কুড়িগ্রামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে ষাটোর্ধ্ব মরিয়ম বেগম প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট দিনের অপেক্ষা করেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানরা যখন খোঁজ রাখা বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন বয়স্ক ভাতার সাতশ টাকাই হয়ে উঠেছিল তাঁর একমাত্র নিয়মিত আয়। ঢাকার এক বস্তিতে থাকা রহিমা খাতুন, যাঁকে স্বামী ফেলে চলে গেছেন বছর পাঁচেক আগে, দুই সন্তান নিয়ে সংসার চালান বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা আর সেলাইয়ের কাজ একসঙ্গে করে। প্রতিবন্ধী ছেলে সিয়ামকে নিয়ে জামালপুরের কৃষক আব্দুল করিম যখন প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তির খবর পান, তখন প্রথমবারের মতো ছেলেকে স্কুলে পাঠানোর সাহস করেন। আর উপকূলীয় সাতক্ষীরায় ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি হারানো জেলে পরিবারগুলো যখন খাদ্যসংকটে দিন গুনছিল, তখন ত্রাণ কার্যক্রমের নিয়মিত সহায়তা তাদের সামনে দাঁড়ানোর একটা ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
এই ধরনের অসংখ্য দৃষ্টান্ত প্রমাণ করছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয় বরং একেকটি পরিবারের বেঁচে থাকা আর মর্যাদার লড়াইয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বয়স্ক নারী, স্বামী পরিত্যক্তা নারী, প্রতিবন্ধী শিশুর অভিভাবক কিংবা দুর্যোগে সর্বস্ব হারানো জেলে-কৃষক প্রত্যেকের জীবনেই এই ভাতা বা সহায়তা ভিন্নভাবে অর্থবহ হয়ে উঠছে।
দেশের প্রান্তিক ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় স্বস্তি আনতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ৫৬ হাজার ২৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অর্থ ব্যয় হবে দারিদ্র্যবান্ধব ৪৮টি কর্মসূচির মাধ্যমে। এই কর্মসূচিগুলোর মূল লক্ষ্য দারিদ্র্যের হার কমানো, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের জন্য একটি ন্যূনতম আর্থিক সুরক্ষাবলয় তৈরি করা। চলতি অর্থবছরে মোট বরাদ্দের পরিমাণগত বৃদ্ধি এবং কর্মসূচির সংখ্যা সম্প্রসারণ সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় এই খাতের অবস্থান স্পষ্ট করে তোলে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বর্তমান সরকারের সর্বাপেক্ষা প্রতিশ্রুত কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪১ লাখ পরিবার প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা পাবে। এটি সরাসরি নারী গৃহকর্তাদের লক্ষ্য করে সাজানো হয়েছে। এটির উদ্দেশ্য পরিবারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর ভূমিকা শক্তিশালী করা এবং তাদের আর্থিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার ২৩৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এই কর্মসূচির সুবিধাভোগী প্রায় ৬২ লাখ মানুষ। মাসিক ৭০০ টাকা হারে দেওয়া এই ভাতা প্রবীণদের দারিদ্র্যের হার কমানোর পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত হয়ে থাকে। প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতায় ৩৯ লাখ ব্যক্তি মাসিক ১ হাজার টাকা করে পাবেন, যার মোট বরাদ্দ ৪ হাজার ৭১৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এই কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু আর্থিক সহায়তা নয় বরং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোও।
নারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে একাধিক কর্মসূচি চালু রয়েছে। বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের জন্য ভাতা কর্মসূচিতে ৩০ লাখ সুবিধাভোগীর জন্য মাসিক হার ৭০০ টাকা হারে বরাদ্দ ২ হাজার ৫৩৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। নারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালিত অরক্ষিত নারী সুবিধা কর্মসূচির আওতায় গ্রামের ১০ লাখ ৪০ হাজার দুস্থ নারী প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল পাবেন যার বরাদ্দ ২ হাজার ২৯৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এটি মূলত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের একটি প্রত্যক্ষ উদ্যোগ। মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিতে রয়েছে মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি, যেখানে ১৮ লাখ ৯৫ হাজার মা মাসে ৮৫০ টাকা করে পাবেন। এটি একটি আয়-যাচাইভিত্তিক কর্মসূচি যার মাধ্যমে প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হয়। এ খাতে বরাদ্দ ১ হাজার ৯৬৮ কোটি ২০ লাখ টাকা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় দুটি উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি রয়েছে। সাধারণ ত্রাণ কার্যক্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ১৮ লাখ পরিবারকে মাসিক ৭০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে যার বরাদ্দ ২ হাজার ৩৪২ কোটি ৩ লাখ টাকা। এছাড়া সরকারের ভাষ্যমতে, হতদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান সৃজন কর্মসূচির আওতায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে স্বল্পমেয়াদি মৌসুমি কর্মসংস্থান দেওয়া হবে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য মঙ্গা বা মৌসুমি খাদ্যাভাব মোকাবিলায় দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা করা। এতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৬৩২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি এ তালিকার একটি নতুন সংযোজন, যেখানে ৪২ লাখ ৫০ হাজার প্রান্তিক কৃষককে সরাসরি নগদ সহায়তা ও কৃষি সেবা দেওয়া হবে। এই কর্মসূচিতে বরাদ্দ ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। প্রান্তিক কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার এই উদ্যোগ কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ প্রবাহ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এত বড়ো অঙ্কের বরাদ্দ ও এত বিপুলসংখ্যক সুবিধাভোগীর তথ্য ব্যবস্থাপনা মোটেই সহজ কাজ নয়। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে সরকার ধাপে ধাপে নগদ সহায়তা বিতরণের প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীর হিসাবে অর্থ পাঠানোর এই পদ্ধতি, যা সরকার-থেকে-ব্যক্তি বা জি-টু-পি লেনদেন নামে পরিচিত, মধ্যস্বত্বভোগীর হস্তক্ষেপ কমিয়ে আনার একটি চেষ্টা। তালিকা প্রণয়নে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত ডেটাবেজ ব্যবহারের ফলে একই ব্যক্তির নামে একাধিক ভাতা তোলার মতো অনিয়ম অনেকাংশে ধরা পড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তালিকাভুক্তি নিয়ে অভিযোগও একেবারে অনুপস্থিত নয়। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি কিংবা তথ্যগত ভুলের কারণে প্রকৃত অভাবি মানুষ অনেক সময় তালিকার বাইরে থেকে যান, আবার তুলনামূলক সচ্ছল কেউ কেউ তালিকায় ঢুকে পড়েন বলে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে। এই লক্ষ্যভ্রষ্টতা বা টার্গেটিং এরর কমাতে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে যাচাই কমিটি গঠন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। সরকার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের পথে হাঁটার চেষ্টা করেছে—কিন্তু একক নিবন্ধন ব্যবস্থা ও শক্তিশালী এমআইএস প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
তারপরও সামগ্রিক চিত্র থেকে স্পষ্ট, রাষ্ট্র তার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের পাশে দাঁড়ানোর দায় থেকে সরে আসেনি। বরং কর্মসূচির সংখ্যা ও পরিধি বছর বছর সম্প্রসারিত হচ্ছে, নতুন নতুন জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষাবলয়ের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে। ‘কৃষক কার্ড’-এর মতো নতুন উদ্যোগ প্রমাণ করে, সামাজিক সুরক্ষার ধারণা এখন কেবল ভাতা-নির্ভর ত্রাণ কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত সহায়তার দিকেও তা বিস্তৃত হচ্ছে। ৪৮টি কর্মসূচি মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সামাজিক নিরাপত্তা বাজেট বাংলাদেশের দারিদ্র্য মোকাবিলার কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে।
নারীর ক্ষমতায়ন, প্রবীণদের মর্যাদা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও কৃষিখাতের সুরক্ষার মতো কর্মসূচি সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোকে কেবল ত্রাণ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য নিরসনের একটি হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। মরিয়ম বেগম, রহিমা খাতুন কিংবা আব্দুল করিমের মতো মানুষদের জন্য এই বরাদ্দ শুধু বাজেটের খাতা-কলমের হিসাব নয়, বরং প্রতি মাসের নির্দিষ্ট দিনটিতে বেঁচে থাকার একটি নিশ্চয়তা।
ডেল্টা টাইমস/মো.খালিদ হাসান/সিআর/এনজিটি
লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর