শতভাগ স্বাক্ষরতা নিশ্চিত করাই বড়ো চ্যালেঞ্জ

মোঃ মাহফুজুর রহমান

মতামত

একটা সময় ছিল গ্রামের অনেক কৃষক সাদা কাগজে টিপসই দিয়ে ভিটেমাটি হারিয়ে পথের ফকির হয়ে যেত । আবার

2026-09-07T16:25:32+06:00
2026-09-07T16:25:32+06:00
সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

শতভাগ স্বাক্ষরতা নিশ্চিত করাই বড়ো চ্যালেঞ্জ
মোঃ মাহফুজুর রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:২৫ পিএম   (ভিজিট : ২)

একটা সময় ছিল গ্রামের অনেক কৃষক সাদা কাগজে টিপসই দিয়ে ভিটেমাটি হারিয়ে পথের ফকির হয়ে যেত । আবার অনেকে ঋণ না নিয়েও ঋণের ফাঁদে পড়তো । কারণ তারা ছিল নিরক্ষর । মানুষের অজ্ঞতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটতো একটি কুচক্রী মহল । এখন অবশ্য এ ধরণের ঘটনা আর শোনা যায় না । কারণ মানুষ আগের চেয়ে সচেতন হয়েছে, ন্যূনতম লেখাপড়া শিখেছে । এটা সম্ভব হয়েছে ধারাবাহিকভাবে সরকারগুলোর নানা ইতিবাচক পরিকল্পনার ও তার বাস্তবায়নের মাধ্যমে। সাধারণ মানুষ এখন শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পারে । তাই শত কষ্ট হলেও সবাই এখন নিজের সন্তানকে স্কুলে পাঠায়, তার পড়ালেখার যত্ন নেয় । গ্রামের মেঠো পথ ধরে সকাল বেলা সারিবদ্ধ হয়ে স্কুলে যাওয়ার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এখন চিরচেনা ।  

নিরক্ষরতা দূর করার এই পথচলাটা মোটেই মসৃণ ছিল না । এই গল্পটা শুরু হয় গত শতাব্দী থেকে ।  ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৬৬ সালের ২৬ অক্টোবর ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনের ১৪ তম অধিবেশনে ৮ সেপ্টেম্বর তারিখকে “আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস” হিসেবে ঘোষণা করা হয় ।  এর পরের বছর প্রথমবারের মত দিবসটি পালন করা হয় । ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং নিরক্ষরতা দূর করতেই এ দিবসটি পালিত হয়েও আসছে । বর্তমানে জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র এই দিবসটি উদ্‌যাপন করে থাকে।

সাক্ষরতা সকলের জন্য একটি মৌলিক মানবাধিকার। এটি মানুষের জন্য বিস্তৃত জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, মনোভাব এবং আচরণ অর্জনের একটি ভিত্তি। সাক্ষরতা সমাজে সমতা, বৈষম্যহীনতা, আইনের শাসন, সংহতি, ন্যায়বিচার, বৈচিত্র্য এবং সহনশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে । উপযুক্ত সাক্ষরতা স্থায়ী শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলে। তাই সাক্ষরতা বিষয়ে সচেতন করা খুবই দরকার।

আসলে সাক্ষরতা বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে অনেকের মধ্যে নানা ভুল ধারণা রয়েছে । মূলত ৭ বছর বা তার বেশি বয়সি যে কোনো ব্যক্তি যিনি সাধারণ পড়তে ও লিখতে পারেন, তাকে সাক্ষর হিসেবে গণনা করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই সাক্ষরতার সংজ্ঞায় ভিন্নতা থাকলেও ১৯৬৭ সালে ইউনেসকো সর্বজনীন একটা সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। তখন শুধু কেউ নাম লিখতে পারলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো। পরবর্তী সময়ে প্রায় প্রতি দশকেই এই সংজ্ঞায় পরিবর্তন এসেছে এবং ১৯৯৩ সালের একটি সংজ্ঞায় ব্যক্তিকে সাক্ষর হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়। শর্ত তিনটি হচ্ছে : ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোটো বাক্য পড়তে পারবে; ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোটো বাক্য লিখতে পারবে ; ব্যক্তি দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ হিসেব-নিকাশ করতে পারবে। আরও সহজ করে বললে, দৈনন্দিন কার্যাবলি করার জন্য বাজারের তালিকা করা, রাস্তার সাইনবোর্ড ও বাসার ঠিকানা পড়া, চিঠিপত্র পড়া, মোবাইল নম্বর চেনা, টেলিফোন ও মোবাইল করতে পারা, নম্বর সেভ করতে পারা, সর্বোপরি নিজের নাম লিখতে পারা এবং স্বাক্ষর কিংবা দস্তখত করতে পারা- এমন জ্ঞানসম্পন্নদের সমাজে সাক্ষর বলা যায় ।
এ বছর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘‘Literacy for people, the planet and prosperity'', বাংলায় ‘‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা” । প্রকৃতপক্ষে সাক্ষরতা শুধু মানুষের সমৃদ্ধির জন্যই নয়, পৃথিবীর সমৃদ্ধি ও টিকে থাকার জন্য আবশ্যক । সাক্ষরতা ও উন্নয়ন একে অন্যের পরিপূরক । সাক্ষরতার হার যত বাড়বে একটি দেশের উন্নয়ন আরও বেগবান হবে । কারণ নিরক্ষরতা উন্নয়নের অন্তরায়। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে যে জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োজন তা সাক্ষরতার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব । এ কারণেই স্বাধীন বাংলাদেশে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য জাতিকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার সন্নিবেশিত হয়েছে।

সাক্ষরতা অর্জনের মাধ্যমে একজন মানুষ তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয় । সমাজের নানা বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার সক্ষমতা অর্জন করে থাকে । ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা তৈরিতে সে ভূমিকা রাখতে পারে । নিরক্ষর মানুষের জীবনের লক্ষ্য থাকে না । সময়ের সাথে নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে তাকে চলতে হয় । কিন্ত সাক্ষরতা অর্জনকারী মানুষ বেশিরভাগ সময় তার নিজ বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে ।  

পরিসংখ্যান বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে । শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে অনেক সময় নানা প্রশ্ন দেখা দিলেও সাক্ষরতার অগ্রযাত্রা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই । স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৬ শতাংশের মত। বর্তমানে দেশের ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ ৮০ শতাংশ আর নারী প্রায় ৭৬ শতাংশ ।

খালি চোখে এ তথ্য আশাব্যঞ্জক হলেও হতাশার জায়গাও রয়েছে । কারণ প্রতি চারজনে একজন এখনো নিরক্ষর । দেশে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ২২ শতাংশ এখনো নিরক্ষর। এ জনগোষ্ঠী মূলত বিদ্যালয়বহির্ভূত বা ঝরে পড়া শিশু এবং শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ। পৃথিবীর অনেক দেশই শতভাগ মানুষ সাক্ষর । তাই শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন এখন একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ । বর্তমান সরকার এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ নিয়েছে । কাঙ্ক্ষিত ফল পেলে দেশের অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নের গতি আরও বেগবান হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা । বিশেষ করে, নারীরা সাক্ষরতা অর্জন করলে গোটা পরিবারের ওপর তার প্রভাব পড়ে । এখন গ্রামের অনেক মহিলাই নানা কর্মকাণ্ড করে স্বাবলম্বী হয়েছে । শিক্ষার আলো না থাকলে নারীরা পিছিয়ে থাকতো । নারীর ক্ষমতায়ন অর্জনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় হলো শিক্ষা ও সচেতনতা ।

৫৫ বছরে বাংলাদেশে যেসব ক্ষেত্রে উন্নয়ন দৃশ্যমান, তার মধ্যে শিক্ষাখাত একটি। প্রাথমিকে প্রায় শতভাগ ভর্তি, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে ছেলে-মেয়ের সমতা অর্জনসহ শিক্ষার বেশ কিছু অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো।

বর্তমান সরকারও শিক্ষাখাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েই কাজ করছে । একটি আধুনিক, মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে নানা পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে সরকার । এ লক্ষ্যে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে । শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন করার পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন আনতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার । জীবনমুখী, কর্মমুখী ও উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এবং ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাখাতে আমূল পরিবর্তন আসবে । এ লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষাখাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের । এছাড়া, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে মাধ্যমিক পর্যায় থেকে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালু করা, সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা এবং শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও নৈতিক শিক্ষায় সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা, পর্যায়ক্রমে মিড-ডে মিল চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে শিক্ষার প্রতি শিশুদের আগ্রহ অনেক বাড়বে । এর মধ্য দিয়েই শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন করা সম্ভব হবে । শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন হলে বদলে যাবে বাংলাদেশের চিত্র । এ কাজে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই ।   



 ডেল্টা টাইমস/মোঃ মাহফুজুর রহমান/সিআর/এনজিটি                                                                                                 লেখক: চিফ ফিচার রাইটার, তথ্য অধিদফতর












  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ