সৃষ্টির সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাস আদম সন্তানের রক্তে রঞ্জিত। নিজেদের মহত্ত্ব প্রকাশের দরুন বলি হয়েছে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ। ক্ষমতার অতি উচ্চ আকাক্সক্ষা বা অপরের ওপর নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করতে যুগে যুগে মরিয়া হয়ে ছিল শাসক শ্রেণি। যার ফল লাখ লাখ নিরীহ মানুষের রক্তে জমিন রঙিন হওয়া। যুদ্ধের সূচনা শাসক শ্রেণির হাতে হলেও প্রাণনাশ ঘটে অতি সাধারণ মানুষের। বর্তমান বিশ্বের ইতিহাসও এই ধারাবাহিকতার বাইরে নয়। এরই মধ্যে বিশ্ববাসী দুটো মহাযুদ্ধের ধ্বংসলীলার সাক্ষী হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, প্রতিনিয়ত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার মানুষ বলি হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের নোংরা থাবার। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ইউক্রেন-রাশিয়ার চলমান সংকট। তার সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে অনাকাঙ্খিত ইরান- ইসরায়েল যুদ্ধ। যদিও এই যুদ্ধের যোগান দাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্ব মোড়লদের সাম্র্যজ্যবাদী মনোভাবের ঘৃণ্য ফলাফল যুদ্ধের করুণ শিকার হাজার হাজার সাধারণ জনতা। যুদ্ধ মানব ইতিহাসের জন্য একটি অভিশাপ। এই অভিশাপ অনাকাক্সিক্ষতভাবেই চলে আসে আমাদের ওপর। বাংলাদেশ যখনই কোনো নতুন সম্ভাবনার মুখোমুখি হয়, তখনই কিছু একটা সমস্যা এসে এলোমেলো করে দেয় সব। নিকট অতীতে দেশের অর্থনীতি যখন করোনা মহামারীর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে দৃশ্যমানভাবে পুনরুদ্ধার লাভ করতে যাচ্ছিল, তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ডামাডোলে নতুন সংকটের মুখে পড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশে আমদানি করা গম, ভোজ্যতেল, পোলট্রি খাবারের মূল উপাদান ভুট্টা, রাসায়নিক সার, তেল-গ্যাস সব ধরনের পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিরূপ প্রভাবের আঘাত সইতে হয় বাংলাদেশকে, যা এখনো চলমান।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরেক দফা চাপ পড়ে ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে পুঞ্জীভূত বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি ও সংকটের উদ্ঘাটিত বাস্তবতা ও ফলাফলের ওপর উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে বিনিয়োগ স্থবিরতা-ইত্যাকার কারণে প্রত্যাশিত গতি সঞ্চার করার পরিবর্তে সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছিল দেশের অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির ধ্রুপদি দাওয়াই কাজে আসেনি, বেড়েছে দারিদ্র্যের হার। ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নেমে প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।আওয়ামী সরকার আমলে স্বজনতোষণের অর্থনীতি,ব্যাপক দুর্নীতি,বাজার সিন্ডিকেট ও মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল যে প্রবল ক্ষোভ। ২০২২ সালের দারিদ্র্যের হার ১৮ থেকে বেড়ে চলে গিয়েছিল ২৮ শতাংশের কাছাকাছি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন ঠেকানো গেলেও তাতে সরকারের কৃতিত্বের চেয়ে বেশি অবদান রেখেছিল বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে হ্রাসকৃত আমদানি এবং প্রবাসীদের বর্ধিত রেমিট্যান্স। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের বিপুল আশাবাদের মধ্যে একক দল হিসেবে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। দীর্ঘ ২০ বছর পর নবোদ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের দুই সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই শুরু হয় ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ, যার পক্ষভুক্ত হয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ক্ষমতাধর দেশও। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে যে ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার ষোলোকলা পূর্ণ হয় যেন। এ যুদ্ধের অভিঘাতে ইরান ছাড়াও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, সংযুক্ত আমিরশাহি ও কাতার। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ায় এসব দেশ থেকে জ্বালানি তেল ও তরল গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে কিংবা কমে গেছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়।
বিশ্বের মোট তেল ও তরল গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ২০২৫ সালে এ পথ ব্যবহার করে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রফতানি হয়েছে বিভিন্ন দেশে, যা ছিল মোট জ্বালানি সরবরাহের ৩১ শতাংশ। সুতরাং ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী পারস্য উপসাগর ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা প্রায় ১৫০ কিলোমিটারের বাঁকানো জলপথটি বন্ধ হওয়া কিংবা স্বাভাবিক পরিবহন ব্যবস্থার বিঘ্ন বিশ্ব অর্থনীতিতে ডেকে আনবে বিশ্ব তেলের বাজারের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তেল কিংবা তরলীকৃত গ্যাসের জাহাজ বহির্বিশ্বে যাওয়ার জন্য হরমুজ প্রণালি ছাড়া দ্বিতীয় বিকল্প পথ আর নেই। ফলে উপসাগরীয় তেল ও তরল গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হবে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, চীন, জাপান, কোরিয়া প্রভৃতি দেশও।বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের একটা বিশাল অংশ আসে আরব বিশ্বে কর্মরত ৫৫ লাখেরও বেশি জনশক্তি থেকে। এদের মধ্যে কেবল সৌদি আরবেই বাস করে ৩৫ লাখ বাংলাদেশী, তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের বার্ষিক পরিমাণ ৫০০ কোটি ডলার। সুতরাং আমাদের প্রবাসী আয়ের ৭৫ শতাংশই যেখানে আরব বিশ্ব থেকে আসে, সেখানে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে প্রবাসী আয়ের ওপর কতখানি বিরূপ প্রভাব পড়বে, সেটা সহজেই অনুমেয়।বিরূপ প্রভাব কেবল এ দুই খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটির ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া অনুভূত হবে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, স্বাভাবিক বাণিজ্যপ্রবাহে বিঘ্ন, মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মচ্যুতির ফলে রেমিট্যান্স আয়ে ভাটা, রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারানো, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সর্বোপরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপের মধ্য দিয়ে। সরকার এখনো ভর্তুকির চাপ কমানোর কথা চিন্তা করছে না, কিন্তু সরকারি রাজস্ব আহরণের যে হাল, তাতে কতদিন বাড়তি চাপ সামাল দেয়া যাবে তাতে সংশয় আছে।
সর্বশেষ ৩১ মার্চ খবরে জানা যায় অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৩ ডলার, জানুয়ারিতেও যা ছিল ৬৫ ডলারের ঘরে। এক গবেষণা রিপোর্ট থেকে জানা যায় এ দাম যদি ১২০ ডলার ছাড়ায়, তাহলে বছরে জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের খরচ বেড়ে যাবে ৬১ হাজার কোটি টাকা। অন্য এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার বাড়তি দাম যদি এক বছর স্থায়ী হয়, তবে বাংলাদেশের আার্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২০২৪ সালের মোট জিডিপির ১ শতাংশের সমান। যুদ্ধ যদি প্রলম্বিত হয়, তাহলে আগামী দুই বছরে জিডিপি ৩ শতাংশ কমবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং, সানেম। ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যে তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো সংস্কার করে আগের উৎপাদনক্ষমতা পুনর্বহাল করতে কত সময় লাগবে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এক মাসের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের নয়টি দেশের কমপক্ষে ৪০টি তেল ও গ্যাস স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী এক সরবরাহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার। ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমান সংকটের ভয়াবহতার পরিমাণ ১৯৭০ সালের তেল এবং ২০২২ সালের কভিড-পরবর্তী গ্যাস সংকটের সম্মিলিত ক্ষতির সমান হবে। ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্রবাহী গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাতারের লাস রাফান শিল্পশহরের তরল গ্যাস স্থাপনাটির উৎপাদন কমে গেছে ২০ শতাংশ, যা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতে তিন-পাঁচ বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। বর্তমান সরকারের সামনের চ্যালেঞ্জগুলোকে আরো কঠিন করে দিয়েছে ইরান যুদ্ধ। অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাহীন অদক্ষতার ফলে রেখে যাওয়া জঞ্জাল পরিষ্কার করার পাশাপাশি সরকারের ওপর মানুষের প্রত্যাশার অতিরিক্ত চাপ মোকাবেলা করা খুব সহজ কাজ হবে না।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিএনজিচালিত যানবাহন ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ, জ্বালানির ওপর কর প্রত্যাহার, অফিসে না গিয়ে বাড়ি থেকে কাজ করা, গাড়ির ইঞ্জিনের আকার অনুযায়ী তেলের রেশনিং ব্যবস্থা, সরকারি স্থাপনা ও অফিসের অপচয় রোধের মতো বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ তেল সরবরাহ বৃদ্ধির ব্যর্থ চেষ্টার বদলে চাহিদা কমানোর উদ্যোগ হবে অনেক বেশি সহজ ও ফলপ্রসূ। কিন্তু সরকার যদি স্বীকারই না করে যে দেশে জ্বালানি সংকট আছে, তাহলে পরিস্থিতির আশু উন্নতির কোনো সম্ভাবনা নেই। বিভিন্ন দেশে গৃহীত স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থাগুলো অনুসরণের পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে রাজস্ব আদায় ব্যবস্থার সংস্কার ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে কর-জিডিপির হার গ্রহণযোগ্য মাত্রায় উন্নীত করতে হবে, গতি আনতে হবে নবায়নযোগ্য শক্তি সংগ্রহ ও উৎপাদনে, রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য আরব বিশ্বের বাইরের বিভিন্ন দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, দেশের তরুণদের জন্য প্রয়োজনীয় বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও বিদেশী ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বিদেশী শ্রমবাজারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো যায়, বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কথার ফুলঝুরি ছড়ানোর পরিবর্তে কার্যকর করতে হবে ঘোষিত সব ধরনের প্রণোদনা। এ ব্যাপারে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিও গুরুত্বপূর্ণ, কেবল তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর না করে রফতানি বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিতে হবে। ওপরের তাত্ত্বিক আলোচনায় এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে, চলমান সংকট শুধু দুটো দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাদের পরস্পরের বিরোধ আজ বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিয়েছে। যার বিরূপ প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে সীমানা থেকে সীমানায়। অসহায় করে তুলছে পৃথিবীর শান্তিকামী লাখো জনতাকে। মানব ইতিহাসের কোনো সংঘাতই শান্তির বার্তা বয়ে আনতে পারেনি। এই অনাকাক্সিক্ষত সংকট যা সৃষ্টি করেছে তা হলো শুধু রক্তাক্ত, মলিন আর কান্নার জর্জরিত ইতিকথা। সুতরাং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের সংঘাত এড়িয়ে সমতা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসা উচিত।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।
ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই