পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ প্রকল্প: সম্ভাবনা, বিতর্ক ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন

এসকেএমডি বাহলুল আলম

মতামত

প্রেক্ষাপট : বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপগুলোর একটি এবং নদীনির্ভর একটি দেশ। দেশের ভৌগোলিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে

2026-06-24T19:13:32+06:00
2026-06-24T19:13:32+06:00
মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩

পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ প্রকল্প: সম্ভাবনা, বিতর্ক ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন
এসকেএমডি বাহলুল আলম
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ৭:১৩ পিএম   (ভিজিট : ১৮১)

প্রেক্ষাপট : বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপগুলোর একটি এবং নদীনির্ভর একটি দেশ। দেশের ভৌগোলিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। দেশের মোট কৃষিজমির একটি বড় অংশ, অভ্যন্তরীণ মৎস্যসম্পদ, নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় প্রতিবেশ নদীর প্রবাহ ও পানির প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, বনজ সম্পদ এবং স্থানীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা নদীর প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গঙ্গার প্রবাহ হ্রাসের ফলে গড়াইসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক শাখা নদীর নাব্যতা কমেছে, নদীগুলোতে পলি জমা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নদীর সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, নৌ-যোগাযোগ এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি, সুপেয় পানি এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, নদী ভরাট, অপরিকল্পিত পোল্ডার ব্যবস্থা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে অঞ্চলের পানি সংকটের পাশাপাশি পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতাও বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার দেশের অভ্যন্তরে গঙ্গা নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে পানি সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘গঙ্গা ব্যারাজ’ বা সাম্প্রতিক সময়ের ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে গড়াই-মধুমতী, মাথাভাঙ্গা, বড়াল, চন্দনা-বারাশিয়া ও অন্যান্য নদীতে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। এর ফলে প্রায় ২৮.৮ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নদী পুনরুজ্জীবন, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে বলে সরকার আশা করছে। তবে প্রকল্পটি নিয়ে নদী বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, পদ্মা নদীর মতো উচ্চ পলিবাহী নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের ফলে উজানে পলি জমা, নদীর গতিপ্রকৃতির পরিবর্তন, বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বৃদ্ধি, ভাটিতে পানির প্রবাহ হ্রাস এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া ভারত-বাংলাদেশ পানি বণ্টন, আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক পানিকূটনীতির ওপরও প্রকল্পটির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বর্তমানে কেবল একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন উদ্যোগ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নদী শাসন এবং আঞ্চলিক কূটনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নীতিগত আলোচনার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রকল্পের পটভূমি, উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশিত সুফল: বাংলাদেশে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের ধারণা নতুন নয়। ১৯৬০-এর দশক থেকেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি মোকাবিলা এবং নদীগুলোর প্রবাহ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এ ধরনের একটি বৃহৎ পানি অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে ১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে গঙ্গার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীপথে সরিয়ে নেওয়া হলে বাংলাদেশের অংশে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যায় বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে গড়াই, মধুমতী, মাথাভাঙ্গা, বড়াল, ইছামতীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদীর নাব্যতা হ্রাস পায়, অনেক নদী মৌসুমি চরিত্র ধারণ করে এবং কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) দীর্ঘদিন ধরে গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। বিভিন্ন সময়ে একাধিক সম্ভাব্যতা ও কারিগরি সমীক্ষা পরিচালনার পর ২০১৬ সালে সর্বশেষ সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রকল্পটির নকশা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। পরবর্তীতে এটি ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা–২১০০’-এ অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৩ মে ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির প্রথম পর্যায় অনুমোদন লাভ করে। প্রকল্পটির জন্য প্রায় ৩৪,৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ২০২৬-২০৩৩ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যারাজটি রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলা এবং পাবনা জেলার মধ্যবর্তী পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হবে। প্রায় ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস, একটি নৌ-লক, গাইড বাঁধ এবং অ্যাপ্রোচ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি সংরক্ষণ করে তা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোতে প্রবাহিত করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে এবং গড়াই-মধুমতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীতে নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি সরবরাহ করা হবে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, এর ফলে দেশের ১৯টি জেলার প্রায় ১২০টি উপজেলার ৭ কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। প্রায় ২৮.৮ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৪ লাখ টন ধান উৎপাদন সম্ভব হবে। পাশাপাশি মৎস্য উৎপাদনও প্রায় ২.৫ লাখ টন বৃদ্ধি পেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমবর্ধমান খরা ও বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সেচ সুবিধা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর পুনরুজ্জীবন। দীর্ঘদিন ধরে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় গড়াই, মধুমতী, বড়াল ও অন্যান্য নদীর নাব্যতা এবং পরিবেশগত কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যারাজ থেকে নিয়ন্ত্রিত পানি সরবরাহের মাধ্যমে এসব নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা গেলে মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি, নৌ-পরিবহন উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটতে পারে। এছাড়া প্রকল্পটি উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে অধিক পরিমাণ মিঠাপানি প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে সুন্দরবন ও উপকূলীয় কৃষি অঞ্চলে লবণাক্ততার আগ্রাসন কমবে। এর ফলে কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধি, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা উন্নত হওয়া এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা মিলতে পারে। জ্বালানি খাতেও প্রকল্পটির একটি সীমিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। মূল ব্যারাজ এবং গড়াই গ্রহণ কাঠামোতে টারবাইন স্থাপনের মাধ্যমে মোট ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় এ পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম, তবুও এটি নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির উৎস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতে পারে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, কৃষি, মৎস্য, নৌ-পরিবহন, পরিবেশগত উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে প্রকল্পটি বছরে প্রায় ৭,১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে প্রকল্পটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রতিদান (Internal Rate of Return - IRR) প্রায় ১৭.০৫ শতাংশ হবে বলে দাবি করা হয়েছে, যা একে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক একটি অবকাঠামোগত বিনিয়োগ হিসেবে উপস্থাপন করে। সুতরাং, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে সরকার ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মহল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উন্নয়ন, নদী পুনরুদ্ধার, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু অভিযোজনের একটি সমন্বিত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল বাস্তবে কতটুকু অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে এর কারিগরি বাস্তবায়ন, পানি প্রাপ্যতা, পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক পানিকূটনীতির ওপর।

পরিবেশগত, সামাজিক ও ভূরাজনৈতিক মূল্যায়ন : পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা সংকট মোকাবিলার একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও প্রকল্পটি শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞ মহল, পরিবেশবিদ, নদী গবেষক এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, নদী পুনরুজ্জীবন, সেচ সম্প্রসারণ এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণের মতো সম্ভাব্য সুফলের ওপর জোর দেওয়া হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত জনপরিসরে আলোচনা হয়নি। বিশেষত নদীকেন্দ্রিক বাংলাদেশের মতো একটি দেশে এত বৃহৎ হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন উন্নয়ন সুবিধার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

পানি সংকট নাকি পানি ব্যবস্থাপনার সংকট? :
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের যৌক্তিকতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রথমেই যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো—দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রকৃত সমস্যা কি পানির অভাব, নাকি পানি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা? প্রকল্পের পক্ষে উপস্থাপিত যুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতিকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, কেশবপুর, অভয়নগর, মনিরামপুর, পাইকগাছা ও তালা উপজেলার বহু এলাকা বর্ষা-পরবর্তী সময়েও দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকে। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ হলো নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি। গত পাঁচ দশকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শতাধিক স্লুইসগেট, রেগুলেটর, পোল্ডার এবং প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের ফলে নদী ও প্লাবনভূমির প্রাকৃতিক সংযোগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে নদী থেকে পলি বের হতে না পেরে নদীতল ভরাট হয়েছে এবং পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা কমেছে। অনেক গবেষকের মতে, নতুন একটি ব্যারাজ নির্মাণের আগে বিদ্যমান নদী ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার এবং পানি নিষ্কাশন কাঠামোর সংস্কার অধিক কার্যকর সমাধান হতে পারে।

পলিবাহী পদ্মা ও ব্যারাজের স্থায়িত্ব প্রশ্ন :
পদ্মা নদী পৃথিবীর অন্যতম গতিশীল এবং পলিবাহী নদী। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকা প্রতিবছর আনুমানিক ১ থেকে ১.২ বিলিয়ন টন পলি বঙ্গোপসাগরে বহন করে নিয়ে যায়, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ পলি পরিবহনকারী নদী ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই বাস্তবতায় পদ্মার মতো নদীতে স্থায়ী ব্যারাজ নির্মাণ একটি বড় প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। প্রস্তাবিত ব্যারাজে পলি অপসারণের জন্য ১৮টি আন্ডারস্লুইস রাখার পরিকল্পনা থাকলেও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এত বিপুল পরিমাণ পলি দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হবে। ফারাক্কা ব্যারাজের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে উজানে পলি জমে নদীতল দ্রুত উঁচু হয়ে যায়। ভারতের বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কার উজান অংশে নদীতল কয়েক মিটার পর্যন্ত উঁচু হওয়ার তথ্য বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। একই ধরনের পরিস্থিতি পদ্মায় সৃষ্টি হলে রাজশাহী থেকে পাংশা পর্যন্ত এলাকায় বন্যা, নদীভাঙন এবং ভূমি ক্ষয়ের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।

নদীর জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব : নদী কেবল পানি পরিবহনের মাধ্যম নয়; এটি একটি জটিল জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। নদীর প্রবাহ, পলি পরিবহন, মাছের অভিবাসন, পুষ্টি উপাদানের বিস্তার এবং জলজ প্রাণীর জীবনচক্র পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। ব্যারাজ নির্মাণের ফলে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলো ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ২৬০ প্রজাতির স্বাদুপানির মাছ পাওয়া যায়, যার একটি বড় অংশ প্রজনন ও খাদ্য সংগ্রহের জন্য নদীর বিভিন্ন অংশে চলাচল করে। বৃহৎ জলকাঠামো নির্মাণের ফলে এই চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে মাছের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যদিও প্রকল্পে দুটি ফিশ পাস নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে বৃহৎ নদীতে নির্মিত অনেক ফিশ পাস প্রত্যাশিত কার্যকারিতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন আসলে নদীতীরবর্তী জলাভূমি, চরাঞ্চল, বন্যপ্রাণী এবং জলজ উদ্ভিদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে গড়াই নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রবাহিত মিঠাপানির পরিমাণে পরিবর্তন হলে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটির পরিবেশগত ভারসাম্যেও প্রভাব পড়তে পারে।

ভাটির অঞ্চলে পানিপ্রবাহ হ্রাস ও নতুন পরিবেশগত ঝুঁকি :
পদ্মা ব্যারাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনার একটি হলো এর সম্ভাব্য ‘জিরো-সাম’ প্রভাব। অর্থাৎ উজানে যে পরিমাণ পানি সংরক্ষণ ও পুনর্বণ্টন করা হবে, ভাটিতে সেই পরিমাণ পানি কমে যাবে। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যারাজ নতুন পানি সৃষ্টি করবে না; বরং বিদ্যমান প্রবাহের পুনর্বিন্যাস করবে। প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ব্যারাজের মাধ্যমে গড়াই-মধুমতী ও অন্যান্য নদীতে অতিরিক্ত পানি সরবরাহ করা হবে। কিন্তু এর ফলে গোয়ালন্দের নিচে পদ্মার প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাব আড়িয়াল খাঁ, লৌহজং, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা এবং মেঘনা মোহনার ওপর পড়তে পারে। মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা আরও গভীরে প্রবেশ করতে পারে, যা কৃষি, মৎস্য এবং সুপেয় পানির নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাটির অঞ্চলের এই সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি, যা প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।

পানি কূটনীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান :
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রভাব কেবল দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আঞ্চলিক পানি কূটনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে এবং ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা। এই প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশ যদি নিজস্ব অবকাঠামোর মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজে, তাহলে গঙ্গার ন্যায্য হিস্যা আদায়ের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, বাংলাদেশকে প্রথমে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহার সম্পর্কিত জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের কনভেনশন অনুসমর্থন করা, গঙ্গা চুক্তির নবায়নে ন্যূনতম প্রবাহের গ্যারান্টি নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক পানি সহযোগিতা জোরদার করার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। কারণ উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত না করে কেবল একটি ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা অর্জন করা সম্ভব নয়। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ পানি অবকাঠামো উদ্যোগ। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, সেচ ও নদী পুনরুজ্জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে পলি জমা, নদীর গতিশীলতা পরিবর্তন, জলাবদ্ধতা, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, ভাটির অঞ্চলে পানিপ্রবাহ হ্রাস এবং আঞ্চলিক পানি কূটনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাবের মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে একটি স্বচ্ছ, স্বাধীন ও বহুমাত্রিক পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে উন্নয়নের পাশাপাশি নদী ও পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বও রক্ষা পায়।

বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি: অবকাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ নয়, নদীর প্রাকৃতিক পুনরুদ্ধার :
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সমালোচকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মনে করেন যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট ও নদী অবক্ষয়ের মূল কারণ পানির ঘাটতি নয়; বরং নদী ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ত্রুটি। তাদের মতে, নতুন একটি বৃহৎ ব্যারাজ নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান নদী ব্যবস্থার পুনর্বাসন, প্রাকৃতিক প্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নদীকেন্দ্রিক পানি ব্যবস্থাপনা অধিক কার্যকর, কম ব্যয়বহুল এবং পরিবেশবান্ধব সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গত কয়েক দশকে শত শত কিলোমিটার পোল্ডার, স্লুইসগেট, রেগুলেটর ও প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব অবকাঠামো প্রাথমিকভাবে কৃষিজমি রক্ষা এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হলেও অনেক ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, জোয়ার-ভাটার চক্র এবং পলি পরিবহন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলস্বরূপ নদীর তলদেশ উঁচু হয়েছে, খাল ও শাখা নদীগুলো ভরাট হয়েছে এবং জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পানি ধরে রাখার পরিবর্তে প্রথমে বিদ্যমান নদী ব্যবস্থার প্রাকৃতিক কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার করা অধিক জরুরি। এই দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থকরা নদীর ওপর নির্মিত অকার্যকর স্লুইসগেট, রেগুলেটর ও কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা অপসারণের পক্ষে মত দেন। তারা মনে করেন, অনেক নদী বর্তমানে দখল, ভরাট এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। ফলে নদীগুলোকে দখলমুক্ত করা, প্রাকৃতিক সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং নদী-খাল-জলাভূমির সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হলে পানি প্রবাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে। 

বিশেষজ্ঞদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো পোল্ডার ব্যবস্থার সংস্কার এবং টিআরএম (Tidal River Management) বা জোয়ারভাটা নির্ভর নদী ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেজেরডাঙ্গা, কপোতাক্ষ, হরি এবং শ্রী নদী অববাহিকায় পরিচালিত টিআরএম কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে নদীতে স্বাভাবিকভাবে পলি প্রবেশ ও নিষ্কাশনের সুযোগ সৃষ্টি করলে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতা হ্রাস করা সম্ভব। যদিও এই পদ্ধতির কিছু সামাজিক ও ভূমি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও এটি তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল এবং পরিবেশগতভাবে অধিক টেকসই বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নদীর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শাখা নদী ও খালের সংযোগ পুনঃস্থাপনকেও বিকল্প কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী ও খাল বর্তমানে প্রধান নদীর সঙ্গে কার্যকর সংযোগ হারিয়েছে। এসব সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা গেলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং স্থানীয় জলজ পরিবেশের উন্নতি ঘটতে পারে। বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থকরা বড়াল নদীর উদাহরণও উল্লেখ করেন। বিভিন্ন সময়ে স্লুইসগেট আংশিক উন্মুক্ত করা এবং নদীর সঙ্গে গঙ্গার সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ফলে বড়াল নদীতে পুনরায় পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার অনেক ক্ষেত্রে বৃহৎ অবকাঠামোগত হস্তক্ষেপ ছাড়াই ইতিবাচক ফল দিতে পারে। সুতরাং, সমালোচকদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট মোকাবিলায় শুধুমাত্র নতুন পানি সংরক্ষণ বা নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর না করে নদী পুনরুদ্ধার, প্রাকৃতিক প্রবাহ নিশ্চিতকরণ, টিআরএম সম্প্রসারণ, নদী-খাল পুনঃখনন এবং সমন্বিত অববাহিকা ব্যবস্থাপনার মতো বিকল্প কৌশলগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাদের মতে, নদীকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে নদীকে তার স্বাভাবিক গতিশীলতা ফিরিয়ে দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারে।

উন্নয়ন, পরিবেশ ও পানি নিরাপত্তার ভারসাম্য : পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ প্রকল্প বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ, ব্যয়বহুল এবং কৌশলগত অবকাঠামোগত উদ্যোগ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট, নদীর নাব্যতা হ্রাস, কৃষি উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি একটি সম্ভাবনাময় সমাধান হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, এর মাধ্যমে প্রায় ২৮.৮ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, বছরে অতিরিক্ত ২৪ লাখ টন ধান উৎপাদন, মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন, নদী পুনরুজ্জীবন এবং ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফলের পাশাপাশি বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্ন ও উদ্বেগও সামনে এসেছে। বিশেষ করে পদ্মার মতো উচ্চ পলিবাহী নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের ফলে পলি জমা, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব এবং ভাটির অঞ্চলে পানিপ্রবাহ হ্রাসের মতো বিষয়গুলো এখনো ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রকৃত সমস্যা পানির অভাব নাকি নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার সংকট—এই প্রশ্নও প্রকল্পটির যৌক্তিকতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও পদ্মা ব্যারাজ একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ। গঙ্গা অববাহিকার পানিবণ্টন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক পানি কূটনীতির সঙ্গে প্রকল্পটির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে প্রকল্পটির সফলতা শুধু প্রকৌশলগত সক্ষমতার ওপর নয়; বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ন্যায্য পানিবণ্টন এবং সমন্বিত অববাহিকা ব্যবস্থাপনার ওপরও নির্ভরশীল। অতএব, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং একটি পরিবেশগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এবং বাস্তবায়নকালীন সময়ে স্বচ্ছ ও স্বাধীন পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ, জনপরামর্শ এবং বিশেষজ্ঞ মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। পাশাপাশি বিকল্প পানি ব্যবস্থাপনা কৌশল, নদী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম এবং প্রাকৃতিক প্রবাহভিত্তিক সমাধানগুলোও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।বাংলাদেশের নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে পদ্মা ব্যারাজ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে এর চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, নদীর স্বাভাবিক গতিশীলতা এবং জাতীয় স্বার্থের মধ্যে কতটা কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা যায় তার ওপর। একটি নদীমাতৃক দেশের জন্য সেই ভারসাম্যই হবে টেকসই পানি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

লেখক: মুখ্য সমন্বয়কারী, সিভিক ভয়েস বাংলাদেশ।


ডেল্টা টাইমস্/এসকেএমডি বাহলুল আলম/আইইউ








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ