বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি ডোনাল্ড ট্রাম্প

রায়হান আহমেদ তপাদার:

মতামত

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ এক মাস পেরিয়ে গেল।তবে এ যুদ্ধ শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, পুরো

2026-04-05T09:50:40+06:00
2026-04-05T09:50:40+06:00
মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল, ২০২৬, ২৪ চৈত্র ১৪৩২

বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি ডোনাল্ড ট্রাম্প
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: রোববার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:৫০ এএম   (ভিজিট : ৪৩)

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ এক মাস পেরিয়ে গেল।তবে এ যুদ্ধ শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে পুরো অঞ্চলে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। একের পর এক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে, ঘরবাড়ি হারিয়ে পথে বসছে হাজারো পরিবার। সম্প্রতি জাতিসংঘের এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানি রেড ক্রিসেন্টের প্রতিনিধিদলের প্রধান মারিয়া মার্টিনেজ এক হৃদয়বিদারক তথ্য জানান। তিনি বলেন, ইরানজুড়ে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ধসে পড়া ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত ব্যক্তিদের উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন চিকিৎসাকর্মীরা। উদ্ধার তৎপরতা চালানোর সময় অনেক উদ্ধারকর্মী সেখানে নিজেদের পরিবারের সদস্যদের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। কিন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে, দৃশ্যমান এসব ঘটনার কোন কিছুই ডোনাল্ড ট্রাম্পের হৃদয় স্পর্শ করতে পারেনি।যুদ্ধক্ষেত্রে এখনো অনিশ্চয়তার কুয়াশা ঘন। এই যুদ্ধ সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই এখনো অস্পষ্ট। সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর জবাব যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন এখনো দেয়নি। বিশেষ করে প্রশ্ন হচ্ছে, এই যুদ্ধ শেষ হবে কীভাবে? এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক ঝুঁকির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিণতি কী হতে পারে? ইতিহাস বলছে, স্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য ছাড়া শুরু হওয়া যুদ্ধ সাধারণত ভালোভাবে শেষ হয় না। যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অস্পষ্ট বা বিতর্কিত থাকে, তখন যুদ্ধের কোনো যৌক্তিক শেষ সীমা নির্ধারণ করা যায় না। সামরিক সাফল্যের পরই প্রশ্ন ওঠে-এরপর কী করা হবে। এই কৌশলগত অস্পষ্টতা ইরানের জনগণের একটা অংশ এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী উভয়কেই কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। ধর্মনিরপেক্ষ ইরানিরা খামেনির মৃত্যুকে উদ্‌যাপন করেছে এবং শাসনব্যবস্থার পতন দেখতে চায়। তবে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করেন, শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা এখনো কম। 

কিন্তু যদি বর্তমান ইসলামি সরকারবিরোধী ইরানিরা ট্রাম্পের দাবি করা ঐতিহাসিক সুযোগ কাজে লাগাতে রাস্তায় নেমে আসে এবং সরকার কঠোর দমন-পীড়ন শুরু করে তখন কী হবে? চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকার বিক্ষোভ দমনে হাজারো বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছিল। এমন পরিস্থিতি আবার ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র কী করবে? ইতিহাস এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দেয়। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ.ডব্লিউ.বুশ ইরাকিদের বিদ্রোহে উৎসাহ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেইন যখন সেই বিদ্রোহীদের নির্মমভাবে হত্যা করছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র দূর থেকে তা দেখেছিল। আবার ২০১১ সালে লিবিয়ায় বিপরীত ঘটনা ঘটেছিল।তখন ওবামা প্রশাসন স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বেসামরিক মানুষদের রক্ষায় সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল। কিন্তু সেই শাসন পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রব্যর্থতা ও গৃহযুদ্ধের দিকে গড়ায়। আজ যদি ইরানের ইসলামি শাসনের বিরোধীরা বিদ্রোহ করে এবং সরকার কঠোর দমন শুরু করে, তাহলে ট্রাম্পও সেই একই ধরনের দ্বিধায় পড়বেন। তিনি যদি হস্তক্ষেপ না করেন,তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যদি সম্পূর্ণভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে সংঘাতের পরিধি বাড়বে, দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি হবে এবং পরিস্থিতি বিশৃঙ্খলার দিকে যেতে পারে। এই দ্বিধা সমাধান করার পরিবর্তে ট্রাম্প প্রশাসন যেন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিকল্প কৌশল হিসেবে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজন উসকে দেওয়ার দিকেও ঝুঁকছে বলে মনে হচ্ছে।বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিআইএ উত্তর ইরাকে অবস্থানরত ইরানি কুর্দি মিলিশিয়াদের অস্ত্র সরবরাহ করছে। একই সময়ে ইসরায়েল ইরান-ইরাক সীমান্তের কাছাকাছি চৌকি, পুলিশ স্টেশন ও সামরিক অবস্থানগুলোতে হামলা চালাচ্ছে, যাতে সীমান্তপথ খুলে দেওয়া যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি হয়তো এই পরিকল্পনা থেকে সরে আসছেন। তবে ইসরায়েল এখনো সে পথে এগোচ্ছে বলে মনে হয়। তাদের অনেক নেতার কাছে শাসন পরিবর্তন সম্ভব না হলে ইরানকে অস্থিতিশীল করে তোলা একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প বলে মনে হচ্ছে। এতে দেশটি লিবিয়া, সিরিয়া বা ২০০৩-এর পরবর্তী ইরাকের মতো খণ্ডিত ও দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।কিন্তু প্রায় ৯কোটি মানুষের এই দেশটি ইউরেশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সংযোগস্থলে অবস্থিত। সেখানে রাষ্ট্রীয় ভাঙন সৃষ্টি হলে তা শুধু ইরানের জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চল এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্যও গভীর অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। যুদ্ধের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্নের বাইরে আরও বড় প্রশ্ন রয়েছে। সেগুলো হলো বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার ওপর এর প্রভাব কী হবে। যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন নাকি সতর্ক করেছিলেন যে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ ও তীব্র সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রভান্ডার দ্রুত ফুরিয়ে দিতে পারে। এতে অন্য অঞ্চলে সম্ভাব্য হুমকির মোকাবিলার প্রস্তুতি দুর্বল হয়ে পড়বে। যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনেই সেই আশঙ্কার সত্যতা দেখা গেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে দূরপাল্লার হামলা চালানোর গোলাবারুদ এবং উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার করে ফেলেছে। মার্কিন অস্ত্রভান্ডার আগেই চাপের মধ্যে ছিল, আর প্রতিরক্ষা শিল্পও দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। ভবিষ্যতে চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির দিক থেকেও এটি একটি বড় ঝুঁকি। ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে ইরানে সামরিক সাফল্য অর্জন করলেও যুক্তরাষ্ট্র অন্য কোথাও বড় আক্রমণ ঠেকানোর সক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে আরেকটি সম্ভাবনা। 

বড় ধরনের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও কয়েক মাস বা এমনকি কয়েক বছর মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সংখ্যক মার্কিন সেনা মোতায়েন রাখতে হতে পারে। তাদের দায়িত্ব হবে যুদ্ধ-পরবর্তী নিয়ন্ত্রণ অভিযান পরিচালনা করা, উদ্বিগ্ন উপসাগরীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করা এবং ইরান যখনই আবার সামরিক শক্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করবে, তখন নতুন করে হামলা চালানো। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। সেই যুদ্ধের পরে সাদ্দাম হুসেইনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি তৈরি হয়, যা আজও বিদ্যমান। আজ যে যুদ্ধের সমর্থকেরা দাবি করছেন যে তারা ইরানের হুমকি একেবারে শেষ করে এই ধরনের জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসবেন, বাস্তবে ওয়াশিংটন আবার সেই একই পথের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।এখানে এক ধরনের বেদনাদায়ক বৈপরীত্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির প্রদর্শন নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো তা লক্ষ্য করবে। কিন্তু একই সঙ্গে এই যুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে পড়বে। অস্ত্রভান্ডার কমে যাবে, বাহিনী বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে এবং কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে আগামী কয়েক বছরে চীন ও রাশিয়ার মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকতে পারে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে। চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে দুটি বড় সামরিক অভিযান চালিয়েছে-ভেনেজুয়েলা ও ইরানের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই দুই ক্ষেত্রেই বিস্তৃত আন্তর্জাতিক জোট, জাতিসংঘের অনুমোদন বা শক্ত আইনি ভিত্তি ছিল না। ট্রাম্প প্রশাসন পার্লামেন্টের ভোট ছাড়াই এই যুদ্ধ শুরু করেছে। এমনকি ইরাক যুদ্ধের আগে যেমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল, তেমনভাবে মার্কিন জনগণের কাছেও এই যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হয়নি।

ওদিকে মস্কো ও বেইজিংয়ের নেতারা এই সংঘাতকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার ধারণার বিরোধিতা করছেন বলে নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত নিয়মের বাইরে একতরফাভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেয়,তাহলে ভবিষ্যতে রাশিয়া প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে আরও আগ্রাসন চালালে বা চীন তাইওয়ানে হামলা করলে তাদের সমালোচনা করার নৈতিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দুর্বল হয়ে পড়বে।আজ যুক্তরাষ্ট্র যে আন্তর্জাতিক নিয়মগুলো ক্ষয় করছে, ভবিষ্যতে অন্যদের তা মানতে বাধ্য করার ক্ষমতাও তখন কমে যাবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত বা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির একটি ধোঁয়াশাচ্ছন্ন পরিস্থিতির দিকে মোড় নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই যুদ্ধের শেষ পরিণতি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক অস্থিরতা অথবা হঠাৎ কোনো বড় ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে হতে পারে। তবে সময়ই বলে দেবে কোনদিকে এগুচ্ছে যুদ্ধের এই যাত্রা। 

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই








  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com