শিশুরা ভবিষ্যৎ জাতির রূপকার। একটি দেশ গড়ে তুলতে শিশুদের সুন্দর মানসিক বিকাশের জন্য গুরুত্ব প্রদান করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। তাই শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ, গুণগত শিক্ষা, নিরাপত্তা, পুষ্টি ও সুস্থ বিনোদন নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। শিশুরা মুক্তধারার চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে বেড়ে উঠলে, তারা আগামী দিনের বিশ্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। বিশ্বের প্রতিটি শিশু যেন ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সুবিধা নিয়ে জীবন যাপন করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এ কারণেই ‘বিশ্ব শিশু অধিকার সপ্তাহ ২০২৬’-এর প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত'।
শিশুরা হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশ। প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনেই হোক কারণে অকারণে বিভিন্ন অনৈতিক অপরাধেও তাদের সহজেই ব্যবহার করা যায়। পরিবারে, সমাজে এমনকি রাস্তায়ও এরা নির্যাতন ও শোষণের শিকার হচ্ছে। শিশুরা জানা অজানা অনেক নির্যাতনের শিকার হয়। তবে এই নির্যাতনের খবর খুব বেশি প্রকাশিত হয় না। কারণ শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো অনেকটাই ঘটে লোক চক্ষুর আড়ালে। যার ফলে নির্যাতনের ধরন কিংবা সংবাদ থেকে যায় সবার অগোচরে। শিশুর উপর কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক আঘাত, অবহেলা, দুর্ব্যবহার, আটকে রাখা, যৌন হয়রানি, অনাহারে রাখা ইত্যাদিকে শিশু নির্যাতন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো আমাদের অনেকেই বুঝতে পারেন না যে, তাঁরা নিজের অজান্তেই বিভিন্নভাবে শিশুদের নির্যাতন করে থাকেন।
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে সাত বছর বয়সি এক শিশুকে টাকা দেওয়ার কথা বলে ঘরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে ৮০ বছর বয়সি এক বৃদ্ধের বিরুদ্ধে। শিশুটি ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও,মানসিক ক্ষতি চিরকালই তার সঙ্গে থেকে যাবে । এই শিশুটি বেঁচে গেলেও দেশের অধিকাংশ শিশুরা এমন যাত্রায় বেঁচে ফেরে না। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। এছাড়া, বিভিন্ন ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ১১৫ শিশু খুন হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের ধর্ষণ ও হত্যার পাঁচটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবকটিতে শিশুরা প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজনের শিকার হয়েছে। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়— এটি প্রতিটি শিশুর স্বপ্নহীন শৈশব, হারানো হাসি, এবং গভীর এক ট্রমার প্রতিফলন।
এমন ভয়ংকর অভিজ্ঞতা কোমলমতি শিশুর শারীরিক ও মানসিক এক ভয়াবহ প্রভাবের সৃষ্টি করে। দক্ষিণ কোরিয়ার ডানকুক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যৌন নির্যাতনের শিকার ৯৭ জন শিশুর মধ্যে অধিকাংশই ভোগে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, মনোযোগের ঘাটতি, সামাজিক অপরিপক্বতা এবং আগ্রাসী আচরণে। এই মানসিক ক্ষতি শিশুদের সামাজিক, আবেগিক এবং আচরণগত বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তাদের আত্মবিশ্বাস, নিরাপত্তা বোধ এবং জীবনের স্বাভাবিক শিক্ষা প্রক্রিয়াও বিপর্যস্ত হয়। অন্যদিকে, ইউনিসেফ জানিয়েছে— ১ থেকে ১৪ বছর বয়সি প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জনই মাসে অন্তত একবার শারীরিক বা মানসিক সহিংসতার শিকার হয়। সহিংসতা কেবল বাহিরের ঘটনা নয়; অনেক সময়ই এটি শুরু হয় ঘর থেকে—যেখানে শিশুরা সবচেয়ে নিরাপদ থাকার আশা রাখে ।
অর্থনৈতিক দুর্বলতা, সামাজিক রীতিনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে শিশুরা প্রায়শই সহিংসতা, শোষণ ও অবহেলার শিকার হয়। বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষা এবং শিশু অধিকারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুতর ও বহুমাত্রিক সমস্যা বিদ্যমান। যেমন, অধিকাংশ শিশুই পরিবার, স্কুল বা কর্মস্থলে শারীরিক শাস্তি বা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ। অর্ধেকেরও বেশি মেয়েদের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। লাখ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত, যার একটা বড়ো অংশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হয়। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর জন্ম নিবন্ধন হয় না, যার ফলে তারা একটি পরিচয়ের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। শিশুর বিকাশ যদি বাধাগ্রস্ত হয়, তারা যদি তাদের পূর্ণ অধিকার নিয়ে যোগ্য নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠতে না পারে, তাহলে আগামী দিনের নেতৃত্ব দিতে পারবে কি-না তা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যায়। শিশুর অধিকার একজন সাধারণ মানুষের সমান। মানুষের মৌলিক অধিকার- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা এই ৫টি যদি আমরা পুরোপুরিভাবে শিশুদের জন্য নিশ্চিত করতে পারি তাহলে তাদেরকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হয়তোবা খুব কঠিন হবে না। তাদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে প্রয়োজন উন্নত এবং অনুকূল পরিবেশে।
একটি শিশুকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই শিশুর পারিবারিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাপী শিশুদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ১৯২৪ সালে জেনেভায় এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে ‘শিশু অধিকার’ ঘোষণা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৯ সালে জাতিসংঘে ‘শিশু অধিকার সনদ’ ঘোষণা করা হয়। বর্তমান আইনে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘শিশু অধিকার সনদে’ ৫৪টি ধারা এবং ১৩৭টি উপ-ধারা রয়েছে। এই সনদে প্রতিটি শিশুর অত্যাচার, অবহেলা, শোষণ থেকে সুরক্ষা পাবার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এই সনদ অনুসারে প্রতিটি শিশু নাম ও জাতীয়তা লাভের অধিকারী। প্রতিটি শিশুর রয়েছে স্বাধীন চিন্তা, মুক্ত মতামত প্রকাশের ও তথ্যলাভের অধিকার। মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী, শরণার্থী এবং সংখ্যালঘু শিশুদের অন্যান্য শিশুদের মতো সমান অধিকার রয়েছে। প্রতিটি শিশু সামাজিক নিরাপত্তা লাভের অধিকারী। বাংলাদেশ হচ্ছে শিশু অধিকার সনদে অনুস্বাক্ষরকারী প্রথম ২২টি দেশের মধ্যে একটি দেশ। এই সনদে রয়েছে বিশ্বের প্রতিটি শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান এবং সহনশীল প্ররিবেশে নিরাপদে বেড়ে ওঠার মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের দিক-নির্দেশনা। কিন্তু নানা কারণে এর ব্যত্যয় ঘটে আমাদের সমাজে। আদর-যত্ন, সঠিক দিক-নির্দেশনা ও বিদ্যমান পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিরূপ প্রভাবে অনেক শিশু প্রত্যাশিত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়।
এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কোনো রকম টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে ও মাদককে চিরতরে বিতাড়িত করতে হবো। যৌন হয়রানি ও অশিক্ষাকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। এক্ষেত্রে সমাজ, পরিবার ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল অভিভাবকের সচেতনতা শিশু অধিকার রক্ষার পূর্বশর্ত। শিশু অধিকার একটি বহুমুখী ধারণা। যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও অধিকার লঙ্ঘন থেকে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি অপরিহার্য সামাজিক কর্তব্য। শিশু সুরক্ষা শুধু সরকারের বা কোনো একটি সংস্থার একার দেখার বিষয় নয়; এটি অভিভাবক, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নাগরিক সমাজের যৌথ দায়িত্ব। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা। তাদের প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং তাদের মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়া। এছাড়া। সকল শিক্ষা ও পরিচর্যা কেন্দ্রে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বিধান সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা সহ শিশু আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন করে তাদের সক্রিয় করা। এই কমিটিগুলো এলাকায় কোনো শিশু যেন সহিংসতা, বাল্যবিবাহ বা শ্রমের শিকার না হয়, তা পর্যবেক্ষণ করবে এবং স্থানীয় প্রশাসনকে জানাবে। স্থানীয় ও জাতীয় বাজেটে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা এবং সেই অর্থের সদ্ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশে শিশুর অধিকার পূরণের অভাব এবং শিশুদের নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ বিরাট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘনবসতি, সীমিত সম্পদ এবং ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে শিশুরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংসারে অভাব অনটন শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত হতে বাধ্য করে। এতে তাদের শিক্ষাজীবন নষ্ট হয়ে যায়। শিশুজীবনের সব রঙিন স্বপ্ন ও কল্পনা ধূসর হয়ে যায়, অপমৃত্যু ঘটে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার। শিশু অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শিশুশ্রম নিরসন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) প্রকাশিত জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যা ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৭ জন (বা প্রায় ৩৫ লাখ ৪০ হাজার)। এর মধ্যে শিশু শ্রমে (child labour) বা সরাসরি শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ ৭৬ হাজার।ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত প্রায় ১০ লাখ ৬৮ হাজার ২১২ জন।সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে সব ধরনের শিশুশ্রম নিরসনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) লক্ষ্যমাত্রার সাথে মিল রেখে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দেশের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে সরকার ২৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
শিশুদের জন্য টেকসই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। শিশু অধিকার সপ্তাহ কেবল উদ্যাপনের নয়— এটি আমাদের প্রতিফলনের সময়। সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে বার্তা— আমার সন্তান যেন থাকে "দুধে আর ভাতে" অর্থাৎ প্রতিটি শিশু যেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির পাশাপাশি, নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সাথে সুর মিলিয়ে ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে শপথ নিতে হবে, ‘তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’।
লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, তথ্য অধদফতর। পিআইডি ফিচার
ডেল্টা টাইমস/সেলিনা আক্তার/সিআর/এমই