দেশের জনগণের প্রতি সরকারের দায়িত্ববোধ কিংবা মানুষ হিসেবে মানবিক সেবা ও কর্তব্যের ন্যূনতম ছোঁয়া হারিয়ে দেশের স্বাস্থ্যসেবা এখনো অনেকের জন্য ভাগ্যনির্ভর হয়ে আছে, নাগরিক অধিকার হিসেবে নয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে গত তিন দশকে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, গ্রাম-শহরে হাসপাতাল ও চিকিৎসক সংখ্যা বাড়লেও এ সাফল্যের আড়ালে আজও রয়েছে চরম নাগরিক বঞ্চনার বাস্তবতা এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির কালো হাত। সরকারি হাসপাতালের নাজুক অবস্থা ও পর্যাপ্ত ডাক্তারের অভাব, রোগীর কষ্ট, চিকিৎসক-সহায়ক কর্মীদের অনীহা, রোগীকে হাসপাতালে মনোযোগ দিয়ে না দেখে বাইরে নিজ চেম্বারের ঠিকানা দেয়া, অপ্রয়োজনীয় টেস্ট ও ওষুধের চাপ, এসব আজ আমরা প্রায়ই দেখছি ও শুনছি। এমনকি বলতে গেলে আমরা নিজেরাই এর জ্বলন্ত সাক্ষী এবং ভুক্তভোগী। বাধ্য হয়েই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী দেশের বেসরকারি হাসপাতালে ও বিত্তশীলরা বিদেশে চিকিৎসা করাতে যাচ্ছে। দেশে স্বাস্থ্য খাতের জন্য চমৎকার নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঘাটতি প্রকট। দুই হাজার পঁচিশ-ছাব্বিশ অর্থবছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা গত বছরের থেকে সামান্য কমেছে। একই সময়, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তির প্রত্যক্ষ ব্যয় মোট খরচের প্রায় ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ জনগণ কর দিয়েও সরকারি চিকিৎসাসেবায় মূল্যায়িত হয় না, বরং বারবার তাদের পকেট থেকেই খরচ করতে হয়। এক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের ফুল-টাইম চিকিৎসকদের জন্য নীতি থাকতে হবে যাতে তারা বেসরকারি হাসপাতালে চেম্বার না করে সরকারি হাসপাতালে রোগী দেখেন এবং এজন্য ওভারটাইম বা ভর্তুকির ভিত্তিতে অতিরিক্ত টাকা পান।
বেসরকারি ও সরকারি উভয় খাতে চিকিৎসক-পরামর্শ ফি, টেস্ট ফি ও রিপোর্ট দেখা ফি নির্ধারণ করে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। এদিকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও বেশি হলেও মান ও নৈতিকতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ।অথচ সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা খাত গড়ে তোলার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো দেশের সর্বত্র প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থাকতে হবে। কিন্তু দেশের স্বাস্থ্য খাতের দিকে তাকালে দেখা যায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার এক দুর্দশাগ্রস্ত চিত্র। যদিও একসময় এ লক্ষ্যে পুরো দেশে উপজেলা পর্যায়ে গড়ে তোলা হয় কমিউনিটি ক্লিনিক। বর্তমানে ১৪ হাজারের অধিক কমিউনিটি ক্লিনিক আছে, যার বেশির ভাগই ওই লক্ষ্য পূরণে অকার্যকর। এত বিপুলসংখ্যক ক্লিনিকে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ এগুলো নানা সমস্যায় জর্জরিত। কোনোটায় ওষুধ সংকট তো কোনোটার কার্যক্রম চলছে পলেস্তারা খসে পড়া, ফাটলযুক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে। অনেক ভবনে বর্ষায় পানি উঠে যায়, অনেকগুলোয় রয়েছে জনবল সংকট। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর চিত্র মূলত পুরো দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার প্রতিফলন। সর্বত্র অব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতার অভাব। এক ধরনের বিশৃঙ্খলা এ খাতে স্পষ্ট। ফলে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা খাত গড়ে তোলার যাত্রায় দেশ অনেক সম-অর্থনীতির দেশের তুলনায় এখনো পিছিয়ে আছে।দেশে গত কয়েক দশকে স্বাস্থ্য সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে-শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, গড় আয়ু বেড়েছে এবং টিকাদান কর্মসূচিতে সফলতা এসেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যসেবায় কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। এছাড়া সেবাপ্রাপ্তির বৈষম্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে, যা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা খাত গড়ে তোলার অন্যতম অন্তরায়। তাই টেকসই ও সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা খাত নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা স্বাস্থ্যসেবা খাতের বড় সীমাবদ্ধতা। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। ফলে রোগীরা অনেক ধরনের প্রাথমিক রোগের চিকিৎসার জন্য সরাসরি জেলা বা বড় শহরে অবস্থিত হাসপাতালে চলে যান। এতে একদিকে বড় হাসপাতালগুলোয় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, অন্যদিকে রোগীদের সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় ঘটে। আর একটি কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় এ সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত রয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার এ দুর্বলতার কারণে এ খাতে মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে বাড়তি ব্যয় করতে হয়। বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই হয় নাগরিকের ব্যক্তিগত আয় থেকে। অর্থাৎ অসুস্থ হলে অধিকাংশ মানুষকে নিজেদের সঞ্চয় বা ঋণ করে কিংবা সম্পদ বিক্রি করে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হয়। এ ধরনের ব্যয় অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ বাস্তবতা প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায়ও উদ্বেগজনক। উদাহরণ হিসেবে ভারত, শ্রীলংকা বা থাইল্যান্ডের চিকিৎসা ব্যবস্থার কথা বলা যায়। তারা ক্রমেই সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়িয়ে এবং স্বাস্থ্য বীমা বা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করে এ খাতে ব্যক্তিগত ব্যয়ের চাপ কমানোর চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের ইউনিভার্সাল হেলথ কাকভারেজ স্কিমকে অনেক দেশ সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করে। শ্রীলংকাও দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে তুলনামূলক কম ব্যয়ে নাগরিকদের সেবা দিতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ খাতে সরকারি ব্যয় এখনো তুলনামূলকভাবে কম এবং স্বাস্থ্য বীমা বা আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও সীমিত পরিসরে রয়েছে।
ফলে আর্থিক সক্ষমতাজনিত এক ধরনের বৈষম্য গড়ে উঠেছে স্বাস্থ্য খাতে। অর্থাৎ এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। আর যেখানে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তিমূলকই নয়, সেখানে সর্বজনীন হওয়ার বিষয়টি আরো দূরেই রয়ে যায়। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার এ পরিস্থিতির বিপরীতে এ খাতে বেসরকারি খাতের ভূমিকা বাংলাদেশে দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু এ খাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এখনো দুর্বল। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা ব্যয় অত্যন্ত বেশি, আবার সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সঠিক নীতিমালা ও তদারকির মাধ্যমে এ খাতকে আরো দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করা প্রয়োজন।এর বাইরে রয়েছে এ খাতে মানবসম্পদের ঘাটতি। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা দেশের জনসংখ্যার তুলনায় এখনো কম। গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় এ সংকট আরো প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি বা দায়িত্ব পালনে অনীহাও রোগীদের সেবা পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং তাদের যথাযথভাবে মাঠপর্যায়ে নিয়োগ ও ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।এসব পরিস্থিতি স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা তথা সুশাসনের ঘাটতি ফুটিয়ে তোলে। এমন প্রেক্ষাপটে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।এর পাশাপাশি ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়ন, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি, গবেষণালব্ধ তথ্যকে নীতিনির্ধারণে ব্যবহার এবং স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে সমন্বিত পরিকল্পনা, যথাযথ অর্থায়ন ও কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ সহায়ক হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
রাজনৈতিকভাবে সহজ অংশগুলো আগে বাস্তবায়ন করা হবে নাকি গোঁড়া থেকেই শুরু করবে এই প্রশ্ন প্রতিটি সংস্কার কমিশনের সামনেই থাকে। একটা মৌলিক সংস্কার কঠিন হলেও এর ফলাফল দীর্ঘস্থায়ী হয়। আর যেকোনো সংস্কারের ক্ষেত্রেই অর্থায়ন ব্যবস্থার সংস্কার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলে দেয় যে, যদি শুরুতেই অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় তবেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, টেকসই ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। আর যদি এই কাজটি ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখা হয় তাহলে আমাদের বছরের পর বছর কেবল অসম্পূর্ণতাগুলো পূরণেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হবে। এর ফলে সৃষ্ট অব্যবস্থার শিকার হতে হবে সমাজের অবহেলিত সাধারণ মানুষকে। মনে রাখতে হবে,সময়, সহানুভূতি ও দায়িত্বশীলতা, যা একসময় ছিল চিকিৎসা পেশার প্রাণ, আজ অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। গত তিন বছরে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল-এ ৩৫০টিরও বেশি চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ জমা পড়লেও শুধু ১৭টি ক্ষেত্রে শাস্তি হয়েছে। এ শিথিলতা ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। শুধু দেশের কাঠামোগত উন্নয়নই নয়, এখন প্রয়োজন একটি নৈতিক জাগরণ। চিকিৎসা পেশাকে শুধু জীবিকা নয়, মানবতার সেবায় পরিণত করতে হবে। রাষ্ট্র, চিকিৎসক সমাজ ও নাগরিক, সব পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্ব আছে এ পরিবর্তনের। এখনই কঠোর আইন ও জবাবদিহি না আনলে, স্বাস্থ্যসেবা পরিণত হবে এক বিশৃঙ্খল বাজারে, যেখানে মানবতা হেরে যাবে মুনাফার কাছে। সময় এসেছে দৃঢ় সিদ্ধান্তের। আইন মানবে স্বাস্থ্য খাত, না হলে আইন মানাতে হবে এ খাতকে। জনগণ কর দেয়, বিনিময়ে তারা চায় গ্যারান্টিযুক্ত, মানবিক ও সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা। স্বাস্থ্যসেবা কোনো পণ্য নয়, এটি জীবন ও মর্যাদার অধিকার। রাষ্ট্র যদি এ নৈতিক কর্তব্য এখনই নিশ্চিত করে, তাহলে শুধু স্বাস্থ্য নয়, আস্থা, ন্যায় ও মানবিকতাও ফিরে আসবে।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।
ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই