটি সম্পূর্ণ নিজের হাতে লেখা একটি উপন্যাস, যেখানে অন্য কেউ নায়ক বা নায়িকা হতে পারে না। বাস্তবতার খাতিরে যদি আমরা লক্ষ করি, তবে দেখব আমাদের সুখ-দুঃখের অনুভূতি একান্তই নিজস্ব।
শরীরের কোথাও কেটে গেলে রক্ত ঝরে নিজের শরীর থেকেই এবং তার যন্ত্রণা অনুভব করতে হয় নিজেকেই; হাত কাটবে একজনের আর ব্যথা পাবে অন্যজন, এমন অদ্ভুত নিয়ম প্রকৃতির খাতায় লেখা নেই। ঠিক তেমনি কর্মজীবনে বা ব্যক্তিগত লড়াইয়ে ব্যর্থ হলে সান্ত্বনা দেওয়ার মানুষ হয়তো হাজারটা জুটে যাবে, কিন্তু সেই ব্যর্থতাকে সফলতায় রূপ দেওয়ার দায়িত্ব কেউ নিজের কাঁধে নেবে না।লোকেরা হয়তো আপনার ব্যর্থতার কারণ শুনে সহানুভূতি প্রকাশ করবে, কিন্তু দিনশেষে দিন গড়িয়ে গেলে আপনার ব্যর্থতার দায়ভার এবং তার পরিণতি আপনাকেই ভোগ করতে হবে। সমাজ হাজারটা অজুহাত শুনতে প্রস্তুত থাকে, কিন্তু ইতিহাস শুধু ফলাফলকে মনে রাখে, অজুহাতকে নয়। তাই নিজের সীমানা এবং সক্ষমতা সম্পর্কে নিজের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না এবং আমি কী পারব আর কী পারব না তা অন্য কাউকে প্রমাণ করার চেয়ে নিজের কাছে স্পষ্ট করা বেশি জরুরি।জীবন ধারণের মৌলিক সত্যগুলোর দিকে তাকালে আত্মনির্ভরতার বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ প্রতিটি মানুষকে নিজ দায়িত্বে শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়, যা অন্য কেউ কখনো ভাগ করে নিতে পারে না।আমাদের জীবনে এমন অনেক প্রিয় মানুষ থাকেন, যাঁদের জন্য আমরা জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকি, কিন্তু পরম বন্ধু বা অতি আপনজনেরও সাধ্য নেই যে নিজের ফুসফুসে একটু বেশি বাতাস টেনে নিয়ে আমাদের দুদিন বেশি বাঁচিয়ে রাখবেন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বেঁচে থাকার এই মৌলিক লড়াইয়ে মানুষ একা এবং যখন এই চিরন্তন সত্যটি উপলব্ধি করা যায়, তখন আশপাশের মানুষের নেতিবাচক ভবিষ্যদ্বাণী বা নিরুৎসাহী কথাবার্তাগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে। অন্যের কথায় হতাশ হয়ে থেমে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই, কারণ আগামী প্রজন্মকে বুঝতে হবে যে আপনার জীবনের রিমোট কন্ট্রোল অন্য কারো হাতে তুলে দেওয়া মানে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনা।
নিজের ওপর অগাধ বিশ্বাস রেখেই সামনের দিকে পা বাড়াতে হবে এবং মানুষের স্বভাব হলো মন্তব্য করা বিধায় আপনি ভালো করুন কিংবা মন্দ, সমাজে এক শ্রেণির মানুষ থাকবেই যারা নেতিবাচক কথা বলবে। একে মানুষের সামাজিক স্বভাব হিসেবে ধরে নিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে হবে এবং অন্যের অ-কথায় বা কু-কথায় কান দিলে শুধু নিজের মূল্যবান সময় এবং মানসিক শক্তিই অপচয় হবে।সব মানুষ আপনাকে নিয়ে ভালো মন্তব্য করবে না এটাই পৃথিবীর নিয়ম, তবে ভালো মন্তব্যগুলোকে জীবনের জ্বালানি বা উৎসাহ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং সমালোচকদের খারাপ মন্তব্যগুলোকে শক্তি বা প্রতিশোধের হাতিয়ার না বানিয়ে আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ বানাতে হবে। সমালোচকদের তির্যক বাক্যগুলোকে নিজের গায়ে না মেখে, তা দিয়ে নিজের আত্মবিশ্বাসের বর্ম শক্ত করতে হবে। কারণ যখন আপনি নিজের লক্ষ্যপানে অবিচল থাকবেন তখন একসময় এই সমালোচকরাই আপনার সাফল্যের দর্শক হয়ে হাততালি দিতে বাধ্য হবে। দৌড় প্রতিযোগিতায় জিততে হলে নিজের পায়ে জোর থাকতে হয় এবং অন্যের পা কতটা শক্তিশালী বা অন্য কে কত দ্রুত দৌড়াতে পারে, তা দিয়ে নিজের গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না। প্রত্যেক মানুষের চলার পথ আলাদা এবং তার শক্তির উৎস আলাদা বিধায় অন্যের সফলতার অন্ধ অনুকরণ না করে নিজের শক্তির জায়গাগুলো খুঁজে বের করতে হবে। জীবনে যদি ভুল করেও একবার কোনো বড় স্বপ্ন দেখে ফেলেন, তবে তা পূরণ করার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং সমাজ বা পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা এবং তার পেছনে নিরলস ছুটে চলাটাই প্রকৃত মানুষের কাজ।একটি দীর্ঘ যাত্রায় পথে বাধা আসতে পারে, ঝড়-ঝাপ্টা আসতে পারে, যার অর্থ এই নয় যে আপনি গন্তব্যে পৌঁছানোই বন্ধ করে দেবেন।
প্রয়োজনে রণকৌশল বদলাতে হবে, চিন্তা-ভাবনার ধরন পরিবর্তন করতে হবে, চলাচলের পথ বা মাধ্যম পাল্টাতে হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী যা যা বদলানোর প্রয়োজন তার সবই বদলাবেন, কিন্তু ভুলেও নিজের স্বপ্নটাকে পরিবর্তন করবেন না। টার্গেট বা লক্ষ্য সর্বদা স্থির রাখতে হবে। কারণ অনেক সময় আমরা জটিল সমীকরণ মেলাতে গিয়ে জীবনকে কঠিন করে তুলি, কিন্তু জীবনের হিসাবটা সহজ করে নিতে পারলে অর্থাৎ আমি পারব এবং আমাকেই করতে হবে এই সরল সত্যটি মেনে নিলে বড় বড় বাধা দূর হয়ে যায়। একটি চমৎকার দার্শনিক সত্য হলো, আমাদের জীবনের স্বপ্নগুলো কখনো একা আসে না, বরং সৃষ্টিকর্তা বা প্রকৃতি যখন মনে একটি বড় স্বপ্ন জ্বেলে দেয়, ঠিক তখন সেই স্বপ্ন পূরণ করার উপায় বা মাধ্যমগুলোও তার নিজ হাতেই তৈরি করে দেয়। প্রয়োজন শুধু চোখের জট খুলে সেই পথটাকে চিনে নেওয়ার এবং সাহসের সঙ্গে তাতে পা রাখার। কারণ স্বপ্ন দেখার পর যখন মানুষ কাজে নামে, তখন একের পর এক সম্ভাবনার দুুয়ার খুলতে শুরু করে। আজকের তরুণ প্রজন্ম যারা আগামীর বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে, তাদের উদ্দেশে এটাই বলার যে অন্যের তৈরি করা ছাঁচে নিজেদের ফিট করার চেষ্টা বন্ধ করুন। কারণ আপনার জীবন আপনার নিয়মেই চলবে। অন্য দশজনে যদি কোনো কিছু সফলভাবে অর্জন করতে পারে, তবে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও আপনি তা পারবেন এবং শুধু প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ, নিখুঁত পরিকল্পনা ও আত্মমর্যাদা নিয়ে লড়ে যাওয়ার মানসিকতা। কাউকে অনুকরণ না করে নিজের মৌলিক একটি গল্প তৈরি করুন, যাতে আপনার জীবনের গল্প আগামী দিনের সেরা ইতিহাস হয়ে ওঠে। কারণ ইতিহাস শুধু অতীতের পাতা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া যায় না, ইতিহাস নিজ হাতে রচনা করতে হয়। অন্যের কুৎসায় বিচলিত না হয়ে নিজের ওপর ভরসা রাখুন।
জীবন মানেই এক সম্ভাবনাময় ক্যানভাস, যেখানে ব্যর্থতার দাগ যতই গভীর হোক না কেন, সাফল্যের উজ্জ্বল রং দিয়ে তা ঢেকে দেওয়ার ক্ষমতা শুধু আপনারই আছে। স্ট্র্যাটেজি বদলান, পরিশ্রমের মাত্রা বাড়ান, কিন্তু স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত হবেন না। কারণ জীবনযুদ্ধের এই পিচ্ছিল পথে নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার নামই প্রকৃত জয় এবং সফলতা একদিন আপনার দরজায় কড়া নাড়তে বাধ্য হবে। আসুন, আজই প্রতিজ্ঞা করি যে নিজের ছায়া নিজেই হব এবং নিজের আলোর দিশারি নিজেই হয়ে আগামী প্রজন্মের এক সুদৃঢ় ইতিহাস রচনা করব।মানুষ মাত্রই স্বপ্নবিলাসী এবং জন্মলগ্ন থেকেই প্রতিটি মানুষ বুনে চলে হাজারো রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু স্বপ্ন দেখা আর তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মধ্যবর্তী দূরত্বটুকু পাড়ি দিতে প্রয়োজন হয় দৃঢ় মানসিকতা, নিখুঁত পরিকল্পনা এবং অবিচল লড়াইয়ের।আজকের যুগের প্রযুক্তি হবে সৃজনশীলতার হাতিয়ার, বিভ্রান্তির নয়; রাজনীতি হবে সেবার মাধ্যম, ক্ষমতার লড়াইয়ের নয়।শহিদ জিয়া তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে জাতীয় স্বাধীনতার পথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন; খালেদা জিয়া তরুণদের নিয়ে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আজকের তরুণদেরও সেই ইতিহাস থেকে প্রেরণা নিতে হবে-দল-মত নির্বিশেষে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার মিশনে এক হতে হবে। যদি আমরা আজ একসঙ্গে এগিয়ে আসি, তা হলে আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারব একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ-যেখানে প্রত্যেক তরুণ স্বপ্ন দেখতে পারবে, সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাবে এবং দেশের উন্নয়ন-পরিবর্তনের প্রধান চালিকা শক্তি হয়ে উঠবে।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।
ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই