বৈশ্বিক শান্তিচুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা

রায়হান আহমেদ তপাদার:

মতামত

একসময় ওয়াশিংটনের অনেকেই যা ঘটতে দিতে চাননি। নেতানিয়াহু আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে টেনে এনেছেন। এর আগে এমনটি ঘটেছিল

2026-04-02T10:04:02+06:00
2026-04-02T10:04:02+06:00
বুধবার, ০৮ এপ্রিল, ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২

বৈশ্বিক শান্তিচুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:০৪ এএম   (ভিজিট : ৭৬)

একসময় ওয়াশিংটনের অনেকেই যা ঘটতে দিতে চাননি। নেতানিয়াহু আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে টেনে এনেছেন। এর আগে এমনটি ঘটেছিল ২০০৩ সালে। যুক্তরাষ্ট্র তখন ইরাকে আক্রমণ করেছিল। সেই যুদ্ধের পেছনে ছিল নব্যরক্ষণশীলদের নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি নামের রাজনৈতিক চেতনা। ইরাক আক্রমণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মার্কিন বাহিনী সাদ্দাম হোসেনের দুর্বল হয়ে পড়া সরকারকে উৎখাত করে। কিন্তু প্রথমে এটাকে বিজয় মনে করা হলেও দ্রুতই বাস্তবতা ভিন্নরূপ নেয়। বাগদাদের পতন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আধিপত্যের বদলে তা দীর্ঘ বিদ্রোহ, অস্থিরতা ও অন্তহীন যুদ্ধের সূচনা হয়ে দাঁড়ায়। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়েছে। হাজার হাজার মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।বিশ্বের অনেক জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাও কমেছে। এই অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বারাক ওবামা ক্ষমতায় এসেছিলেন ইরাক যুদ্ধের ভুল স্বীকার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। তখন মার্কিন রাজনৈতিক অভিজাতদের বড় একটি অংশ মনে করতে শুরু করেছিল যে, ইরাক আক্রমণ ছিল গুরুতর ভুল। এমন কিছুর পুনরাবৃত্তি আর কখনো করা উচিত নয়। পরে একই অসন্তোষের ঢেউ থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পও ক্ষমতায় আসেন। তিনি নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র আর মধ্যপ্রাচ্যের অন্তহীন যুদ্ধে জড়াবে না। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সমঝোতার কিছু প্রধান বিষয়ে একমত হয়েছে। এর পরপরই তিনি দাবি করেন, তেহরান জ্বালানি তেল, গ্যাস এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ে বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি হয়েছে। ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি এই বিবৃতিগুলো আন্তর্জাতিক মহলে গভীর কূটনৈতিক আশাবাদ তৈরি করেছে। যার প্রভাবে বিশ্ববাজারেও একধরনের স্বস্তি লক্ষ করা যাচ্ছে। 

তবে এই আশাবাদ ভিন্ন পরিস্থিতিকে গুলিয়ে ফেলছে। তা হলো যুদ্ধের ফলে এমন এক অচলাবস্থা তৈরি হওয়া, যেখানে লড়াই চালিয়ে যাওয়া উভয় পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর এবং এমন একটি টেকসই কাঠামো তৈরি করা, যার মাধ্যমে স্থায়ী শান্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। বর্তমানে এই  পরিস্থিতির একটি লক্ষণ স্পষ্ট হলেও অন্যটি এখনো পুরোপুরি অনুপস্থিত। মার্কিন গবেষকদের মতে, কোনো যুদ্ধে সমঝোতার সুযোগ তখনই তৈরি হয়,যখন লড়াইয়ের ময়দানে উভয় পক্ষই এমন ক্ষতির শিকার হয়, যা কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্তমানে এ পরিস্থিতির লক্ষণ উভয় পাশেই দেখা যাচ্ছে। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং তাদের নৌ সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড দেশটির নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্বকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিপরীত দিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সারা বিশ্বে তেলের যে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, তাকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের সংকটের চেয়েও ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছে। এ সংকটের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে। এই বহুমুখী চাপই বর্তমানের কূটনৈতিক সংকেতগুলোর পেছনের মূল চালিকা শক্তি। তবে এর মানে এই নয় যে উভয় পক্ষের মধ্যকার দীর্ঘদিনের আস্থার সংকটটি মিটে গেছে। যুদ্ধের ইতিহাসে দেখা যায়, একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় একে অপরের প্রতি অঙ্গীকার পালনের অযোগ্যতা। কিন্ত ইরান যুদ্ধে এ সংকট আরও প্রকট। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ওমানের মধ্যস্থতায় পরমাণু সমঝোতা প্রায় হাতের নাগালে ছিল, তখনই ইরানে সামরিক অভিযান শুরু হয়। আলোচনার মাঝপথে এ হামলা যেকোনো ভবিষ্যৎ কূটনীতির বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধসিয়ে দিয়েছে। 

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পরিষ্কার করে বলেছেন যে তেহরান কেবল সাময়িক যুদ্ধবিরতি চায় না; বরং তারা সংঘাতের চিরস্থায়ী অবসান এবং ভবিষ্যতে যেন এমন আক্রমণ আর না ঘটে, সেটির আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা চায়। ইরানের এ অবস্থান অত্যন্ত যৌক্তিক। একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নিজেদের শক্তি বাড়াতে পারবে। অন্যদিকে অবরোধের মুখে ইরান নিজের সক্ষমতা বাড়াতে ব্যর্থ হবে। ফলে আলোচনার টেবিলে সমঝোতা না হলে ইরানকে দুর্বল অবস্থানে থেকে আবারও যুদ্ধের মোকাবিলা করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ট্রাম্প যে ১৫ দফার পরিকল্পনা দিয়েছেন, সেটি মূলত যুদ্ধ জয়ের একটি তালিকামাত্র। চুক্তির ভিত্তি হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা সামান্য। তবে ট্রাম্পের বর্তমান বিবৃতিগুলোর একটি রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। তিনি প্রচার করছেন যে ইরানের সরকার পরিবর্তনের যে লক্ষ্য ছিল, তা পূরণ হয়েছে। এ অবস্থানের মাধ্যমে তিনি মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজের সামরিক সফলতার গৌরব নিশ্চিত করে যুদ্ধের ময়দান থেকে একটি সম্মানজনক প্রস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন।যেকোনো সফল সমঝোতা মূলত সময়ের গুরুত্ব অনুসারে ধাপে ধাপে এগোয়। প্রথম ধাপে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এতে বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকি কমে আসবে। অন্যদিকে পরমাণু সমস্যার মতো জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি বিষয়গুলো একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে পরে সমাধান করা যেতে পারে। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়। আর তা হলো এই চুক্তির জামিনদার কে হবে? পাকিস্তান, তুরস্ক বা মিসর এই অঞ্চলে প্রভাবশালী হলেও ইরানের কাছে তাদের সুরক্ষা প্রদানের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। তেহরান এমন এক আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা চায়, যা ভাঙার ক্ষমতা কারও থাকবে না। আর এ জায়গায় চীনের নাম সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। 

চীনের জ্বালানিনিরাপত্তার বড় অংশ এই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে তাদের গভীর কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, যা অন্য অনেক দেশের নেই। একটি সফল শান্তিচুক্তির জন্য বেইজিংকে নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী পক্ষ হিসেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধীনে নিয়ে আসা প্রয়োজন। এতে চুক্তির মর্যাদা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে। কেবল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা এই জটিল সংকটের টেকসই সমাধান দিতে পারবে না। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অংশগ্রহণও জরুরি। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো রাষ্ট্রগুলোকে এ আলোচনায় সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কারণ, তারা এই সংকটের অংশীদার এবং তাদের নিরাপত্তা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে এই অংশীদারত্ব একটি সহজ বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। সহযোগিতা ও প্রবেশাধিকার থাকবে এবং বিনিময়ে থাকবে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এখন চাপের মুখে। ইসরায়েলের কৌশলের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এমন এক পথে এগোচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রভাবের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তত স্পষ্ট হবে একটি বৈপরীত্য। ইসরায়েলের লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেই অঞ্চলে নিজের অবস্থান দুর্বল করছে, যে অঞ্চল বহুদিন ধরে তার বৈশ্বিক শক্তিকে জোরদার করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে এখন একটি শিক্ষা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যে ব্যবস্থাকে তারা নিরাপত্তার গ্যারান্টি মনে করেছিল, সেটিই এখন তাদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে ইরান নয়, বরং ইসরায়েলকে ঘিরেই। তাদের কৌশল অনুসরণ করা কি সত্যিই ওয়াশিংটনের স্বার্থ রক্ষা করছে, নাকি ধীরে ধীরে সেটিকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com