দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৯১ সালে ভারত ‘লুক ইস্ট পলিসি’ চালু করে এবং ২০১৪ সালে সেটাকে ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’তে উন্নীত করে। সেইসাথে ভারত-মায়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিমুখী মহাসড়ক এবং কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট পরিবহন প্রকল্পের মতো প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ করে। ভারত-মায়ানমার-থাইল্যান্ড (আইএমটি) ত্রিমুখী মহাসড়কটি ১,৩৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এটা মণিপুরের মোরেহ থেকে মিয়ানমারের সাগাইং রাজ্যের মধ্য দিয়ে থাইল্যান্ডের মে সোত পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এর প্রায় ৭০% কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পটি মিয়ানমারের রাখাইনের সিতওয়ে বন্দর এবং কালাদান নদীর মধ্য দিয়ে ভারতের কলকাতাকে মিজোরামের সাথে সংযুক্ত করে। বন্দর এবং নদী টার্মিনালগুলি চালু থাকলেও, মিজোরাম সীমান্ত পর্যন্ত ১০৯ কিলোমিটার সড়ক সংযোগটি এখনও নির্মাণাধীন, এবং নতুন করে সময়সীমা ২০২৭ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। মিয়ানমারের চিন ও রাখাইন রাজ্যের চলমান সংঘাতের কারনে এই কাজের অগ্রগতি থেমে গেছে। ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর সাথে মিয়ানমারের সীমান্ত বাণিজ্য চলে। মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে পরিকল্পিত কালাদান মাল্টি মোডাল প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা গেলে ভারতের এই রাজ্যগুলো আরও দ্রুত ও সহজে তাদের নিত্যপণ্যের সরবরাহ পাবে।
ভারতের অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর এবং মিজোরামের সাথে মিয়ানমারের চিন রাজ্য , সাগাইং অঞ্চল এবং কাচিন রাজ্যের সাথে মিয়ানমারের ১৬৪৩ কিলোমিটার স্থল সীমান্ত রয়েছে। মণিপুরে ভারত মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্র মোরেহ অবস্থিত। মিয়ানমারের চিন রাজ্য ও সাগাইং অঞ্চলে বসবাসকারীরা উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্যগুলোর জনগণের সাথে ঘনিষ্ঠ জাতিগত সম্পর্কযুক্ত। ভারতের মিজোরাম ও মণিপুরের সাথে সীমান্তবর্তী মিয়ানারের চিন রাজ্য। মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল প্রদেশের সাথে মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের দীর্ঘ সীমান্ত এবং কাচিন রাজ্যের সাথে অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো স্থানীয় বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারত এবং মিয়ানমারে চলমান অস্থিরতা ও সংঘাতের কারনে এই অঞ্চলের বাণিজ্য, যোগাযোগ ও উন্নয়নের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
ভারতের মণিপুর ও মিজোরামের আভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও সংঘাতের কারনে এবং একই সাথে অবৈধ অভিবাসন, চোরাচালান এবং বিদ্রোহী কার্যকলাপ দমনের উদ্দেশ্যে ভারত মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এর পাশাপাশি ভারত মিয়ানমার সীমান্তে বসবাসকারীদের অবাধ চলাচল নীতি থেকে সরে এসে কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নীতি গ্রহণ করেছে। ভারত মিয়ানমারের সাথে ১,৬৪৩ কিলোমিটার জুড়ে নেয়া এই প্রকল্পটির কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এপর্যন্ত মণিপুরের মোরেহ’র কাছে ১০ কিলোমিটার এলাকা সহ ৩০ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধের কারনে শরণার্থীদের আগমন বৃদ্ধি এবং অবৈধ মাদক ব্যবসার প্রসার থেকে উদ্ভূত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ভারত এই সিদ্ধান্ত নেয়। সীমান্তের উভয় পাশে বসবাসরত জাতিগত সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিয়ে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভারত মিয়ানমার-মণিপুর সীমান্তের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের জন্য ৪৩টি নির্দিষ্ট সীমান্ত ক্রসিং দিয়ে সীমান্ত পারাপারে অনুমোদন দেয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ভারত সরকার ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যেকার এই অবাধ চলাচল ব্যবস্থা (এফএমআর) স্থগিত করে। এই ব্যবস্থায় সীমান্তবর্তী স্থানীয় জনগণ ভিসা ছাড়াই সীমান্ত পেরিয়ে ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারতো। এর মাধ্যমে সীমান্ত অঞ্চলের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য পথগুলোও খোলা ছিল।
ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম রাজ্যের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের চিন রাজ্য সামরিক জান্তা এবং সশস্ত্র গুষ্টিগুলোর মধ্যে সংঘাতের কারনে মিয়ানমার থেকে হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়।
মিয়ানমারের সাথে ভারতের মনিপুরের ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, মণিপুরের মেইতেই, কুকি এবং নাগা সম্প্রদায়ের যোদ্ধা গোষ্ঠীগুলো প্রত্যেকেই আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব এবং স্বায়ত্তশাসিত শাসনের দাবি জানানোর কারনে মাঝে মাঝেই এই অঞ্চলের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই এবং সংখ্যালঘু কুকি-জো উপজাতির মধ্যে জাতিগত সহিংসতায় ২০০ জনেরও বেশি নিহত এবং ৬০,০০০-এরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। ভারতের মণিপুর রাজ্যের পাশেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ অঞ্চল এবং গৃহযুদ্ধ-বিধ্বস্ত মিয়ানমারও এর অন্তর্ভুক্ত। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মাদক পাচার করিডোর, যেখানে হেরোইন, আফিম এবং মেথামফেটামিনের মতো সিন্থেটিক ড্রাগ পাচার হয়। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের আগমন নিয়ে উদ্বেগ নিরসন, চোরাচালান দমন, মাদকদ্রব্য, অবৈধ অস্ত্র এবং জাল ভারতীয় মুদ্রার পাচার প্রতিরোধ, অরক্ষিত সীমান্ত ব্যবহার করে মিয়ানমারে নিরাপদ আশ্রয় বন্ধে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর চলাচল বন্ধ করার জন্য ভারত সরকার ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে এফএমআর বাতিল ও স্থগিত করার আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেয়।
মিয়ানমারে ভারতের প্রধান তিনটি স্বার্থ রয়েছে। এগুলো হলো—নিজেদের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত স্থিতিশীল রাখা, অ্যাক্ট ইস্ট পলিসির সফলতা এবং মিয়ানমারে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা। ভারত তাঁদের স্বার্থ রক্ষায় তৎপর এবং এজন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ভারতের সাথে আসিয়ান দেশগুলোর যোগাযোগের জন্য ভারত – মিয়ানমার - থাইল্যান্ড ট্রাই লেটারাল হাইওয়ের কাজ এগিয়ে চলছে। কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পটি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিত্তওয়ে বন্দর এবং কালাদান নদীর মধ্য দিয়ে কলকাতা ও মিজোরামের সংযোগ পথ। এটি ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সবরারাহ পথ। মিজোরাম হয়ে কালাদান প্রকল্পের মাধ্যমে মিয়ানমারের সিতওয়ে বন্দরের সাথে পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সংযোগ, স্থানীয় বাণিজ্য প্রসারের জন্য নাগাল্যান্ডের আভাংখুর মতো নতুন স্থল শুল্ক কেন্দ্র (এলসিএস) খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। অরুণাচল প্রদেশের নামপং এবং পাংসু পাস দিয়ে সীমান্ত বাণিজ্যে চলে। ভারত মণিপুরের সীমান্তে অবস্থিত কৌশলগত শহর মোরেহ-তে ইতোমধ্যে ৯.২ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করেছে। স্থানীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং উভয় পাশের মানুষের জীবিকার সুযোগ তৈরির জন্য সীমান্ত হাট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মণিপুর ও মিজোরামে আভ্যন্তরীণ সংঘাত, মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধের কারনে ভারতে মিয়ানমারের উদ্বাস্তুদের উপস্থিতি ভারতের লুক ইষ্ট পলিসিকে চাপে রেখেছে। এসব কারনে সীমান্ত বাণিজ্যও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। ভারতের মণিপুর রাজ্যের পাশে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের অবস্থান, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের আগমন নিয়ে উদ্বেগ, চোরাচালান দমন, মাদকদ্রব্য, অবৈধ অস্ত্র এবং জাল ভারতীয় মুদ্রার পাচার প্রতিরোধ, ভারতের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মিয়ানমারে নিরাপদ আশ্রয় ও চলাচল বন্ধ করা ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এই অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ করা, প্রতিরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রয়োজনে বঙ্গোপসাগর এলাকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের প্রভাব বিস্তারের জন্য ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সিমান্তবর্তী মিয়ানমারের চিন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং সশস্ত্র গুষ্টিগুলোর মধ্যে রাজ্যটির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। মিয়ানমারের চিন রাজ্যে দারিদ্র্যের হার সর্বোচ্চ, চরম দারিদ্র্যের কারণে সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসীরা জনগণ ভারতের উন্নত অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো অত্যাবশ্যক সেবার জন্য সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্যগুলির উপর নির্ভরশীল। চিনল্যান্ড কাউন্সিল (সিসি), এবং চিন ব্রাদারহুড (সিবি) এই দুই দল মূলত পুরো চিন রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে এর মধ্যে সিবি এবং আরাকান আর্মি একত্রে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে একত্রে সংঘর্ষে লিপ্ত। মিয়ানমারের চিন রাজ্যের দক্ষিণ প্রান্তে কালাদান নদীর তীরে অবস্থিত পালেতোয়া শহরতলী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। চিনল্যান্ড কাউন্সিল আরাকান আর্মিকে এই শহর ছেড়ে দিতে ও তাঁদের রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার দাবি জানিয়ে আসছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে উভয় পক্ষের বিরোধ থাকার পরও পালতয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চিন গোষ্ঠী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে সহিংস সংঘর্ষ হয়েছে। চিন রাজ্যের এই সহিংসতা কালাদান প্রকল্পের কার্যক্রম ঝুঁকিতে ফেলেছে। এই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে হলে আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ ছাড়া সম্ভব হবে না।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনী চিন ও সাগাইং রাজ্যের মধ্যে যোগাযোগ চালুর চেষ্টা করছে এবং চিন রাজ্যের উত্তর প্রান্তে ভারতীয় সীমান্তের কাছে অবস্থিত টনজাং টাউনশিপ তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। ভারত থেকে চিন ও আরাকানে পণ্য সরবরাহ পথ মিজোরাম সীমান্তের একটি প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র রিহকাওদার নিয়ন্ত্রন নিতে আক্রমণ চালাচ্ছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী পালেতোয়া শহর দখল নিতে পারলে ভারত থেকে চিন রাজ্য হয়ে রাখাইনে আসার সরবরাহ পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে আরাকান আর্মি চাপে পড়বে এবং রাখাইনে খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে এবং স্থানীয় জনগণ সংকটের কবলে পড়বে। রাখাইনের সংকট তীব্র হলে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পরিস্থিতি তৈরি হবে।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে চলমান সশস্ত্র সংঘাত দমনে মিয়ানমার সরকারের ভারতের সহযোগিতা দরকার হবে। একটি শান্ত ও স্থিতিশীল মিয়ানমার এই অঞ্চলে ভারতের স্বার্থরক্ষায় ইতিবাচক ভুমিকা রাখবে বিধায় ভারত মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের অবসান চায়। ভারত, মিয়ানমার সরকার এবং আরাকান আর্মির সাথে একত্রে রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নিলে এই অঞ্চলে দ্রুত শান্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। রাখাইনের বাস্তুচ্যুত ১৩ লাখ রোহিঙ্গাদের বাদ দিয়ে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। ভারতের লুক ইষ্ট পলিসি শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের পাশাপাশি চলমান সংকট সমাধানে অবদান রেখে এই অঞ্চলের উন্নয়নে ভুমিকা রাখবে এটাই প্রত্যাশা।
ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এন ডি সি, এ এফ ডব্লিউ সি,
পি এস সি, এম ফিল (অবঃ)
মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক
ডেল্টা টাইমস/ব্রি. জে. (অব.) হাসান মো. শামসুদ্দীন/এনআইএন