নগর সভ্যতার ফুসফুস হলো তার গণপরিসর বা পাবলিক স্পেস; যেখানে কংক্রিটের জঞ্জাল ছাপিয়ে শহর খুঁজে পায় প্রকৃত প্রাণশক্তি। আধুনিক নগর পরিকল্পনার সংজ্ঞায় শুধু পিচঢালা রাস্তা বা বহুতল ভবনই শহর নয়, বরং, নাগরিকের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থানের উপস্থিতিই একটি শহরের বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশের নগরায় প্রক্রিয়ায় ইট-পাথরের দালানকোঠা যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, শিশুদের খেলার মাঠ বা নাগরিকদের নিঃশ্বাস নেওয়ার পার্ক ততটাই হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ শহরের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সংকট এখন কেবল পরিকল্পনার অভাব নয়, বরং এক ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়ের দৃশ্যমান আপদ।
পরিকল্পনা বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ‘টাইম সেভার স্ট্যান্ডার্ড’ অনুযায়ী, একটি আদর্শ নগর এলাকায় প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য নির্দিষ্ট আয়তনের খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে ৩ থেকে ৬ বছর বয়সীদের জন্য ০.৫১ একর ‘প্লে-লট’, ৭ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের জন্য ১.৫০ থেকে ৩.০০ একরের ‘প্লে-গ্রাউন্ড’ এবং ১৫ ঊর্ধ্বদের জন্য ১.৫০ থেকে ১৫ একরের ‘প্লে-ফিল্ড’ থাকা প্রয়োজন।
সহজ হিসাব বলছে, প্রতি তিন থেকে পাঁচ হাজার মানুষের জনবসতির বিপরীতে অন্তত একটি করে নির্দিষ্ট বয়সভিত্তিক মাঠ থাকা উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) স্পষ্ট জানিয়েছে, সুস্থ ও সবল শরীরের জন্য প্রত্যেক ব্যক্তির ন্যূনতম ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা প্রয়োজন এবং প্রতিটি শিশুর প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা শারীরিক পরিশ্রমে সম্পৃক্ত থাকা জরুরি। অথচ আমাদের নগরে এই পরিসংখ্যানগুলো এখন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। উন্মুক্ত অবস্থায় হাতেগোনা যে মাঠগুলো রয়েছে শহরে, সন্ধ্যার পর বেশিরভাগই দখলে যায় মাদকসেবী কিশোর গ্যাংয়ের।
হলপ করে বলা যায়, মাঠের অভাব কেবল শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ কেড়ে নিচ্ছে না, বরং এটি তাদের সামাজিকীকরণের পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের শৈশব কেটেছে স্কুলের বড় মাঠে দৌড়ঝাঁপ করে, যেখানে আমরা সহমর্মিতা, নেতৃত্ব এবং দলগত সংহতির প্রাথমিক পাঠ হাতেকলমে শিখেছি। কিন্তু বর্তমানে ময়মনসিংহের অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা তথাকথিত স্কুলগুলোর অধিকাংশেরই নিজস্ব কোনো খেলার মাঠ নেই। এর ফলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম একটি ‘আইসোলেটেড’ বা বিচ্ছিন্ন পরিবেশে বেড়ে উঠছে। তারা চার দেয়ালের ভেতর বন্দি থেকে সমাজ ব্যবস্থার বাস্তব চরিত্র বা মানবিক সম্পর্কগুলো সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকছে। এই মাঠহীন জীবনই শিশুদের মাঝে চরম অবসাদগ্রস্ততা তৈরি করছে, যা তাদের ঠেলে দিচ্ছে অনলাইন গেমের আসক্তি কিংবা মাদকের মরণব্যাধির দিকে। তাই যে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব খেলার মাঠ নেই, তাদের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। শুধুমাত্র কেতাবি শিক্ষা দিয়ে কোনো শিশুর সুষম বিকাশ সম্ভব নয়।
খেলার মাঠের মতোই আমাদের নগর পরিকল্পনা দর্শনে পার্কের শ্রেণিবিভাগও চরমভাবে উপেক্ষিত। একটি পরিকল্পিত নগরীতে তিন ধরনের পার্ক থাকা দরকার, মহল্লাভিত্তিক ‘নেইবারহুড পার্ক’, এলাকাভিত্তিক ‘কমিউনিটি লেভেল পার্ক’ এবং পুরো শহরের জন্য বিশাল ‘আরবান বা সিটি পার্ক’। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের ময়মনসিংহের বিদ্যমান উন্নয়ন দর্শনে এই ধরনের শ্রেণিভিত্তিক পরিকল্পনার কোনো প্রতিফলন নেই। এমনকি সিটি কর্পোরেশন পর্যায়েও খেলার মাঠ বা পার্কের সঠিক সংখ্যা ও বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্যের বড় অভাব রয়েছে। নেই এই বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ। গণপরিসরের বিষয়টি আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে প্রায় মুছে গেছে। প্রশাসনের চিন্তা শুধু জমি অধিগ্রহণ পূর্বক নতুন স্টেডিয়াম তৈরির দিকে সীমাবদ্ধ।
এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের এখনই সক্রিয় হতে হবে। বিশেষ করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা জরুরি। ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর যদি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থেকে নিজ নিজ এলাকায় আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত একটি পরিকল্পিত পার্ক বা খেলার মাঠ তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন, তবেই এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন সম্ভব।
শহর মানে কেবল মানুষের ভিড় নয়, শহর মানে মানবিক বিকাশের কেন্দ্রস্থল। আমরা যদি আমাদের উত্তরসূরীদের জন্য মুক্ত আকাশ আর দৌড়ানোর সবুজ মাঠ নিশ্চিত করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে আমরা একটি পঙ্গু সমাজ পেতে যাচ্ছি। শিশুদের সুন্দর শৈশব ফিরিয়ে দিতে এবং একটি সুস্থ ও বাসযোগ্য নগরী গড়তে পরিকল্পনার প্রতিটি স্তরে গণপরিসরকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এখন কেবল প্রয়োজন নয়, বরং বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
লেখক: পরিকল্পনাবিদ এবং সদস্য সচিব, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি), ময়মনসিংহ জেলা কমিটি।
ডেল্টা টাইমস্/ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল/সিআর/আইইউ